জাপানে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির সংস্কার প্রস্তাব ঘিরে তীব্র বিতর্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ১৯:৪১
জাপানের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী শান্তিবাদী সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে দেশটিতে সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে যে স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে, তা এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। সংবিধান সংশোধন করে দেশটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক শক্তিতে রূপান্তরের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির অনড় অবস্থান এবং এর বিপরীতে সাধারণ জনগণের নজিরবিহীন গণবিক্ষোভ জাপানকে এক গভীর মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
গত রোববার সংবিধান দিবসে টোকিওসহ জাপানের
বড় বড় শহরগুলোতে লাখ লাখ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে যে, জাপানিরা
তাদের ‘শান্তিবাদী’ পরিচয়
সহজে বিসর্জন দিতে রাজি নয়।
বর্তমানে ভিয়েতনাম সফরে থাকা জাপানি প্রধানমন্ত্রী
সানায়ে তাকাইচি হানোই থেকে সংবিধান সংশোধন নিয়ে তাঁর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
তিনি বলেন, "বর্তমান সংবিধানটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন দখলদার বাহিনী
দ্বারা প্রণীত হয়েছিল। সময়ের দাবি অনুযায়ী এবং বর্তমান পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে
আমাদের এই সর্বোচ্চ আইনটি পর্যায়ক্রমে আপডেট করা প্রয়োজন।"
তাকাইচি এবং ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক
পার্টির (এলডিপি) রক্ষণশীল অংশের দীর্ঘদিনের যুক্তি হলো, বর্তমান সংবিধান জাপানের হাত-পা
বেঁধে রেখেছে। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাবের
মুখে জাপান সামরিকভাবে যথাযথ সাড়া দিতে পারছে না।
বিশেষ করে সংবিধানের ‘অনুচ্ছেদ ৯’ সংশোধনের লক্ষ্য নিয়েছেন তাকাইচি।
এই অনুচ্ছেদটি জাপানকে যেকোনো আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে বলপ্রয়োগ বা যুদ্ধের হুমকি
প্রদান থেকে নিষিদ্ধ করে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সংস্কার প্রস্তাবের
প্রতিবাদে টোকিও’র একটি পার্কে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সমবেত হন। ১৯৪৭ সালের ৩ মে কার্যকর
হওয়ার পর থেকে এই সংবিধানের একটি শব্দও আজ পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয়নি। বিক্ষোভকারীদের
হাতে ছিল যুদ্ধবিরোধী প্ল্যাকার্ড এবং স্লোগান। তাদের মতে, এই সংবিধানই জাপানকে আমেরিকার
হয়ে বিভিন্ন ‘ভুল যুদ্ধে’
(যেমন ইরান বা মধ্যপ্রাচ্য সংকট) জড়ানো থেকে বিরত রেখেছে।
টোকিও’র এক ওয়ার্ড কাউন্সিলর হিরোকো মায়েকাওয়া
ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "তাকাইচির অধীনে জাপান এখন তার মালিকের পেছনে হাঁটা একটি
বাধ্য কুকুরের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলডিপি চায় আত্মরক্ষা বাহিনীকে একটি প্রথাগত সেনাবাহিনীতে
রূপান্তর করতে, কারণ বর্তমান সংবিধান তাদের সেই সুযোগ দিচ্ছে না।"
মেগুমি কোইকে নামে আরেকজন স্থানীয় নেতা
বলেন, "জাপানের সংবিধান কেবল আমাদের জাতীয় সম্পদ নয়, এটি পুরো বিশ্বের জন্য একটি
সম্পদ। তাকাইচি ভাবছেন উত্তর কোরিয়া বা চীনের ভয় দেখিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা যাবে,
কিন্তু মানুষ জানে—আমাদের এখন অস্ত্র নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানে
বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।"
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৮৭ বছর বয়সী হারুকা
ওয়াতানাবে ওসাকা থেকে বার্তা সংস্থা কিয়োডোকে বলেন, "আমি এই সংবিধানকে আমার নিজের
সন্তানের মতো আগলে রাখতে চাই। আমি যুদ্ধের সেই ভয়াবহতা দেখেছি, যা পরবর্তী প্রজন্মকে
আর দেখতে দিতে চাই না।" জাপানের সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ মনে করে, ১৯৪৫ সালের
হিরোশিমা-নাগাসাকি ট্র্যাজেডির পর এই সংবিধানই জাপানের পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদী শান্তির
ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতেও এই বিভাজন স্পষ্ট।
রক্ষণশীল সংবাদপত্র ‘ইয়োমিউরি শিমবুন’-এর জরিপ অনুযায়ী ৫৭
শতাংশ মানুষ ছোটখাটো সংশোধনের পক্ষে। অন্যদিকে উদারপন্থী ‘আসাহি শিমবুন’ বলছে, সংস্কারের পক্ষে সমর্থন
মাত্র ৪৭ শতাংশ।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড
ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীতে জাপানি নৌবাহিনী পাঠানোর অনুরোধ জানালে তাকাইচি তা প্রত্যাখ্যান
করেন। যদিও তিনি এটি করতে অনিচ্ছুক ছিলেন, তবুও সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদের দোহাই
দিয়ে তিনি মার্কিন চাপ এড়াতে সক্ষম হন। এটি প্রমাণ করে যে, এই সংবিধানটি জাপানের জন্য
একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করছে।
তবে মজার বিষয় হলো, খোদ টোকিওতে অবস্থিত
মার্কিন দূতাবাস তাদের অফিসিয়াল ‘এক্স’ (টুইটার) হ্যান্ডেলে সংবিধানের প্রশংসা করে একটি পোস্ট করেছে।
সেখানে বলা হয়েছে, "৭৯ বছর ধরে এই সংবিধান জাপানের মানবাধিকার এবং শান্তিবাদী
সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে, যা জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার তাঁর আত্মজীবনীতেও
উচ্চকিত প্রশংসা করেছিলেন।"
তাকাইচি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রস্তুতি
নিচ্ছেন, যেখানে প্রতিরক্ষা এবং খনিজ সম্পদ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজের
সঙ্গে আলোচনা করবেন। যাওয়ার আগে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, "স্রেফ আলোচনার জন্য
আলোচনার সময় শেষ। জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হলে রাজনীতিবিদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।"
জাপানের আইন অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধন করতে
হলে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং পরবর্তীতে একটি জাতীয়
গণভোটে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাকাইচি সেই লক্ষ্য অর্জন
করতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।
ফেব্রুয়ারি মাসে যেখানে ৩,৬০০ মানুষ বিক্ষোভ
করেছিল, মাত্র দুই মাসের মাথায় সেই সংখ্যা ৫০ হাজারে পৌঁছেছে। টোকিওর রাজপথের এই জনস্রোত
ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, জাপানি জাতীয়তাবাদের নামে সামরিকায়নের যে স্বপ্ন তাকাইচি দেখছেন,
তা বাস্তবায়ন করা তাঁর জন্য মোটেও সহজ হবে না। জাপানের শান্তিপ্রিয় জনগণ তাদের ঐতিহাসিকভাবে
অর্জিত ‘শান্তিবাদী’ পরিচয়
রক্ষা করতে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
বাংলাদেশের খবর/ এম.আর

