যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প ৮ এপ্রিল একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন, যা মঙ্গলবার পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে ইরান এখনও বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে অস্বীকৃতি জানানোয় ট্রাম্পের হতাশা বাড়ছে। এদিকে, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি আগামী রোববার শেষ হচ্ছে বলে ইসরায়েলকে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে। ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘কান’ (কেএএন) বলেছে, তেহরানের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হচ্ছে—এমন বার্তা তেল আবিবকে পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প অনির্দিষ্টকালের আলোচনার পরিবর্তে তেহরানের সঙ্গে একটি সুনির্দিষ্ট সমঝোতায় পৌঁছাতে চাইছেন। তবে ইসরায়েলি সূত্রগুলো বলছে, চলতি সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় কোনো বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা কম। তারা মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান পদক্ষেপগুলোকে ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে বর্ণনা করেছেন।
এর আগে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছিলেন, ইরানের কাছ থেকে কোনো প্রস্তাব পাওয়ার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেননি। সাংবাদিকদের লেভিট বলেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কারণ ইরানকেই তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।’
এদিকে, ইরানের পেতে রাখা মাইন থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি মুক্ত করতে অন্তত ৬ মাস লাগতে পারে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনের বরাতে গতকাল বুধবার ওয়াশিংটন পোস্ট এ তথ্য জানিয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, এ দীর্ঘ সময়ের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও অনেকটা সময় চড়া থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি প্রায় বন্ধ করে রেখেছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম যেমন হু হু করে বাড়ছে, তেমনি বিশ্ব অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) পাঁচ ভাগের এক ভাগ এ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। বর্তমানে যুদ্ধবিরতি চললেও যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে এই পথটি কার্যত বন্ধই রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের অবরোধ নিয়ে অচলাবস্থা: যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে নতুন করে আলোচনা না হওয়ায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। দুপক্ষের মধ্যে সরাসরি লড়াইয়ের বদলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেই এখন মূলত ‘অবরোধ যুদ্ধ’ চলছে, যেখানে দুই পক্ষই বাণিজ্যিক জাহাজ আটক ও জব্দে শক্তি প্রয়োগ করছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের পরিস্থিতি খুবই উত্তেজনাপূর্ণ। ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই একটি সমঝোতা হবার সম্ভাবনার কথা অন্তত একজন সাংবাদিককে জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তবে এটা বাস্তবতার প্রতিফলন নাকি একজন অধৈর্য লোকের কথা, যিনি আগামী সোমবার রাজা চার্লস ৩-এর রাষ্ট্রীয় সফরের আগে আর তার অল্প কিছুদিন পরই নিজের বহুল প্রতীক্ষিত চীন সফরের পূর্বে জরুরি কাজের তালিকা থেকে ইরানকে সরিয়ে দিতে উদ্বিগ্ন—তা বোঝা কঠিন। এই ইঙ্গিত প্রত্যাখ্যান করেছে যে, তিনি তেহরানকে একটি ‘ঐক্যবদ্ধ অবস্থান’ গ্রহণের জন্য সময় দিচ্ছেন। তবে যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যেই ক্ষতবিক্ষত এই শাসনব্যবস্থা যুদ্ধবিরতি ভেঙে দিয়ে আকাশপথে আরও হামলার ঝুঁকি নেবে—এমনটা খুব সম্ভাবনাময় মনে হয় না।
তিনি তেহরানকে ‘ঐক্যবদ্ধ অবস্থান’ নেওয়ার জন্য সময় দিচ্ছেন, এমন ইঙ্গিত ইরানের প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যেই ক্ষতবিক্ষত এই শাসনব্যবস্থার যুদ্ধবিরতি ভেঙে দিয়ে আকাশপথে আরও হামলার ঝুঁকি নেওয়ার সম্ভাবনাও কম।
আলোচনার জন্য পাকিস্তানের চাপ: এদিকে শান্তি আলোচনার জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের অপেক্ষায় ইসলামাবাদ। শহরের কিছু অংশ এখনো বন্ধ, কিছু সাইনবোর্ড টাঙানো আর আলোচনা হওয়ার জন্য খালি পড়ে থাকা হোটেলও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের ফিরে আসার আশায় প্রস্তুত। তবে কয়েক দিনের উত্তেজনাকর প্রতীক্ষার পর পরিবেশ বদলে গেছে।
ওয়াশিংটন ডিসিতে সাংবাদিকদের বিমানবন্দরের দিকে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে-এমন আলোচনা, কিংবা সপ্তাহের শুরুতে কাছাকাছি থাকা একটি সামরিক ঘাঁটিতে অবতরণ করা বিশাল পরিবহন বিমান সি-১৭ গ্লোবমাস্টারের ভেতরের সম্ভাব্য সামগ্রী নিয়ে জল্পনা এখন আর নেই।
তার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে প্রমাণ করার এবং চরম শত্রুদের মধ্যে যেকোনো ধরনের একটি সমঝোতা করানোর যে সুযোগ পাকিস্তানের সামনে ছিল, তা হয়তো আপাতত ইসলামাবাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে, এমন এক ধরনের হতাশাজনক উপলব্ধি এই মুহূর্তে কাজ করছে। তবে পাকিস্তান হাল ছাড়েনি। বরং দুই পক্ষকে আলোচনায় বসাতে উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন যে, পাকিস্তান ‘সংঘাতের আলোচনাভিত্তিক সমাধানের জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে’।
