রাষ্ট্রপতি পদে লড়তে মিয়ানমারে সেনাপ্রধানের পদত্যাগ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৯:৩৪
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমারে অভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর সংসদীয় ভোটে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রধান মিন অং হ্লাইং, যিনি ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
দেশটির রাষ্ট্রপতি পদে লড়তে সোমবার (৩০ মার্চ) জান্তা প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং পদত্যাগ করেছেন।
৬৯ বছর বয়সী এই জেনারেল ২০১১ সাল থেকে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। দেশটির নবগঠিত নিম্নকক্ষের আইনপ্রণেতাদের দ্বারা মনোনীত দুই ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর একজন হিসেবে নামভুক্ত হয়েছেন।
দেশের উচ্চকক্ষ থেকেও একজন ভাইস-প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনীত করা হবে এবং পরবর্তীতে উভয় কক্ষের ভোটে এই তিনজনের মধ্য থেকে একজনকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচন করা হবে। তবে সেই ভোটের তারিখ এখনও ঘোষণা করা হয়নি।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারিত সংসদীয় অধিবেশন অনুযায়ী, সামরিকপন্থী দলের একজন আইনপ্রণেতা কিয়াউ কিয়াউ হতে নিম্নকক্ষে প্রস্তাব করেন, ‘সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে প্রস্তাব করা হচ্ছে।’
ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে চলমান সংঘাতের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো। ওই নির্বাচনে সামরিক সমর্থিত 'ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি' জয়লাভ করলেও জাতিসংঘ এবং অনেক পশ্চিমা দেশ একে ‘প্রহসন’ বলে কঠোর সমালোচনা করেছে।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমার চরম সহিংসতার কবলে রয়েছে, যেখানে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চি-র গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিল সামরিক বাহিনী (তাতমাদো)। রাজধানী নেপিদোতে এক পৃথক অনুষ্ঠানে মিন অং হ্লাইং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ইয়ে উইন উ-র কাছে হস্তান্তর করেন।
সামরিক মালিকানাধীন গণমাধ্যমে প্রচারিত এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমি জনগণ, সেনাবাহিনী এবং দেশের জাতীয় স্বার্থে কাজ করে যাব।’
ইয়ে উইন উ ২০২০ সালে মিয়ানমারের গোয়েন্দা প্রধান নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং চলতি মাসের শুরুর দিকে তাকে সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। স্বতন্ত্র বিশ্লেষক অং কিয়াউ সোয়ে বলেন, ‘দুই মাসের মধ্যে দুটি বড় পদোন্নতি প্রমাণ করে যে তিনি মিন অং হ্লাইংয়ের অন্যতম বিশ্বস্ত অনুসারী।’
ইয়ে উইন উ এলিট ডিফেন্স সার্ভিসেস অ্যাকাডেমির পরিবর্তে অফিসার ট্রেনিং স্কুলের স্নাতক। তিনি এর আগে আইয়ারওয়াদি ডেল্টায় পদাতিক ডিভিশন এবং দক্ষিণ-পশ্চিম কমান্ডের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
থাইল্যান্ডভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসি – মিয়ানমার’ মার্চ মাসের এক বিশ্লেষণে লিখেছে যে, অভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি জেনারেল পদমর্যাদায় সামরিক প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল দায়িত্ব পালন করেছেন। তবুও, যুদ্ধক্ষেত্র পরিচালনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনের অভিজ্ঞতায় জেনারেল ইয়ে উইন উ-র কিছুটা ঘাটতি রয়েছে বলে মনে হয়।
দক্ষিণ মিয়ানমারের এক পরিবারে জন্ম নেওয়া মিন অং হ্লাইং সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আগে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। ধীরে ধীরে পদোন্নতি পেয়ে ঠিক ১৫ বছর আগে আজকের এই দিনেই তিনি সামরিক প্রধান হয়েছিলেন।
একজন কঠোর সামরিক নেতা এবং নিষ্ঠুর পরিচালক হিসেবে পরিচিত মিন অং হ্লাইং দেশের অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েছেন। তিনি বিশ্বস্তদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের শাস্তি দেওয়ার কৌশল ব্যবহার করে আসছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ সেনাবাহিনীর মর্যাদা ও নিয়ন্ত্রণ কিছুটা ক্ষুণ্ণ করলেও, মিন অং হ্লাইং অনেক আগে থেকেই দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। স্বতন্ত্র বিশ্লেষক হতিন কিয়াউ আয়ে বলেন, এটি শুরু থেকেই মিন অং হ্লাইংয়ের লক্ষ্য ছিল। এটি কেবল সামরিক নেতা থেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শাসনে ফেরার একটি রূপান্তর মাত্র।

