কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটোর প্রতিশ্রুতি ছিল—একটি উন্নত ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় সাশ্রয়ী চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। যে প্রযুক্তিকে আশীর্বাদ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, সেটিই এখন কেনিয়ার লাখ লাখ দরিদ্র মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথাকথিত এই ‘স্মার্ট’ অ্যালগরিদমটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে দরিদ্রদের
ওপর অস্বাভাবিক প্রিমিয়ামের বোঝা চাপাচ্ছে, অন্যদিকে ধনিক শ্রেণির আয় কমিয়ে দেখিয়ে
তাদের কম খরচে সুবিধা পাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
২০২৩ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রেসিডেন্ট
রুটো জোর গলায় বলেছিলেন, "কোনো কেনিয়ান পেছনে পড়ে থাকবে না।" সেই লক্ষ্যেই
২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে কয়েক দশকের পুরনো জাতীয় বিমা ব্যবস্থা বদলে চালু করা হয় ‘সোশ্যাল হেলথ
অথরিটি’। উদ্দেশ্য ছিল কেনিয়ার মোট কর্মীবাহিনীর
৮৩ শতাংশ, যারা হকার, দিনমজুর বা প্রান্তিক কৃষক—তাদের বিমার আওতায় আনা।
কিন্তু ‘আফ্রিকা আনসেন্সরড’, ‘লাইটহাউস রিপোর্টস’ এবং ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর যৌথ তদন্ত বলছে, এই সিস্টেমটি কোনো
অত্যাধুনিক এআই (যেমন চ্যাটজিপিটি) নয়, বরং একটি পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ ‘প্রেডিক্টিভ মেশিন
লার্নিং’ অ্যালগরিদম ব্যবহার করছে। এই অ্যালগরিদমটি
‘প্রক্সি মিনস টেস্টিং’ পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা মূলত বিশ্বব্যাংকের একটি
বিতর্কিত মডেলে পরিচালিত।
নাইরোবির বস্তি এলাকাগুলোতে কাজ করেন গ্রেস
আমানি (ছদ্মনাম)। তিনি একজন সরকারি স্বেচ্ছাসেবক। প্রতিদিন তাকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের
ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। "আপনার টয়লেটটি কেমন? ঘরের চালা
কীসের তৈরি? বাড়িতে কি রেডিও আছে?"—এমন ডজনখানেক
প্রশ্নের উত্তর যখন একটি অ্যাপে ইনপুট দেওয়া হয়, তখন অ্যালগরিদমটি নির্ধারণ করে ওই
পরিবারকে বছরে কত টাকা স্বাস্থ্যবিমা দিতে হবে।
আমানি জানান, তিনি নিজের চোখে দেখছেন কীভাবে
ধুঁকতে থাকা পরিবারগুলোর ওপর তাদের আয়ের ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত প্রিমিয়াম চাপিয়ে
দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, স্বচ্ছল পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই হিসাব অনেক কম।
তিনি বলেন, "মানুষ মারা যাচ্ছে, মানুষ
কষ্ট পাচ্ছে। তারা ভেবেছিল এটি তাদের সাহায্য করবে, কিন্তু বাস্তবে এটি তাদের শেষ সম্বলটুকুও
কেড়ে নিচ্ছে।"
তদন্তকারীরা হাজার হাজার পরিবারের তথ্য
নিয়ে এই সিস্টেমটি অডিট করেছেন। ফলাফল ছিল চমকে ওঠার মতো। দেখা গেছে, দরিদ্রদের আয়ের
হিসাব প্রকৃত আয়ের চেয়ে অনেক বেশি ধরা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, দুইজন সাধারণ কৃষকের কাছে
বিদ্যুৎ সংযোগ এবং নিজেদের থাকার ঘর থাকার কারণে অ্যালগরিদম তাদের আয় বাস্তবের চেয়ে
দ্বিগুণ দেখিয়েছে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ডেভিড খাউয়া, যিনি
একসময় সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ছিলেন, একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন।
তিনি জানান, সিস্টেমটি তৈরির সময় একটি পছন্দ বেছে নিতে হয়েছিল: হয় এটি দরিদ্রদের আয়
সঠিকভাবে হিসাব করবে, অথবা ধনীদের। সরকার ধনীদের আয় সঠিকভাবে মূল্যায়নের দিকেই বেশি
মনোযোগ দিয়েছে, যার ফলে দরিদ্রদের ওপর অতিরিক্ত চার্জের খড়্গ নেমে এসেছে।
তার মতে, "একজন ধনী ব্যক্তিকে যদি
ভুল করে দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং সে কম টাকা দেয়, তবে সে কখনো নিজে এসে বলবে
না যে আমার বেশি টাকা দেওয়া উচিত। তাই সরকার সম্ভবত রাজস্ব নিশ্চিত করতে গিয়ে গরিবদের
ওপরই বোঝা চাপিয়েছে।"
কেনিয়ার এই সংকট নতুন কিছু নয়। উন্নয়ন
অর্থনীতিবিদ স্টিফেন কিডের মতে, বিশ্বব্যাংক এই ‘প্রক্সি মিনস টেস্টিং’ মডেলটি এশিয়া, আফ্রিকা
ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোতে ঋণের শর্ত হিসেবে চাপিয়ে দেয়। ইন্দোনেশিয়ায় এই মডেলটি
লক্ষ্যভুক্ত জনগোষ্ঠীর ৮২ শতাংশকে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং রুয়ান্ডায় এর ত্রুটির
হার ছিল ৯০ শতাংশ। কেনিয়ার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, অর্ধেকের বেশি দরিদ্র পরিবারকে ভুলভাবে
অতিরিক্ত চার্জ করা হচ্ছে। সরকার আগে থেকে সতর্কবার্তা পেলেও তা কানে তোলেনি।
আইডিনসাইট নামক একটি আন্তর্জাতিক ডাটা
কনসালটেন্সি ফার্ম আগেই সরকারকে প্রতিবেদন দিয়েছিল যে, এই সিস্টেমটি অসম এবং এখানে
নিম্ন আয়ের মানুষের তথ্য অত্যন্ত কম। তবুও এটি চালু করা হয়।
বর্তমানে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে,
২০ কোটি নিবন্ধিত মানুষের মধ্যে মাত্র ৫০ লাখ মানুষ নিয়মিত প্রিমিয়াম দিচ্ছেন, হাসপাতালে
বকেয়া টাকা পরিশোধ না করায় অনেক হাসপাতাল রোগীদের ফিরিয়ে দিচ্ছে। সাবেক রাজনৈতিক নেতাদের
মতে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে এই সিস্টেমটি পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে।
রুরাল অ্যান্ড আরবান প্রাইভেট হসপিটালস
অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ডা. ব্রায়ান লিশেঙ্গা এই পুরো বিষয়টিকে একটি ‘ব্যর্থ পরীক্ষা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, "এটি দরিদ্রদের চেনার জন্য খুব বাজে একটি সরঞ্জাম, কিন্তু সরকারের
দায়িত্ব এড়ানোর জন্য এটি একটি চমৎকার হাতিয়ার।"
প্রযুক্তির মোড়কে কেনিয়ার এই স্বাস্থ্য
সংস্কার এখন এক বড় মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। যেখানে ডিজিটাল রূপান্তরের স্বপ্ন ছিল
মুক্তির, সেখানে এটি এখন প্রান্তিক মানুষের জন্য এক ডিজিটাল কারাগার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের খবর/ এম.আর

