Logo

আন্তর্জাতিক

যুদ্ধ বন্ধে চূড়ান্ত সমঝোতার পথে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

Icon

হাসান রাজীব

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬, ২১:৩৮

যুদ্ধ বন্ধে চূড়ান্ত সমঝোতার পথে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

ইরানের বিরুদ্ধে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করলে হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত এবং মিনব শহরে শারজাহ তায়্যিবাহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালানো টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ১৬৮ শিক্ষার্থী নিহত হয়। এর প্রতিবাদে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে এবং ইসরায়েলে ১০০ দফা আক্রমণ চালায় ইরান। দীর্ঘ ৩৯ দিন পর ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে ৭ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন ট্রাম্প। গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। পরে ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

এমন অবস্থায় ১৩ এপ্রিল থেকে হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধ আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জলপথটি খুলতে ট্রাম্প সম্প্রতি নৌ অভিযান ‘প্রোজেক্ট ফ্রিডমও’ শুরু করেছিলেন। যদিও তিনদিন পরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট তা স্থগিত ঘোষণা করেন। 

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গতকাল মঙ্গলবার (৫ মে) এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের সামরিক অভিযানটি সফলভাবে শেষ হয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, এই অভিযানের মূল লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন আর নতুন করে সংঘাত বাড়াতে চায় না।

বর্তমানে পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন, শান্তি আলোচনায় ‘বিরাট অগ্রগতি’ হয়েছে। একটি ১৪ দফা বিশিষ্ট সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে, যার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ শেষ হতে পারে। সার্বিক পর্যালোচনায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার সর্বশেষ অবস্থা অনুযায়ী, বড় ধরনের সামরিক অভিযান আপাতত স্থগিত করে উভয় দেশ একটি শান্তি চুক্তির দিকে এগোচ্ছে।

ট্রাম্পের এই আকস্মিক স্থগিতাদেশের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি আপাতত কিছুটা কমবে বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। এদিকে, মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানি একটি সূত্রের দাবি, আলোচনায় দ্রুত অগ্রগতি হচ্ছে এবং খুব শিগগিরই সমঝোতা হতে পারে।

যুদ্ধ বন্ধ এবং বিস্তারিত পারমাণবিক আলোচনার একটি কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে এক পাতার একটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে হোয়াইট হাউস। মার্কিন প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত আরও দুটি সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ইরানের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও এখনো চূড়ান্ত কোনো সম্মতি আসেনি, তবে সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দুই পক্ষ এখন সমঝোতার সবচেয়ে কাছাকাছি।

চূড়ান্ত সমঝোতার পথে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান: পারস্য উপসাগরের যুদ্ধ বন্ধে এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা স্মারকের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে জানিয়েছেন আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাকিস্তানি একটি সূত্র। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, যুদ্ধ বন্ধে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে দুই পক্ষের আলোচনা চলছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সমঝোতার আওতায় ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সাময়িক বিরতিতে সম্মত হতে পারে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে, ইরানের জব্দকৃত কয়েক শ কোটি ডলার ছাড় করবে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে দুই পক্ষই বিধিনিষেধ কমাবে।

পাকিস্তানি সূত্রটি বলেছে, গত মাসে একমাত্র শান্তি আলোচনা আয়োজনের পর থেকে ইসলামাবাদ দুই পক্ষের মধ্যে প্রস্তাব আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছে। এই সম্ভাব্য সমঝোতার খবরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৮ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারে নেমে আসে। শেয়ারবাজারেও ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।

অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, এক পৃষ্ঠার এই ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকটি কার্যকর হলে অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধের ইতি টানা হবে এবং পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বিস্তারিত চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলবে। সেই আলোচনায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়গুলো থাকবে।

যুদ্ধ বন্ধে হচ্ছে সমঝোতা স্মারক: ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার সরাসরি ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে ১৪ দফার এই সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা করছেন। এই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, অঞ্চলে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করা হবে এবং হরমোজ প্রণালি খুলে দেওয়া, পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ৩০ দিনের একটি বিস্তারিত আলোচনার সময়কাল শুরু হবে। এই আলোচনা ইসলামাবাদ অথবা জেনেভায় হতে পারে।

এই ৩০ দিনের মধ্যে হরমোজ প্রণালিতে ইরানের নৌ-চলাচলে বিধিনিষেধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ধীরে ধীরে তুলে নেওয়া হবে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে মার্কিন বাহিনী পুনরায় অবরোধ আরোপ বা সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারবে।

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিতের সময়সীমা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। ইরান ৫ বছরের প্রস্তাব দিয়েছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছর দাবি করেছিল। সূত্রমতে, এটি ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে নির্ধারিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র একটি বিশেষ ধারা যুক্ত করতে চায় যাতে ইরান সমৃদ্ধকরণের শর্ত লঙ্ঘন করলে এই স্থগিতাদেশের মেয়াদ আরও বেড়ে যায়। স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হলে ইরান ৩.৬৭ শতাংশ পর্যন্ত নিম্ন মাত্রার সমৃদ্ধকরণ করতে পারবে।

