লিবার্টিজের প্রতিবেদন
ইউরোপজুড়ে হুমকির মুখে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ২০:২০
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক ও আইনি হামলা বাড়ছে, অন্যদিকে গুটিকয়েক ধনকুবেরের হাতে সংবাদমাধ্যমের মালিকানা কুক্ষিগত হওয়ায় জনআস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
নাগরিক অধিকার রক্ষা বিষয়ক শীর্ষস্থানীয়
সংস্থা ‘লিবার্টিজ’ তাদের
পঞ্চম বার্ষিক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে
সতর্ক করা হয়েছে যে, ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে গণমাধ্যমের বহুত্ববাদ এবং স্বাধীনতা এখন
'অব্যাহত আক্রমণের' শিকার। সংস্থাটি ইইউ কর্মকর্তাদের এই বিষয়ে 'হাই অ্যালার্ট' বা
সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল ছিল ইউরোপীয়
সাংবাদিকদের জন্য অন্যতম এক আতঙ্কের বছর। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে বোমা হামলার
মতো ঘটনাও ঘটেছে। ইতালিতে বিশিষ্ট অনুসন্ধানী সাংবাদিক সিগফ্রিডো রানুচ্চির গাড়ির
নিচে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। গ্রিসের এথেন্সে সাপ্তাহিক পত্রিকা 'তো ভিমা'-র সম্পাদক
ইয়ানিস প্রিটেন্টেরিসের বাসভবনে পাঁচ কেজি টিএনটি সম্বলিত একটি শক্তিশালী বিস্ফোরক
নিক্ষেপ করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, কেবল ইতালিতেই গত বছর
১১৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১৫টি ছিল সরাসরি শারীরিক সহিংসতা। বর্তমানে ইতালির
অন্তত ২০ জন সাংবাদিক পুলিশি পাহারায় জীবনযাপন করছেন, যা ইউরোপের মধ্যে সর্বোচ্চ।
নেদারল্যান্ডসেও টানা তৃতীয় বছরের মতো সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হুমকির ঘটনা বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের
লক্ষ্য করে রেকর্ড ৩৭৭টি গুরুতর অনলাইন হামলা বা সাইবার বুলিং চালানো হয়েছে। এর মধ্যে
রয়েছে প্রাণনাশের হুমকি ও কুৎসা রটনা। হাঙ্গেরি, মাল্টা এবং রোমানিয়ার মতো দেশগুলোতে
খোদ রাজনীতিবিদরাই সংবাদমাধ্যমকে "অন্ধকারের শক্তি" বা "বিদেশি প্রোপাগান্ডা
মেশিন" হিসেবে আখ্যা দিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। এছাড়া ইতালি ও রোমানিয়ায় সাংবাদিকদের
ওপর রাষ্ট্রীয় নজরদারির মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে।
লিবার্টিজ তাদের প্রতিবেদনে সংবাদপত্রের
মালিকানা কেন্দ্রিক জটিলতাকে গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফ্রান্সে
ভিনসেন্ট বোলোরের মতো কয়েকজন বিলিয়নেয়ার অধিকাংশ প্রভাবশালী গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করছেন।
হাঙ্গেরিতে সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের ঘনিষ্ঠ ফাউন্ডেশনগুলো অধিকাংশ
মিডিয়া আউটলেট দখল করে রেখেছে। স্লোভাকিয়া ও জার্মানিতেও একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য
করা গেছে। মালিকানার এই কেন্দ্রীকরণ সংবাদপত্রের নিরপেক্ষতা নষ্ট করছে এবং ভিন্নমতকে
সংকুচিত করছে।
জনসাধারণের ট্যাক্সের টাকায় চলা পাবলিক
মিডিয়া বা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ গত এক বছরে চরম আকার ধারণ করেছে।
স্লোভাকিয়ায় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও রেডিও এখন সরাসরি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে।
হাঙ্গেরিতে গত ১২ এপ্রিলের নির্বাচনের আগে সরকারি প্রচারণার হার রেকর্ড ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছিল।
অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ফ্রান্স, জার্মানি ও বেলজিয়ামে পাবলিক মিডিয়ার বাজেট কমানো
হচ্ছে এবং অনেক স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের আস্থায়।
জরিপকৃত ২২টি ইইউ দেশের মধ্যে মাত্র তিনটিতে (জার্মানি ও আয়ারল্যান্ডসহ) সংবাদমাধ্যমের
ওপর উচ্চ আস্থা পাওয়া গেছে। বিপরীতে গ্রিস, রোমানিয়া এবং বুলগেরিয়ায় গণমাধ্যমের
ওপর জনগণের আস্থা আশঙ্কাজনকভাবে কম।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় ইউরোপীয়
ইউনিয়নে ‘অ্যান্টি-স্ল্যাপ’
ডিরেক্টিভ এবং ‘ইউরোপীয় মিডিয়া
ফ্রিডম অ্যাক্ট’ এর মতো শক্তিশালী আইন থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন অত্যন্ত ধীর। লিবার্টিজের
সিনিয়র অ্যাডভোকেসি অফিসার ইভা সাইমন বলেন, “একটি সুস্থ ও বহুত্ববাদী সংবাদমাধ্যম হলো
গণতন্ত্রের লিটমাস টেস্ট। যেখানে আইনের শাসন দুর্বল হয়, সেখানেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা
ক্ষুণ্ণ হয়। ইইউ সদস্য দেশগুলোর উচিত দ্রুত এবং কঠোরভাবে এই সুরক্ষা আইনগুলো কার্যকর
করা।”
বিশ্লেষকদের মতে, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ
না নেওয়া হয়, তবে ইউরোপের দেশগুলোতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ
থেকে যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

