ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের এক বছরেও বরফশীতল সম্পর্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ২১:২০
দক্ষিণ এশিয়ার আকাশ থেকে যুদ্ধের মেঘ সরেছে এক বছর আগে। ভারত-শাসিত কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর ভয়াবহ হামলার জেরে শুরু হওয়া সেই ৯৫ ঘণ্টার সংঘাত পরমাণু শক্তিধর দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
এক বছর পর সীমান্তে যুদ্ধবিরতি বজায় থাকলেও
দুই দেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের কোনো উন্নতি হয়নি। বরং সম্পর্কের এই স্থবিরতা
গত কয়েক দশকের মধ্যে দীর্ঘতম এক ‘ডিপ ফ্রিজে’ রূপ নিয়েছে।
বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক
কোনো কূটনীতি নেই। সীমান্ত বন্ধ, বাণিজ্য স্থগিত এবং ক্রিকেটীয় সম্পর্কও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।
এমনকি সিন্ধু নদ পানি চুক্তি নিয়ে চলমান বিরোধ মেটারও কোনো লক্ষণ নেই। সাবেক পাকিস্তানি
কূটনীতিক হোসেন হাক্কানি বিবিসিকে বলেন, "উভয় দেশই মনে করে না যে অভ্যন্তরীণ বা
আন্তর্জাতিক কারণে তাদের একে অপরের দিকে হাত বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। শান্তির সময়েও সম্পর্কের
এতটা অবনতি আগে কখনও দেখা যায়নি।"
২০২৫ সালের সংঘাতের পর ভূ-রাজনীতিতে বেশ
কিছু পরিবর্তন এসেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, ভারতের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের সামনে
পাকিস্তান হয়তো কোণঠাসা হয়ে পড়বে। কিন্তু পাকিস্তান সেই ধাক্কা সামলে উঠে মধ্যপ্রাচ্যে
ইরানের যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়ে নতুন প্রাসঙ্গিকতা তৈরি করেছে।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যানিয়েল
মার্কি বলেন, "পাকিস্তান তার হারানো ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব পুনরুদ্ধার করেছে।"
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই
যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব দাবি করে আসছেন। তিনি বারবার কাশ্মীর নিয়ে মধ্যস্থতার প্রস্তাব
দিয়েছেন, যা ভারতের জন্য বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিল্লি বরাবরই কাশ্মীর ইস্যুতে
তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান
(বর্তমানে ফিল্ড মার্শাল) আসিম মুনিরের সাথে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা দিল্লির কূটনৈতিক চিন্তায়
নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফার ক্ল্যারি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের
ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমাতে দিল্লি এখন তার বৈশ্বিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করছে।
ভারত এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতে মনোযোগ দিচ্ছে এবং রাশিয়ার
সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার মার্কিন চাপ প্রতিরোধ করছে।
বিশ্লেষকরা এই সংঘাতকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম
‘নেটওয়ার্কড এবং
ড্রোন-নির্ভর’ লড়াই হিসেবে অভিহিত করেছেন। সাবেক ভারতীয় হাই কমিশনার অজয় বিসারিয়া বলেন,
"আমরা একটি প্রযুক্তিগতভাবে ভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্র দেখেছি, যেখানে কোনো চালকবাহী
বিমান সীমান্ত অতিক্রম করেনি।" এই যুদ্ধের পর দুই দেশই সামরিক আধুনিকায়ন ও প্রতিরক্ষা
খাতে ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে বিসারিয়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এখন
সংঘাতের একটি ‘নতুন স্বাভাবিক’
তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, যেকোনো বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলাকে এখন সরাসরি ‘যুদ্ধ’ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং ভারত তার
পাল্টা জবাব দিতে পিছপা হবে না। পরমাণু শক্তির দিক থেকে পাকিস্তান আত্মবিশ্বাসী হলেও
দেশটি বর্তমানে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সমাজে বিভক্তি এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের
মুখে পাকিস্তান ভারতের সাথে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত এড়াতে চায়। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক
এলিটদের মধ্যে একটি মূল চিন্তা হলো—বর্তমানে ভারতের সাথে কোনো যুদ্ধে জড়ানো সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নরেন্দ্র মোদী এবং আসিম
মুনির—উভয় নেতারই নিজ নিজ দেশের ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তারা চাইলে কূটনীতি শুরু
করতে পারেন, কিন্তু আপাতত তার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। আটলান্টিক কাউন্সিলের
মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, "বর্তমানে সেরা ফলাফল এটাই হতে পারে যে, পরিস্থিতি যেন
এর চেয়ে খারাপ না হয়।"
আপাতত কোনো বড় ধরনের সংঘাত ছাড়াই সময় পার
হচ্ছে, কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চিরস্থায়ী শান্তি বা স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কের
পথটি এখনও অনেক দূরের বলেই মনে হচ্ছে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