প্রজেক্ট ফ্রিডম অভিযান স্থগিত ঘোষণা ট্রাম্পের: হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে চলাচলে সহায়তা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে যে অভিযান শুরু করেছিল, একদিনের মধ্যেই সেটা আবার স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। 

বাংলাদেশ সময় বুধবার সকালে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানান।

ট্রাম্প তার পোস্টে উল্লেখ করেন, পাকিস্তানসহ বন্ধুপ্রতিম কয়েকটি দেশের অনুরোধ এবং ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হওয়ার প্রেক্ষিতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত করা হলো। তিনি জানান, একটি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি চূড়ান্ত করা এবং তাতে স্বাক্ষর করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করতেই এই বিরতি দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযান স্থগিত করলেও ইরানের বন্দরে মার্কিন নৌবাহিনীর চলমান নৌ অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর থাকবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

ইরানে সামরিক অভিযান শেষ- রুবিও: মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের সামরিক অভিযান শেষ হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী নৌযানের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামের নতুন যে অভিযান শুরু হয়েছে, তা প্রতিরক্ষামূলক অভিযান।

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র তাদের লক্ষ্যগুলো অর্জন করে ফেলেছে বলেও দাবি করেন রুবিও। মঙ্গলবার (৫ মে) হোয়াইট হাউসের প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এমন দাবি করেন। সংবাদ সম্মেলনে মার্কো রুবিও বলেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি শেষ হয়েছে। আমরা এর লক্ষ্যগুলো অর্জন করেছি। আমরা অতিরিক্ত সংঘাত চাই না। আমরা শান্তির পথই চাই। প্রেসিডেন্ট একটি চুক্তি চান।’

রুবিও বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রজেক্ট ফ্রিডম নামের নতুন যে অভিযান শুরু হয়েছে, তা আকারে ছোট এবং মূল যুদ্ধ পরিকল্পনা থেকে আলাদা। তিনি এটিকে একটি প্রতিরক্ষামূলক অভিযান হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলা না হলে তারা সামরিকভাবে জড়াবে না।

ইরানকে সাদা পতাকা ওড়ানোর পরামর্শ ট্রাম্পের: ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে তুচ্ছজ্ঞান করে দেশটিকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ইরানের উচিত ‘আত্মসমর্পণের সাদা পতাকা’ ওড়ানো, কিন্তু আত্মসম্মানে লাগার কারণে তারা তা করছে না।

গতকাল মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এ কথা বলেন। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সামরিক শক্তি এখন এতটাই হ্রাস পেয়েছে যে তারা শুধু ‘পি-শুটার’ (ছোট খেলনা বন্দুকের মতো অস্ত্র) দিয়ে গুলি চালানোর অবস্থায় আছে।

ট্রাম্প দাবি করেন, তেহরান প্রকাশ্যে যুদ্ধের হুঙ্কার দিলেও গোপনে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী। তিনি বলেন, ‘তারা এখন শুধু লোক দেখানো খেলা খেলছে। তবে আমি আপনাদের বলছি, তারা প্রকৃতপক্ষে একটি চুক্তি করতে চায়। যখন নিজের সামরিক শক্তি পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়, তখন কেই–বা চুক্তি করতে চাইবে না?’

এ সময় ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন ট্রাম্প। তিনি এ অবরোধকে ইস্পাতের দেয়ালের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘এটি একটি ইস্পাতের খণ্ডের মতো মজবুত। কেউ এই অবরোধ ভাঙার সাহস দেখাবে না। আমি মনে করি, এটি খুব কার্যকরভাবে কাজ করছে।’

বেইজিংয়ে চীন-ইরান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বর্তমানে বেইজিং অবস্থান করছেন। সেখানে তিনি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। বুধবার (৬ মে) এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

অপরদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনায় ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। তবে কাদের সঙ্গে ট্রাম্প আলোচনা করছেন, সে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। ইরান এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।

বেশ কিছুদিন ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে বড় আকারে অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ওয়াশিংটনের এই উদ্যোগকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তেহরানের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কিনে যাচ্ছে বেইজিং। 

বছরের পর বছর অর্থনৈতিক দুর্দশায় থাকা ইরানবাসী পশ্চিমা বিধিনিষেধ পাশ কাটানোর বেশ কয়েকটি কার্যকর পন্থা উদ্ভাবন করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা দেশের নাম চীন। দুই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শীর্ষ কূটনীতিবিদের বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম শিনহুয়া। তবে কী কী বিষয় নিয়ে আরাঘচি ও ওয়াং আলোচনা করেছেন, সেটা তাৎক্ষণিকভাবে জানায়নি সংবাদমাধ্যমটি।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ অবৈধ: ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ বলে আখ্যায়িত করেছে চীন। বেইজিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে এক বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এই মন্তব্য করেন।

