ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথভাব আকস্মিক হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামারিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে ইরান। এতে ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সামরিক, বেসামরিক, নারী ও শিশুসহ অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছে এবং এই সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
এছাড়াও লেবানানে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল, সেখানেও বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা ১০ দিন স্থগিত রাখার যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে নতুন তথ্য প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা। তাদের দাবি, তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো অনুরোধ ওয়াশিংটনকে করেনি।
যুদ্ধ শুরুর পর গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২৭ দিনে দেশগুলোর প্রকাশিত মৃত্যুর সংখ্যা তুলো ধরেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ইরানের উপ-স্বাস্থ্যমন্ত্রী আলী জাফরিয়ান আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৯৩৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২৪০ জন নারী এবং ২১২ জন শিশু।
জাফরিয়ান আরও বলেন, এছাড়া প্রায় ৪ হজার নারী ও ১ হাজার ৬২১ জন শিশুসহ ২৪ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ বুধবার জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে কমপক্ষে ৩ হাজার ৩০০ জন নিহত হয়েছেন।
সংস্থাটি বলেছে, নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৪৬৪ জন বেসামরিক নাগরিক, যাদের মধ্যে অন্তত ২১৭ জন শিশুও রয়েছে। তবে গত ৪ মার্চ শ্রীলঙ্কার উপকূলে মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবির ঘটনায় কমপক্ষে ১০৪ জন নিহত হয়েছে, তারা এই পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন কিনা তা স্পষ্ট নয়।
এছাড়াও বুধবার জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ১৫০০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
ইরান-লেবাননে বাস্তুচ্যুত ৪০ লাখ মানুষ: ভয়াবহ এই যুদ্ধের কারণে ইরানের বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ছেন। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৩২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এটি ইরানের মোট জনসংখ্যার ৩ শতাংশেরও বেশি।
প্রাণভয়ে সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে শুরু করায় বড় ধরনের শরণার্থী সংকটের আশঙ্কায় রয়েছে ত্রাণ সংস্থা ও ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো। বেসামরিক লোকজন সহিংসতা থেকে বাঁচতে দেশ ছাড়তে শুরু করেছেন। তবে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মানুষের যাতায়াত এখনো সীমিত এবং তা মূলত ব্যবসা-বাণিজ্যকেন্দ্রিক ও স্বল্পমেয়াদি। আফগান সীমান্ত দিয়ে যাঁরা যাতায়াত করছেন, তারা মূলত ইরান থেকে ফিরে আসা শরণার্থী। পাকিস্তান সীমান্ত দিয়ে এখন পর্যন্ত নতুন কোনো শরণার্থী প্রবেশের তথ্য মেলেনি; কেবল অনুমোদিত ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরাই যাতায়াত করছেন।
ড্রোন স্পিডবোট নামাল যুক্তরাষ্ট্র: ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে টহল দেওয়ার জন্য চালকবিহীন ‘ড্রোন স্পিডবোট’ মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এটি প্রথমবার, যখন ওয়াশিংটন কোনো সক্রিয় যুদ্ধে এ ধরনের নৌযান ব্যবহারের কথা স্বীকার করল। এর আগে এসব ড্রোন বোট মোতায়েনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি।
নজরদারির পাশাপাশি আত্মঘাতী হামলার জন্যও এসব চালকবিহীন নৌযান ব্যবহার করা যেতে পারে বলে জানা গেছে। রয়টার্সের আগের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, চালকবিহীন নৌবহর গড়ে তুলতে গিয়ে মার্কিন নৌবাহিনী বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। তবে সেই বাধা কাটিয়ে এখন এসব প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধে বিস্ফোরকবোঝাই স্পিডবোট দিয়ে রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের ক্ষতি করার পর থেকেই এ ধরনের ড্রোন নৌযান গুরুত্ব পায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানও অন্তত দুইবার পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে ‘সি ড্রোন’ ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এসব ড্রোন বোট দিয়ে সরাসরি কোনো আক্রমণ চালিয়েছে-এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আরও ১০ হাজার সেনা পাঠাতে পারেন ট্রাম্প: ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে আরও ১০ হাজার স্থলসেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করছে পেন্টাগন। তেহরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার প্রস্তুতির পাশাপাশি সামরিক শক্তি ও বিকল্পগুলো আরও বাড়াতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পদক্ষেপ নিতে পারেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) একজন ঊর্ধ্বতন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত ১০ হাজার পর্যন্ত স্থলসেনা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে পেন্টাগন।