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় সাংবাদিকসহ নিহত ৫: লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক নারী সাংবাদিকসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় দেশটিতে চলমান নাজুক যুদ্ধবিরতি নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছে লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ।
সংস্থাটি জানায়, বুধবার (২২ এপ্রিল) লেবাননের আত-তিরি গ্রামে একটি গাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। এতে গাড়িতে থাকা দুই ব্যক্তি নিহত হন। ইসরায়েলের দাবি, ওই গাড়ি হিজবুল্লাহর একটি সামরিক স্থাপনা থেকে বের হয়েছিল।
ঘটনার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন স্থানীয় সংবাদমাধ্যম আল আখবার-এর দুই সাংবাদিক আমাল খলিল ও জয়নব ফারাজ। ড্রোন হামলার পর একটি ভবনে আশ্রয় নিলেও সেখানে ফের বিমান হামলা চালানো হয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার পর আমাল খলিলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গুরুতর আহত জয়নব ফারাজকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, সাংবাদিকদের লক্ষ্য করেই এই হামলা চালানো হয়েছে এবং উদ্ধারকাজ ব্যাহত করতে আশপাশের সড়কেও হামলা চালানো হয়। দেশটির তথ্যমন্ত্রী পল মরকোস এ ঘটনাকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন। তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
হরমুজে জাহাজ চলাচলে ফের কঠোর ইরান: ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর কেমন প্রভাব পড়ছে—তা বোঝার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন কয়টি জাহাজ পার হচ্ছে, সেটি।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রায় আট সপ্তাহ পর গত মঙ্গলবার এই জলপথ দিয়ে মাত্র একটি জাহাজ পার হয়েছে। এরপর বুধবার যখন আরও কিছু জাহাজ পার হওয়ার চেষ্টা করে, তখন ইরান সেখানে দুটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালায়। তবে জাহাজ ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো ঠিকই এই পথ দিয়ে যাতায়াত করছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ১৩০টি জাহাজ এই প্রণালি পার হতো, সাম্প্রতিক হামলার আগে সেই সংখ্যা প্রতিদিন গড়ে মাত্র আটটিতে নেমে আসে। এরপর গত শুক্রবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ঘোষণা দেয় যে এই জলপথ পুরোপুরি উন্মুক্ত, তখন অনেক জাহাজই প্রণালিটি পার হওয়ার উদ্দেশ্যে সেদিকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টা পরই ইরান জানায়, তারা এই প্রণালিতে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর কড়াকড়ি আরোপ করবে। কারণ ওমান উপসাগরে (হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ-পূর্বে) ইরানি জাহাজের ওপর দেওয়া মার্কিন নৌ-অবরোধ তখনো প্রত্যাহার করা হয়নি।
ইরানি ৩ ট্যাঙ্কার আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্র: এশিয়ার বিভিন্ন জলসীমায় অন্তত তিনটি ইরানি পতাকাবাহী তেলের জাহাজ আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ট্যাঙ্কারগুলোর গতিপথ পরিবর্তন করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। জাহাজগুলো ভারত, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান করছিল বলে বুধবার (২২ এপ্রিল) নিরাপত্তা ও শিপিং সূত্র জানিয়েছে।
আটক হওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ডিপ সি’, ‘সেভিন’ এবং ‘ডোরেনা’ নামের ট্যাংকার। এর মধ্যে ‘ডোরেনা’ নামের সুপার ট্যাংকারটি প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহন করছিল এবং বর্তমানে ভারত মহাসাগরে একটি মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ারের তত্ত্বাবধানে রয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া ‘দেরিয়া’ নামের আরেকটি ইরানি ট্যাংকারকেও আটক করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ট্যাঙ্কারটি ভারতের উপকূলে তেল খালাস করতে ব্যর্থ হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ইরানের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে।
অপরদিকে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। প্রায় দুই মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরু হলেও, সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির মধ্যেও শান্তি আলোচনার অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠক শুক্রবারের মধ্যেই- ট্রাম্প: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনা শুক্রবারের মধ্যেই শুরু হওয়ার ‘সম্ভাবনা আছে’। বুধবার (২২ এপ্রিল) মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক পোস্টকে ট্রাম্প এবং পাকিস্তানের কর্মকর্তারাও এ তথ্য জানিয়েছেন।
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলেছেন, আগামী ‘৩৬ থেকে ৭২ ঘণ্টার’ মধ্যে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট এই অগ্রগতি সম্পর্কে ট্রাম্পের কাছে জানতে চাইলে এক টেক্সট মেসেজে তিনি লেখেন, ‘এটি সম্ভব! প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্প।’
