বন্ডি বিচে হামলা: অস্ট্রেলিয়ায় ইহুদিবিদ্বেষ এখন প্রকাশ্যে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ১৯:৪৯
অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বিখ্যাত বন্ডি বিচে গত ডিসেম্বরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই দেশটিতে ইহুদিবিদ্বেষের এক নতুন ও ভয়ংকর রূপ উন্মোচিত হয়েছে। বন্ডি বিচে এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বন্দুকধারীদের গুলিতে নিহত ১৫ জনের পরিবারের সদস্যরা সোমবার রয়্যাল কমিশনের প্রথম জনশুনানিতে সাক্ষ্য দেন।
সেখানে তারা দাবি করেন, ২০২৩ সালের অক্টোবর
থেকে শুরু হওয়া বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবে অস্ট্রেলিয়ায় ইহুদিবিদ্বেষ এখন
কেবল প্রকাশ্যেই নয়, বরং সামাজিকভাবেও ‘গ্রহণযোগ্য’ হয়ে উঠেছে।
শুনানিতে প্রথম সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত
হন শাইনা গুটনিক। তার বাবা রেউভেন মরিসন সেই হামলায় নিহত হয়েছিলেন। মরিসন সাহসিকতার
সঙ্গে বন্দুকধারীদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে তাদের থামানোর চেষ্টা করেছিলেন,
যাতে অন্য মানুষের জীবন বাঁচে। কিন্তু বাবার সেই বীরত্বগাথার বিপরীতে শাইনা এখন প্রতিনিয়ত
অনলাইনে ও সরাসরি লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। শাইনা জানান, হামলার পর থেকে তিনি এমন অনেক
বার্তা পেয়েছেন যেখানে বলা হয়েছে— বন্ডি বিচের ওই হামলায় তারও মারা যাওয়া উচিত ছিল।
তিনি বলেন, "আমি দেখেছি মানুষ কীভাবে
এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডকে ‘জায়নিস্ট-বিরোধী’ তকমা দিয়ে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। হঠাৎ করেই যেন
জনসমক্ষে ইহুদিবিদ্বেষী মন্তব্য করা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
শাইনার বাবা রেউভেন মরিসন ১৪ বছর বয়সে
সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পালিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিলেন। তিনি এই দেশটিকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন।
বন্ডি বিচেই তিনি শাইনার মায়ের সঙ্গে প্রথম পরিচিত হয়েছিলেন।
শাইনা বলেন, "বন্ডি বিচ নিয়ে আমার
শৈশবের অনেক সুন্দর স্মৃতি ছিল, কিন্তু এখন সেই অনুভূতিগুলো অনেক জটিল ও যন্ত্রণাদায়ক।"
আরেকজন সাক্ষী (ছদ্মনাম এএএল) আশির দশকে
দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে অস্ট্রেলিয়ায় এসে স্থায়ী হয়েছিলেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন,
"আমি অস্ট্রেলিয়াকে যেদিন থেকে দেখেছি, সেদিন থেকেই নিজের দেশ মনে করেছি। কিন্তু
এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। আমার নাতি-নাতনিদের জন্য এই দেশ নিরাপদ কি না, তা নিয়ে
আমাকে এখন গভীরভাবে ভাবতে হচ্ছে।"
অস্ট্রেলিয়ার হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি
ভার্জিনিয়া বেল এই কমিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সোমবার সকাল পর্যন্ত প্রায় ৭,৫০০টি অভিযোগ
জমা পড়েছে কমিটিতে। বিচারপতি বেল স্বীকার করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে
অস্ট্রেলিয়াসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে ইহুদিবিদ্বেষের এক বিশাল ‘স্পাইক’ বা জোয়ার এসেছে।
কমিশন ইতিমধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন
প্রতিবেদনে ১৪টি সুপারিশ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে বন্দুক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রণয়ন
ও ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব ও অনুষ্ঠানে পুলিশের বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
গত ডিসেম্বরে ৫০ বছর বয়সী সাজিদ আকরাম
এবং তার ছেলে নাভিদ আকরাম বন্ডি বিচের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অতর্কিত হামলা চালায়।
পুলিশের গুলিতে সাজিদ আকরাম নিহত হন এবং তার ২৪ বছর বয়সী ছেলে নাভিদ বর্তমানে গুরুতর
আহত অবস্থায় কারাবন্দি। নাভিদের বিরুদ্ধে ১৫টি খুনসহ মোট ৫৯টি অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
আগামী ১৫ মে পর্যন্ত সিডনিতে এই গণশুনানি চলবে, যেখানে ভুক্তভোগীরা তাদের ব্যক্তিগত
অভিজ্ঞতার কথা জানাবেন।
হামলার এক বছর পূর্ণ হওয়ার দিন অর্থাৎ
আগামী ডিসেম্বরে কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার
মতো বহুসাংস্কৃতিক দেশে এই ধরনের প্রকাশ্য বিদ্বেষ সামাজিক সংহতির জন্য এক বড় হুমকি
হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
বন্ডি বিচের রক্তক্ষয়ী সেই রাত কেবল ১৫টি
প্রাণই কেড়ে নেয়নি, বরং অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক নিরাপত্তার দীর্ঘদিনের আস্থাতেও ফাটল
ধরিয়েছে।
বাংলাদেশের খবর/ এম.আর