যদিও ওই কর্মকর্তা বলেছেন, সেনাবাহিনীর কোন ইউনিটগুলোকে মোতায়েন করা হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তাদের ইরানের মূল ভূখণ্ড এবং দেশটির প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ-এর অপারেশনাল রেঞ্জের (আক্রমণ চালানোর মতো দূরত্ব) মধ্যেই মোতায়েন করা হতে পারে।
নতুন এই ১০ হাজার সেনা যুক্ত হবে এই অঞ্চলে আগে থেকেই মোতায়েনের নির্দেশে থাকা ৫ হাজার মেরিন সেনা এবং ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের হাজার হাজার প্যারাট্রুপারদের সঙ্গে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, এই নতুন মোতায়েনের তালিকায় পদাতিক ইউনিট এবং সাঁজোয়া যান অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, মিত্রদের সমর্থন থাকুক বা না থাকুক, তিনি ‘হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত’ করবেনই।
মার্কিন ৮০০ ও ইসরায়েলি ১৩২১ সেনা নিহত: পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে এবং এই অঞ্চলে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ইরান গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছেন ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুলফজল শেকারচি।
গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির জাতীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, মার্কিন সেনাবাহিনী এখন এতটাই বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে যে তারা নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ছেড়ে সাধারণ নাগরিকদের ব্যবহৃত হোটেলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। শেকারচির মতে, বেসামরিক স্থাপনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার এই প্রবণতা আসলে মার্কিন বাহিনীর চরম পরাজয় এবং আত্মরক্ষায় তাদের অক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ।
ইরানি জেনারেল তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যে এ পর্যন্ত অন্তত ১৭টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানগুলোও আর নিরাপদ নয়। তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেন, যে দেশই ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালাবে, তাকে ধ্বংস না করা পর্যন্ত তেহরান শান্ত হবে না।
গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান তাদের সামরিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে এবং এখন তারা ‘প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান’ থেকে সরে এসে ‘আক্রমণাত্মক নীতি’ গ্রহণ করেছে। শেকারচি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইসলামি বিপ্লবের নতুন নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা খামেনির দেওয়া চার দফা শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা মার্কিন বাহিনীকে রেহাই দেবেন না।
সাক্ষাৎকারে জেনারেল শেকারচি যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির একটি পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, চলমান সংঘাতে এ পর্যন্ত ৬০০ থেকে ৮০০ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে এবং প্রায় ৫ হাজার সেনা আহত হয়েছে। এ ছাড়া ইরানি হামলায় ১,৩২১ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার তথ্যও তিনি প্রদান করেন, যদিও ইসরায়েল এই সংখ্যাটি গোপন করার চেষ্টা করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
লেবাননে নিহত ১১১৬, বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষ: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এরই মধ্যে লেবাননে প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১১৬ জনে। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়েছে। শুধু প্রাণহানিই নয়, যুদ্ধের এই তীব্রতায় আহতের সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। লেবাননের বিপর্যয় ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দপ্তর জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত আহত হয়েছেন ৩ হাজার ২২৯ জন। প্রতিনিয়ত সংঘর্ষের কারণে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। নিরাপত্তাহীনতা ও লাগাতার হামলার মুখে দেশজুড়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। বাস্তুচ্যুত হয়েছে লাখো মানুষ। অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন অস্থায়ী ক্যাম্পে, আবার কেউ কেউ পার্শ্ববর্তী এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। মানবিক সংকট ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে।
১২ বছরের ইরানি শিশুরাও যুদ্ধে অংশ নেবে: ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রিভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি) যুদ্ধের বিভিন্ন সহায়তা ও নিরাপত্তা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য শিশুদের সর্বনিম্ন বয়স কমিয়ে ১২ বছর নির্ধারণ করেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে আইআরজিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই চাঞ্চল্যকর ঘোষণা দেন।
তেহরানে আইআরজিসির সাংস্কৃতিক বিষয়ক কর্মকর্তা রহিম নাদালি জানিয়েছেন, ‘ফর ইরান’ (ইরানের জন্য) নামক একটি বিশেষ উদ্যোগের আওতায় এই নিয়োগ প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্কদের টহল দল, চেকপোস্ট এবং রসদ সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও নিরাপত্তা কাজে ব্যবহার করা হবে।