ইরানের নেতারা যুদ্ধ বন্ধে একটি ‘ঐক্যবদ্ধ প্রস্তাব’ না নিয়ে আসা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পরদিনই এই ইতিবাচক খবর এল।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল বুধবার ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় সন্ধ্যায়। তার আগেই ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেন।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর থেকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। পাকিস্তানি এক কর্মকর্তা বলেছেন, এর ভিত্তিতেই আলোচনার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
আলোচনার পথে তিন বাধা- ইরানি প্রেসিডেন্ট: ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আন্তর্জাতিক সংলাপ এবং আঞ্চলিক সংকট নিরসনে ইরানের অবস্থান ও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পৃথক বার্তায় তারা একদিকে যেমন সংলাপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন, অন্যদিকে আলোচনার পথে বিদ্যমান অন্তরায় এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকরের শর্তগুলোও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক পোস্টে জানান, ইরান সবসময়ই সংলাপ ও সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়ে আসছে এবং এই ধারা অব্যাহত রেখেছে। তবে কার্যকর আলোচনার ক্ষেত্রে তিনটি বড় বাধার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা, অবৈধ অবরোধ আরোপ এবং অব্যাহত হুমকি প্রদানই হলো প্রকৃত আলোচনার প্রধান অন্তরায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি আরও যোগ করেন যে, বিশ্ববাসী এখন তাদের অন্তহীন কপটতা এবং কথার সাথে কাজের বৈপরীত্য প্রত্যক্ষ করছে।
অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ একটি ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি’ অর্থবহ হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মতে, নৌ-অবরোধের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার প্রক্রিয়া বন্ধ না করলে এবং ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসী মনোভাব সব ফ্রন্টে বন্ধ না হলে যুদ্ধবিরতির কোনো মানে হয় না। গালিবাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, এ ধরনের চরম আইন লঙ্ঘনের মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব নয়।
গালিবাফ আরও উল্লেখ করেন, সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে যেমন লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি, তেমনি চাপের মুখেও ইরানের কাছ থেকে কোনো ছাড় আদায় করা যাবে না। ইরানি জাতির ন্যায্য অধিকার মেনে নেওয়াই সংকটের একমাত্র সমাধান বলে তিনি মনে করেন।
ইরানে জরুরি ওষুধ সামগ্রী পাঠাল বাংলাদেশ: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে ভ্রাতৃপ্রতিম ইরানের জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ ও মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে আজ বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সকালে ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতের কাছে জরুরি ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম হস্তান্তর করা হয়েছে।
ঢাকাস্থ ইরানি দূতাবাসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মহাসচিব ড. কবির এম. আশরাফ আলম ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রাহিমি জাহানাবাদির নিকট এই সামগ্রীগুলো হস্তান্তর করেন। এ সময় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপাক্ষিক) ড. মু. নজরুল ইসলাম এবং পশ্চিম এশিয়া অনুবিভাগের মহাপরিচালক মো. হুমায়ুন কবীর উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানে আহত সাধারণ মানুষের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে গত ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক কোটি টাকা অনুদান প্রদান করেন। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিকে প্রদত্ত এই অনুদানের মাধ্যমেই আজকের এই জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামসমূহ ক্রয় করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র সচিব ড. মু. নজরুল ইসলাম মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বরাবরই বিশ্বশান্তির পক্ষে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সহায়তা গ্রহণকালে ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রাহিমি জাহানাবাদি বাংলাদেশ সরকারের এই মানবিক উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশের মানুষের এই সহমর্মিতা ও সমর্থন ইরানের জনগণের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ট্রাম্পকে বাগাড়ম্বর না করার আহ্বান পাকিস্তানের: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জনসমক্ষে বাগাড়ম্বর বা কঠোর ভাষা ব্যবহার না করার জন্য সতর্ক করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, আমরা ইরানের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি। পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। আমরা আশা করছি, ইরানের একটি প্রতিনিধিদল আলোচনায় অংশ নেবে। দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই তেহরান ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে পাকিস্তান নিবিড়ভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা সম্ভাব্য আলোচনা সফল করতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবেই ট্রাম্পকে সংযত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
