দ.আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন
৪০ বছরেও বিচার পাননি চার বীরের স্বজনরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ২০:২৭
বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রথম সারির চার যোদ্ধার হত্যাকারী কুখ্যাত শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা ইউজিন ডি কক, যিনি পরম শয়তান নামে পরিচিত।
১৯৮৫ সালের ২৭ জুন। রাত নেমেছে দক্ষিণ আফ্রিকার জনপদে। পোর্ট এলিজাবেথ (বর্তমান নাম গেবেখা) থেকে নিজ শহর ক্র্যাডকের দিকে ফিরছিলেন চারজন তেজস্বী তরুণ। তাঁরা ছিলেন বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রথম সারির যোদ্ধা— ফোর্ট ক্যালাটা, ম্যাথু গনিওয়ে, সিসেলো মহলাউলি এবং স্প্যারো মকন্টো। কিন্তু পথেই তাঁদের গতিরোধ করে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের ঘাতক দল। সেই রাতে তাঁদের অপহরণ করে নির্মমভাবে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। পরিচয় আড়াল করতে তাঁদের ওপর চালানো হয় পৈশাচিক ছুরিকাঘাত এবং শেষে পুড়িয়ে দেওয়া হয় মরদেহ। ইতিহাসে তাঁরা পরিচিতি পান 'ক্র্যাডক ফোর' নামে। বর্ণবাদী শাসনের সেই নৃশংসতার ৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত বিচার পাননি তাঁদের পরিবার।
৩০ বছর আগে, ১৯৯৬ সালের ১৫ এপ্রিল আর্চবিশপ
ডেসমন্ড টুটুর নেতৃত্বে দক্ষিণ আফ্রিকায় শুরু হয়েছিল ‘সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন’ -এর কার্যক্রম।
লক্ষ্য ছিল বর্ণবাদী আমলের অপরাধগুলো প্রকাশ্যে আনা এবং যারা সত্য স্বীকার করবে তাদের
ক্ষমার আওতায় আনা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় আসা আফ্রিকান ন্যাশনাল
কংগ্রেস (এএনসি) সরকার এই কমিশন কর্তৃক চিহ্নিত শত শত খুনি ও অপরাধীর বিচার করেনি।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, সাবেক প্রেসিডেন্ট থাবো মবেকি এবং জ্যাকব জুমা বর্ণবাদী
জেনারেলদের সঙ্গে এক গোপন আঁতাত করেছিলেন। নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে তাঁরা এই নৃশংস
হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার ফাইলবন্দি করে রাখেন।
কমিশনের শুনানির দ্বিতীয় দিনে ফোর্ট ক্যালাটার
বিধবা স্ত্রী নোমোন্ডে ক্যালাটা যখন যন্ত্রণায় চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিলেন, সেই দৃশ্য
নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো বিশ্বকে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এত বছর ধরে আমি কান্না
চেপে রেখেছিলাম যাতে শত্রুরা আমার দুর্বলতা দেখে হাসতে না পারে। কিন্তু কমিশনের সামনে
গিয়ে আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। তাঁর ছেলে লুখানিও ক্যালাটা এখন এই বিচারহীনতার
বিরুদ্ধে সোচ্চার। তিনি সরাসরি এএনসি সরকারকে দায়ী করে বলেন, তারা আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা
করেছে। একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের জীবনের মূল্য যে শ্বেতাঙ্গদের সমান— সরকার এই বিচার
নিশ্চিত না করে সেই সত্যটাকেই অস্বীকার করেছে।
দীর্ঘ সংগ্রামের পর গত বছর 'ক্র্যাডক ফোর'
হত্যাকাণ্ডের ওপর তৃতীয়বারের মতো বিচার বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। এতে সাক্ষী দিতে
এসেছিলেন কুখ্যাত শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা ইউজিন ডি কক, যিনি ‘প্রাইম ইভিল’ বা পরম শয়তান নামে পরিচিত।
তিনি আদালতে স্বীকার করেছেন যে, সেই সময় 'সমাজ থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া' বলতে আসলে
হত্যাকাণ্ডকেই বোঝানো হতো। তবে বিচারের এই ধীরগতিতে হতাশ পরিবারগুলো। সিসেলো মহলাউলির
বিধবা স্ত্রী নাম্বুয়িসেলো আক্ষেপ করে বলেন, "আমার স্বামী আজ বেঁচে থাকলে হয়তো
আমরা আমাদের নিজেদের বাড়িতে বসে একসাথে খবরের কাগজ পড়তাম। বিচারক কি আমাদের এই চার
দশকের দীর্ঘশ্বাস অনুভব করতে পারবেন?"
দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ
অধ্যায় হলেও, ‘ক্র্যাডক ফোর’-এর
মতো হাজারো পরিবারের কাছে তা আজ এক অপূর্ণ আশার নাম। বর্ণবাদ মুছে গেলেও ন্যায়বিচারের
পথটি এখনো সেখানে পিচ্ছিল ও অন্ধকার।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