নাদালি বলেন, ‘যেহেতু স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এগিয়ে আসা ব্যক্তিদের বয়স আগের চেয়ে কমেছে এবং তারা অংশ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছে, তাই আমরা সর্বনিম্ন বয়স কমিয়ে ১২ বছর করেছি।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, ১২ ও ১৩ বছর বয়সীরা এখন থেকে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী এসব কার্যক্রমে সরাসরি অংশ নিতে পারবে।
এই ঘোষণা বিশ্বজুড়ে শিশু অধিকার কর্মীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এর আগে ২০২২ সালে মাহসা আমিনীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিক্ষোভের সময়ও ইরানজুড়ে সামরিক পোশাকে শিশুদের টহল দিতে দেখা গিয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। এছাড়া ২০১৬ সালের শুরুর দিকে ইরানে বিক্ষোভ দমনের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ২০০-এর বেশি শিশু নিহতের অভিযোগ করেছে ‘সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান’।
মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বারবার অভিযোগ করে আসছে যে, ইরানি কর্তৃপক্ষ শিশুদের আটক, নির্যাতন এবং এমনকি বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক আইন ও ‘শিশু অধিকার সনদ’ লঙ্ঘন করছে। ইরানের ৩ কোটির বেশি শিশু শ্রমিকের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে সামরিক কাজে শিশুদের ব্যবহারের এই নতুন ঘোষণা দেশটিকে আরও বড় ধরনের মানবাধিকার সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পশ্চিম এশিয়ায় ১৩ মার্কিন ঘাঁটি ধ্বংস: ইরানের হামলায় পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস হয়ে গেছে। মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে। ঘাঁটি ছেড়ে মার্কিন সেনারা এখন অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় নিচ্ছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যে ১৩টি সামরিক ঘাঁটি ধ্বংসের কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে কুয়েতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কুয়েতের পোর্ট শুয়াইবা, আলি আল সালেম বিমান ঘাঁটি এবং বুয়েরিং সামরিক ঘাঁটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। উল্লেখ্য, যুদ্ধের শুরু থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক হামলা চালায় ইরান।
তাদের দাবি, ওই অঞ্চলে বহু মার্কিন সামরিক ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন বারবারই ইরানের দাবি ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে। কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরবে মার্কিন সেনা এবং বিমান ঘাঁটিতে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে ইরান। এর মধ্যে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী রাডার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে ইরান। এই ঘাঁটিটি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের আঞ্চলিক সদর দপ্তর। এছাড়া বাহরাইনে মার্কিন সেনাবাহিনীর ফিফ্থ ফ্লিটের সদর দপ্তরেও হামলা করেছে ইরান। অন্য দিকে, সৌদি আরবে প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয়।
হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশসহ ৫ দেশের ছাড়: মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনাপূর্ণ যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে উন্মুক্ত রাখার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশকে এই জলপথ ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান।
ইরানের তথ্যমতে, ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশ, ভারত, চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তানের জাহাজগুলো নির্দিষ্ট সমন্বয়ের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তবে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এই প্রণালিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ইরান, যার প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ-এমন দাবি সঠিক নয়। তিনি জানান, অনেক দেশের শিপিং কোম্পানি নিরাপদ যাতায়াতের জন্য ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং যেসব দেশকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তাদের জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রানজিট অনুমতি না থাকায় পাকিস্তানগামী ‘সেলেন’ নামের একটি কনটেইনার জাহাজকে হরমুজ প্রণালি থেকে ফিরিয়ে দেয় ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)।
বর্তমানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের মাধ্যমে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে ইরান। লয়েডস লিস্টের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১২০টি জাহাজ চলাচল করে, সেখানে ১ থেকে ২৫ মার্চের মধ্যে এ সংখ্যা ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। গবেষণা সংস্থা কেপলারের তথ্য বলছে, এই সময়ে মাত্র ১৫৫টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যার মধ্যে ৯৯টি ছিল তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার।