বৈঠকে ওয়াং ই বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমাতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে চীন প্রস্তুত। এ মুহূর্তে ওই অঞ্চলে একটি ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি অপরিহার্য’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি একটি ‘সংকটপূর্ণ মোড়ে’ দাঁড়িয়ে আছে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সরাসরি বৈঠক হওয়া প্রয়োজন।

এদিকে চীনের দৃঢ় অবস্থানের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বলেন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বেইজিং প্রমাণ করেছে তারা ইরানের ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’।

ইরানের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধকে সরাসরি আগ্রাসন ও আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেন আরাগচি। তিনি আরও বলেন, তেহরান আলোচনার মাধ্যমে তার বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তবে তারা শুধু একটি ‘ন্যায়সংগত ও পূর্ণাঙ্গ চুক্তি’ মেনে নেবে।

কেউ আত্মসমর্পণ করাতে পারবে না: প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের মার্কিন হুমকির কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, ‘কেউ আমাদের আত্মসমর্পণ করাতে পারবে না। শিয়া মতাদর্শের অনুসারীদের জোর করে বশীভূত করা সম্ভব নয়।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে পেজেশকিয়ান জানান, তিনি ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সামরিক হুমকি প্রত্যাহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তাদের নতুন নিরাপত্তা পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে এই অঞ্চল ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ বন্ধ করা।

ফের অভিযান শুরু করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র: ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর নির্দেশ দিতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চলতি সপ্তাহেই এই অভিযান শুরু হতে পারে বলে মঙ্গলবার (৫ মে) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শীর্ষ পর্যায়ের সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানকে ৩ মে অপারেশন প্রজেক্ট ফ্রিডম শুরু করার বিষয়টি গোপনে জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। হরমুজ প্রণালিতে পরিচালিত এই অভিযানের লক্ষ্য হলো জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উত্তেজনা কমানো। তবে অভিযান শুরুর ২ দিন পর বুধবার (৬ মে) অপারেশন প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থিগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

একই সময়ে পেন্টাগন প্রধান হেগসেথ জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে সামরিক কার্যক্রম চললেও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর রয়েছে। তবে মার্কিন ও ইসরায়েলি কিছু কর্মকর্তা মনে করছেন, আলোচনা অচলাবস্থায় থাকলে ট্রাম্প খুব শিগগির আবারও সামরিক পদক্ষেপের নির্দেশ দিতে পারেন।

শান্তির আভাসে কমছে জ্বালানির দাম: বিশ্ববাজারে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা নিরসনে ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির ইঙ্গিত দেওয়ার পর তেলের বাজারে এই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের ধারণা, শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে ওই অঞ্চলের (মধ্যপ্রাচ্য) তেল সরবরাহ ব্যবস্থা আবার স্বাভাবিক হবে।

বুধবার গ্রিনিচ মান সময় ১টা ০৩ মিনিটে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ‘ব্রেন্ট ক্রুড’ এর দাম ১ দশমিক ৫২ ডলার বা ১ দশমিক ৩৮ শতাংশ কমেছে। ফলে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম দাঁড়িয়েছে ১০৮ দশমিক ৩৫ ডলারে। এর আগের দিনও ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪ শতাংশ কমেছিল।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের তেলের বাজার ‘ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট’ (ডব্লিউটিআই) এর দাম ১ দশমিক ৫০ ডলার বা ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআই তেল বিক্রি হচ্ছে ১০০ দশমিক ৭৭ ডলারে। আগের দিন এর দাম ৩ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছিল।

ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলা এই যুদ্ধে ইরানে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইরানের সরকারি তথ্যমতে ইরান সরকার এখন পর্যন্ত প্রায় ৩,৪৬৮ জন নিহতের কথা স্বীকার করেছে এবং আহত হয়েছেন প্রায় ২৬,৫০০ জন। ঘটনার মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় ১৭০ জন শিশুর মৃত্যু এবং যুদ্ধের শুরুর দিকে প্রথম দফার হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেইসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার নিহত হওয়ার খবর। ইরান সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ক্ষয়ক্ষতির মোট পরিমাণ প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলার (যা ১ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে)।

যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশ উল্লেখযোগ্য, বিশেষ করে সামরিক ব্যয় এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য এবং যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ১৫ জন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। আর যুদ্ধে অন্তত ৫৩৮ জন সামরিক কর্মী আহত হয়েছেন। ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও রাডার ব্যবস্থা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ১৭টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা হামলার শিকার হয়েছে।

এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ব তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়। যুদ্ধের মূল কেন্দ্রস্থল এবং হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন