যুদ্ধে মৃত্যুপুরী সুদানে হাম মহামারিতে শিশুদের হাহাকার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৪৮
সুদানের পশ্চিমের অশান্ত অঞ্চল দারফুরে গৃহযুদ্ধ আর প্রশাসনিক অবহেলার চরম মূল্য দিচ্ছে অবোধ শিশুরা। দেশটিতে চলমান যুদ্ধের কারণে ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থার সুযোগে ছড়িয়ে পড়েছে অত্যন্ত সংক্রামক রোগ 'হাম'। গত কয়েক সপ্তাহে পূর্ব দারফুরের লাবাদো জেলায় অন্তত ৭০ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
ঔষধের অভাব, টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ হওয়া
এবং চিকিৎসকদের এলাকা ত্যাগের কারণে প্রতিটি ঘরে ঘরে এখন মৃত্যু আর কান্নার সুর।
লাবাদোর বাসিন্দা ৩৭ বছর বয়সী হাওয়া আদম
কখনও ভাবেননি, তার দুই বছর বয়সী সন্তান আলীকে সামান্য শৈশবকালীন রোগে হারাতে হবে। গত
২৫ ফেব্রুয়ারি আলী অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং মাত্র দুই দিনের মাথায় তার মৃত্যু হয়।
হাওয়া আদম বলেন, "আমি ভেবেছিলাম এটি
শিশুদের সাধারণ কোনো অসুখ হবে। কল্পনাও করিনি বিনা চিকিৎসায় আমার সন্তান মারা যাবে।
এখানে না আছে টিকা, না আছে কোনো ডাক্তার।"
যুদ্ধের কারণে এই অঞ্চলের অধিকাংশ দক্ষ
চিকিৎসক প্রতিবেশী দেশ দক্ষিণ সুদান বা উগান্ডায় পালিয়ে গেছেন। ফলে সামর্থ্যহীন পরিবারগুলোর
সামনে সন্তানদের ধুঁকে ধুঁকে মরতে দেখা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।
লাবাদো ক্রাইসিস ইউনিটের সমন্বয়ক মোহাম্মদ
আবদেল আজিজ জানান, মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে ১২টি আবাসিক এলাকায় প্রায়
১,০০০ শিশু আক্রান্ত হয়েছে। ১২,০০০ জনসংখ্যার এই জনপদে স্থানীয়দের পাশাপাশি যুদ্ধের
কারণে বাস্তুচ্যুত অসংখ্য মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন, যা সংক্রমণের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে
দিয়েছে।
তবে সরকারি পরিসংখ্যান ও স্থানীয়দের দেওয়া
তথ্যের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। পূর্ব দারফুরের স্বাস্থ্য পরিচালক ডক্টর জাবির
আল-নাদিফ মাত্র ২৬ জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছেন। তার দাবি, টিকা সরবরাহে ঘাটতি
ছিল যা সম্প্রতি চাদ সীমান্ত দিয়ে ইউনিসেফের সহায়তায় সুদানে পৌঁছেছে। তবে মাঠপর্যায়ের
কর্মীরা বলছেন, মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি, যা নথিবদ্ধ হচ্ছে না।
লাবাদোর নীল পাড়ায় একই পরিবারের তিন ভাই-বোন
তাদের সন্তানদের হারিয়েছেন কয়েক দিনের ব্যবধানে। ইসমাইল ইসা হারিয়েছেন তার দুই বছরের
মেয়েকে, তার ভাই হারিয়েছেন ১৮ মাস বয়সী ছেলেকে এবং তাদের বোন হারিয়েছেন তিন বছরের শিশুসন্তানকে।
ইসমাইল বলেন, "আমরা পানি দিয়ে শরীর
মুছিয়ে বা ভেষজ লতাপাতা দিয়ে চুলকানি কমানোর চেষ্টা করেছি। আমাদের ঔষধ কেনার সামর্থ্য
ছিল না, আর থাকলেও বাজারে ঔষধ পাওয়া যায় না।" বর্তমানে ব্যক্তিগত ফার্মেসিগুলোতে
অ্যান্টিবায়োটিক বা স্যালাইনের দাম আকাশচুম্বী। এক সেট অ্যান্টিবায়োটিকের দাম ১০,০০০
থেকে ১৫,০০০ সুদানি পাউন্ড, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। সরকারি কেন্দ্রে ঔষধ
ফুরিয়ে যাওয়ায় দরিদ্র বাবা মায়েরা এখন প্রকৃতির ওপর ভাগ্যের লিখন সঁপে দিয়েছেন।
ইউনিসেফের সুদান মুখপাত্র ইভা হিন্ডস বলেন,
"অনিরাপত্তা, বাস্তুচ্যুতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্য কাঠামোর কারণে টিকা দান
কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।" তথ্যানুযায়ী, সুদানে হামের টিকার কভারেজ
কমে ৪৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা কয়েক দশকের শিশু স্বাস্থ্যসেবাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
ডাব্লুএইচও এর মতে, হাম বিশ্বের অন্যতম
সংক্রামক রোগ যা নিশ্বাসের মাধ্যমে বা সংস্পর্শে দ্রুত ছড়ায়। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা
শিশুদের জন্য এটি প্রাণঘাতী। দারফুরে যুদ্ধের কারণে গত এক বছরে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি
প্রায় পুরোপুরি বন্ধ ছিল, যার ফলশ্রুতিতে এখন এই ভয়াবহ মহামারি দেখা দিয়েছে।
লাবাদোর অনেক মা তাদের অসুস্থ সন্তানকে
নিয়ে মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিচ্ছেন চিকিৎসার আশায়। ২৮ বছর বয়সী আসমা জালালুদ্দিন
তার তিন বছর বয়সী অসুস্থ মেয়ে মাশায়েরকে নিয়ে ৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শুয়াইরিয়া
গিয়েছিলেন। সেখানে পৌঁছানোর পর কিছু ভিটামিন ও জ্বর কমানোর ঔষধ পেয়ে তার শিশুটি ধীরে
ধীরে চোখ মেলতে শুরু করেছে।
আসমা বলেন, "টিকাদান বন্ধ থাকার কারণেই
লাবাদোর ঘরে ঘরে রোগটি ছড়িয়েছে।" সুদানের দারফুরে এখন কেবল বারুদের গন্ধ নয়, ছড়াচ্ছে
মহামারির বিষবাষ্প। একদিকে আরএসএফ ও সুদানি সেনাবাহিনীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, অন্যদিকে
চিকিৎসার অভাবে নীরবে ঘটে যাওয়া শিশু মৃত্যু। আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো টিকা কর্মসূচি
শুরু করার পরিকল্পনা করলেও দুর্গম এলাকা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তা কতটুকু সফল
হবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।
হাওয়া আদমের মতো অনেক মায়ের আর্তনাদ এখন
সুদানের আকাশে বাতাসে: "যাদের টাকা নেই, দারফুরে তাদের কোনো বাঁচার অধিকার নেই।"
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

