Logo

আন্তর্জাতিক

রাশিয়ার একচ্ছত্র আধিপত্য রুখতে আর্মেনিয়ার পাশে ইইউ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ১৯:৪৭

রাশিয়ার একচ্ছত্র আধিপত্য রুখতে আর্মেনিয়ার পাশে ইইউ

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশ আর্মেনিয়ার ওপর রাশিয়ার দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্য এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। মস্কোর ছায়া থেকে বেরিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে ইয়েরেভান। এরই অংশ হিসেবে রাশিয়ার তথাকথিত ‘অপপ্রচার’ এবং হস্তক্ষেপ’ মোকাবিলায় আর্মেনিয়ায় বিশেষজ্ঞ দল পাঠাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

আগামী মঙ্গলবার ইয়েরেভানে ইউরোপীয় নেতাদের এক ঐতিহাসিক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে ক্রেমলিনের প্রভাব কমানোর লড়াইয়ে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা ইয়েরেভানে মিলিত হবেন। এই সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ-আর্মেনিয়া নতুন মিশনের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে।

জানা গেছে, ২০ থেকে ৩০ জন বেসামরিক বিশেষজ্ঞের একটি দল আর্মেনিয়ায় দুই বছরের জন্য মোতায়েন করা হবে। এই দলটির প্রধান কাজ হবে রাশিয়ার সাইবার হামলা প্রতিরোধ করা, তথ্য বিকৃতি বা প্রোপাগান্ডা মোকাবিলা করা এবং অবৈধ আর্থিক প্রবাহ বা মানি লন্ডারিং রোধ করা। আগামী ৭ জুন আর্মেনিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় নির্বাচনের পর এই মিশন কাজ শুরু করবে। এছাড়া নির্বাচনের আগে জনমত প্রভাবিত করার রুশ প্রচেষ্টা রুখতে একটি হাইব্রিড র‍্যাপিড রেসপন্স টিম’ পাঠানোর ঘোষণাও দিয়েছে ইইউ-এর পররাষ্ট্র বিভাগ।

আর্মেনিয়া দীর্ঘকাল ধরে ককেশাস অঞ্চলে রাশিয়ার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র ছিল। কিন্তু ২০২০ এবং ২০২৩ সালের নাগোর্নো-কারাবাখ যুদ্ধে আজারবাইজানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মস্কো কোনো সামরিক সহায়তা না দেওয়ায় ইয়েরেভানের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। পাশিনিয়ান সরকার মনে করছে, ইউক্রেন আক্রমণে ব্যস্ত থাকার অজুহাতে রাশিয়া তাদের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদার আর্মেনিয়াকে একরকম পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে।

ইইউ-এর পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস গত মাসে এক বিবৃতিতে বলেন, "আর্মেনিয়ানরা বর্তমানে ব্যাপক অপপ্রচার এবং সাইবার আক্রমণের শিকার হচ্ছে। জুনের নির্বাচনে তারা যাতে স্বাধীনভাবে নিজেদের দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে, তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।"

ইইউ-এর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই সম্মেলনকে "আর্মেনিয়ার ভৌগোলিকভাবে ধীরে ধীরে পশ্চিমের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রতীক" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইইউ বর্তমানে আর্মেনিয়ার জন্য ভিসা-মুক্ত যাতায়াত এবং উন্নত পরিবহন ও জ্বালানি সংযোগ তৈরির পরিকল্পনা করছে।

রাশিয়া অবশ্য তাদের এই পুরনো মিত্রকে সহজে ছাড়তে রাজি নয়। আর্মেনিয়ার গিউমরি শহরে এখনো রাশিয়ার শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এছাড়া আর্মেনিয়া রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় গ্যাস পেয়ে থাকে। ভ্লাদিমির পুতিন ইতিমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, আর্মেনিয়া যদি ইউরোপের সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ঠ হয়, তবে সস্তায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হবে।

সম্প্রতি রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবেও আর্মেনিয়াকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে। মস্কো ইতিমধ্যে আর্মেনিয়ান মিনারেল ওয়াটার এবং বিখ্যাত ব্র্যান্ডের কনিয়াক (মদ) আমদানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। প্রতিবেশী ইউক্রেন বা মলদোভার ক্ষেত্রেও রাশিয়া অতীতে একই ধরনের অর্থনৈতিক কৌশল ব্যবহার করেছিল।

২০১৮ সালের ভেলভেট রেভল্যুশন’ বা মখমল বিপ্লবের পর থেকেই আর্মেনিয়া গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পথে হাঁটার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে রাশিয়া ক্রমান্বয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ধাবিত হয়েছে। এই আদর্শিক পার্থক্যই দেশ দুটিকে একে অপরের থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। গত বছর আর্মেনিয়ার পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ পাওয়ার জন্য আবেদন করার একটি আইন পাস করেছে।

ফ্রান্সের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য নাথালি লোইসো বলেন, "ভোটারদের ওপর যারা চাপ সৃষ্টি করতে চায়, তাদের হাত থেকে বাঁচতে আর্মেনিয়া এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে তাকিয়ে আছে। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে আমাদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি।" ইউরোপীয় পার্লামেন্ট গত সপ্তাহে একটি প্রস্তাব পাস করেছে যেখানে নির্বাচনী কারচুপি বা ভোট কেনা প্রতিরোধের জন্য শক্তিশালী আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

৭ জুনের সংসদীয় নির্বাচন আর্মেনিয়ার জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা’। এটি নির্ধারণ করবে দেশটি কি রাশিয়ার চিরচেনা কক্ষপথেই থাকবে নাকি ইউরোপীয় সদস্যপদ পাওয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করবে। ইইউ-এর বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো এবং এই শীর্ষ সম্মেলন স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার মনোযোগের যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেই সুযোগে দক্ষিণ ককেশাসের মানচিত্র বদলে দিতে বদ্ধপরিকর পশ্চিমা শক্তিগুলো। এখন দেখার বিষয়, পুতিনের গ্যাসের হুমকি এবং অর্থনৈতিক অবরোধ উপেক্ষা করে আর্মেনিয়া তার ইউরোপীয় স্বপ্ন’ পূরণ করতে পারে কি না।

বাংলাদেশের খবর/ এম.আর

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইউরোপীয় ইউনিয়ন

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন