রাশিয়ার কোন অঞ্চল এখন 'নিরাপদ' নয়: রবার্ট ব্রোভডি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৫১
ইউক্রেনের ড্রোন ইউনিটের কমান্ডার রবার্ট ব্রোভডি
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের রণকৌশলে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন ইউক্রেনের ড্রোন ইউনিটের কমান্ডার রবার্ট ব্রোভডি, যিনি রণাঙ্গনে ‘মাগইয়ার’ নামে সমধিক পরিচিত।
সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি-কে
দেওয়া এক বিরল সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, রাশিয়ার অভ্যন্তরে জ্বালানি অবকাঠামো এবং
সৈন্যবাহিনীর ওপর ড্রোন হামলা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যা ক্রেমলিনের জন্য কয়েক বিলিয়ন
ডলারের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্রোভডি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন,
"রাশিয়ার অভ্যন্তরে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কিলোমিটার এলাকা এখন আর তাদের জন্য 'নিরাপদ
অঞ্চল' নয়। ইউক্রেনের স্বাধীনতা-কামী 'পাখি' (ড্রোন) এখন রাশিয়ার যেকোনো জায়গায় যখন
খুশি উড়ে যেতে পারে।"
ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলোর প্রধান লক্ষ্যবস্তু
এখন রাশিয়ার তেল শোধনাগার এবং রপ্তানি কেন্দ্রগুলো। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি
এই হামলাগুলোকে মস্কোর জন্য "অত্যন্ত বেদনাদায়ক" বলে অভিহিত করেছেন। জ্বালানি
খাতে রাশিয়ার এই ক্ষতির পরিমাণ কয়েক দশ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
কমান্ডার ব্রোভডি এই হামলার যৌক্তিকতা
তুলে ধরে বলেন, "পুতিন প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন করে সেটিকে রক্ত-মাখা ডলারে রূপান্তর
করেন, যা দিয়ে আমাদের ওপর ব্যালিস্টিক মিসাইল ছোঁড়া হয়। যদি তেল শোধনাগার যুদ্ধের অর্থ
জোগানের হাতিয়ার হয়, তবে সেটি ধ্বংস করা আমাদের বৈধ সামরিক লক্ষ্য।"
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রাশিয়ার কৃষ্ণসাগর
উপকূলের তুয়াপসে শোধনাগারে উপর্যুপরি ড্রোন হামলায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে
পড়েছে।
ইউক্রেন বর্তমানে এক বিশাল জনবল সংকটে
ভুগছে। রাশিয়ার বিশাল সৈন্যবাহিনীর মোকাবিলায় তারা এখন প্রযুক্তির আশ্রয় নিচ্ছে। কমান্ডার
ব্রোভডি জানান, তার ইউনিটের ওপর সরাসরি নির্দেশ রয়েছে—রাশিয়া প্রতি মাসে যত সৈন্য নিয়োগ
করছে, তার চেয়ে বেশি সৈন্য ড্রোন দিয়ে খতম করতে হবে।
তিনি জানান, রাশিয়া প্রতি মাসে গড়ে ৩০,০০০
সৈন্য নিয়োগ করে। তার ড্রোন বাহিনী প্রতি মাসে এই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
ব্রোভডির ভাষায়, "এটি একটি কিল প্ল্যান।
আমাদের ড্রোন হামলার ৩০ শতাংশই পরিচালিত হয় রুশ সেনাদের ওপর। প্রতিটি হামলার ভিডিও
প্রমাণ থাকতে হয়, অন্যথায় সেটি হিসেবে ধরা হয় না।" ড্রোনের মাধ্যমে শত্রু সেনাদের
ওপর নজরদারি এবং নিখুঁত হামলার ফলে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর নিজস্ব প্রাণহানির হার
১ শতাংশের নিচে রাখা সম্ভব হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর চার বছর আগে রবার্ট ব্রোভডি
ছিলেন একজন সফল শস্য ব্যবসায়ী এবং শিল্প সংগ্রাহক। ক্লিন শেভড এই ব্যবসায়ী এখন লম্বা
দাড়ি আর সামরিক পোশাকে ইউক্রেনের আকাশযুদ্ধের প্রধান কারিগর। খেরসনে রুশ গোলাবর্ষণের
মুখে আটকা পড়ে তিনি প্রথম ড্রোনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। নিজের সন্তানদের জন্য কেনা
একটি সাধারণ ড্রোন দিয়ে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ ইউক্রেনের ৪১৪তম ব্রিগেডে বা ‘বার্ডস অফ মাগইয়ার’-এ রূপ নিয়েছে।
কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, ব্রোভডির
লক্ষ্য রাশিয়ার জনগণের মনোবল ভেঙে দেওয়া। রাশিয়ার গভীর ভূখণ্ডে দাউ দাউ করে জ্বলতে
থাকা তেল শোধনাগার আর মৃত সৈনিকদের খবর রুশ সাধারণ মানুষের মধ্যে যুদ্ধের ভয়াবহতা পৌঁছে
দিচ্ছে। রাশিয়ার তুয়াপসের এক নারীর কান্নায় ভেঙে পড়ার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যা ইঙ্গিত
দিচ্ছে যে পুতিনের তথাকথিত ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ এখন খোদ রাশিয়ার ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ব্রোভডি
বলেন, "আমাদের লক্ষ্য রাশিয়ার সীমানা দখল করা নয়, বরং তাদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো
এবং তাদের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই প্রশ্ন তোলা—কেন তারা এই যুদ্ধ করছে?"
ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো এখন আগের চেয়ে সস্তা
এবং শক্তিশালী। ১,০০০ কিমি থেকে ২,০০০ কিমি পাল্লার এসব ড্রোন তৈরিতে ইউক্রেনীয় প্রকৌশলীরা
অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছেন। ভূগর্ভস্থ গোপন বাঙ্কার থেকে উচ্চপ্রযুক্তির স্ক্রিনে বসে
সারা দেশের যুদ্ধ তদারকি করছেন ব্রোভডির জওয়ানরা।
জেলেনস্কির ভাষায়, এই 'ড্রোন সেনাবাহিনী'
ইউক্রেনের টিকে থাকার যুদ্ধে এক অপরিহার্য শক্তি হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার
বিশাল সামরিক শক্তির বিপরীতে ইউক্রেনের এই অসম ড্রোন যুদ্ধ কেবল প্রতিরোধ নয়, বরং রাশিয়ার
ক্ষমতার ভিতকেও নাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