শান্তির পথে বড় বাধা ইসরায়েল-ডন: ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় বড় কোনো অগ্রগতির প্রত্যাশা না থাকলেও কিছু ইতিবাচক দিক সামনে এসেছে, যা ভবিষ্যতের জন্য আশার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডনের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, আলোচনার শুরু হওয়াটাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। উভয় পক্ষ ইতোমধ্যে লিখিত খসড়া বিনিময় করেছে, যা কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েল লেবাননে তাদের হামলা কমাতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ থাকা ইরানের সম্পদ মুক্তির সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালির মতো জটিল ইস্যুগুলো এখনো অমীমাংসিত থাকায় চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। এই দীর্ঘ সংকট স্বল্প সময়ে সমাধান সম্ভব নয় এবং পারস্পরিক আস্থা তৈরিতে সময় লাগবে।
বিশেষ করে গত ফেব্রুয়ারিতে আলোচনার মাঝেই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছে—এমন ধারণা আস্থার সংকটকে আরও গভীর করেছে।
তবে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গভীর মতপার্থক্য থাকলেও একটি প্রাথমিক চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আলোচনা বন্ধ রাখা এবং ইরানের জনগণের ওপর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের মতো ইস্যুগুলো সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মধ্যেই সমাধান হওয়া উচিত বলেও মত দেওয়া হয়েছে।
‘ট্রাম্পের অনুরোধে’ ৮ নারীর মৃত্যুদণ্ড স্থগিত: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান তার অনুরোধের প্রতি সম্মান জানিয়ে আট নারী বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে তেহরানের কর্মকর্তারা এ দাবিকে পুরোপুরি অস্বীকার করে এটিকে ভিত্তিহীন ও মিথ্যা বলে উল্লেখ করেছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার (২২ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘খুবই ভালো খবর। আট নারীর মধ্যে চারজনকে তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তি দেয়া হবে এবং বাকি চারজনকে এক মাসের কারাদণ্ড দেয়া হবে।’ ট্রাম্প আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার অনুরোধকে সম্মান জানিয়ে ইরান ও তাদের নেতারা পরিকল্পিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বন্ধ করেছে—এ জন্য আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।’
তবে ইরান এ পুরো বিষয়টিকেই ‘মনগড়া কাহিনী’ বলে অভিহিত করেছে এবং জানিয়েছে যে, ট্রাম্প মুখরক্ষার চেষ্টা করছেন। দেশটির বিচার বিভাগের সংবাদ সংস্থা মিজান জানিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে কৃতিত্ব নেয়ার চেষ্টা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বুধবার এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে হোয়াইট হাউস বা ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেউই তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
ওয়াশিংটনে ইসরায়েল-লেবানন দ্বিতীয় দফার বৈঠক: ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে দ্বিতীয় দফার বৈঠক আজ বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বর্তমানে চলমান ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ আলোচনা চলছে।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন জানিয়েছেন, রাষ্ট্রদূত পর্যায়ের এ আলোচনার মূল ভিত্তি হলো, ইসরায়েলি আগ্রাসন সম্পূর্ণ বন্ধ করা, লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ও বন্দিবিনিময়। এ ছাড়া, আন্তর্জাতিক সীমান্তে লেবানন সেনাবাহিনীর মোতায়েন এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে বৈরুত।
এর আগে গত ১৬ এপ্রিল প্রথম দফার আলোচনার পর দুই দেশের মধ্যে ১০ দিনের একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী ওইদিন দিবাগত রাত ৩টা থেকে এ যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে ৩১ জাহাজ ফেরত পাঠানোর দাবি: ইরানের বিরুদ্ধে আরোপ করা নৌ অবরোধে ৩১টি জাহাজের দিক বদল করতে বা বন্দরে ফিরতে নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব নৌযানের বেশিরভাগই জ্বালানি তেলের ট্যাংকার। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টকম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।
সেন্টকম বলেছে, ‘বেশিরভাগ জাহাজ মার্কিন নির্দেশনা মেনে চলেছে।’ ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপ করা নৌ অবরোধে ১০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা, দেশটির ১৭টি যুদ্ধজাহাজ এবং শতাধিক বিমান অংশ নিয়েছে বলেও জানিয়েছে সেন্টকম।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর পরপরই বিশ্ববাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয় তেহরান। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, মার্কিন নৌ অবরোধ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পথে বাধা।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

