Logo

আন্তর্জাতিক

পাল্টাপাল্টি হামলায় ঝুঁকির মুখে যুদ্ধবিরতি

Icon

হাসান রাজীব

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ২১:৩১

পাল্টাপাল্টি হামলায় ঝুঁকির মুখে যুদ্ধবিরতি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।  এই পাল্টাপাল্টি হামলায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চরম উত্তেজনার মুখে পড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালীতে তিনটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারে ইরানের হামলার পরও যুদ্ধবিরতি বহাল রয়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এটিকে ‘তুচ্ছ ঘটনা’ বলেও উড়িয়ে দেন। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, তারা সফলভাবে এই হামলা প্রতিহত করে ইরানের সামরিক স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হেনেছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের হামলার জবাবে তারা দেশটির সামরিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। তবে তেহরানের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতি ভেঙে যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম আক্রমণ চালায়। এই সংঘাতের কারণে গত ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতি নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে। 

এই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ইরানের ওপর কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার অবসান ঘটেছিল। সেসময় মার্কিন-ইসরাইলি হামলার জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায় এবং বিশ্বে তেল ও গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী অবরোধ করেছে।

ওয়াশিংটনে ইরানের যুদ্ধবিরতি এখনও বহাল আছে কিনা জানতে চাইলে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, যুদ্ধবিরতি বহাল আছে। তারা আজ আমাদের নিয়ে খেলতে চেয়েছিল। আমরা তাদের উড়িয়ে দিয়েছি। তারা তুচ্ছ কাজ করেছে। আমিও এটিকে তুচ্ছই বলবো।’

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানায়, ইরানি বাহিনী তিনটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট নৌযান ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে। তবে কোনো জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সেন্টকম বলেছে, তারা ‘আসন্ন হুমকি প্রতিহত করেছে এবং দায়ী ইরানি সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে।’ তারা আরও জানায়, ‘সেন্টকম উত্তেজনা বাড়াতে চায় না। তবে মার্কিন বাহিনীকে সুরক্ষা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।’

অন্যদিকে ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র তাদের একটি তেলবাহী জাহাজ এবং অন্য আরেকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরানি বাহিনী ‘তাৎক্ষণিকভাবে মার্কিন সামরিক জাহাজে পাল্টা হামলা’ চালায়। এর একদিন আগেই ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি জানান, ‘চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।’ তবে তেহরান পিছু না হটলে আবারও হামলার হুমকি দেন।

বৃহস্পতিবারের হামলার পর ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘ইরান  যদি দ্রুত চুক্তিতে সই না করে, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা আরও কঠোর ও ভয়াবহভাবে জবাব দেব।’

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেন, মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের কাছে তারা তাদের অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে।

বৃহস্পতিবারের গোলাগুলির আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ আশাবাদী সুরে টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এই যুদ্ধবিরতি একটি দীর্ঘমেয়াদী শান্তিতে রূপ নেবে।’

যুক্তরাষ্ট্রকে ফের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি সৌদি-কুয়েতের: হরমুজ প্রণালি সচল করতে এর আগে শুরু করা মার্কিন সামরিক অভিযানে নিজেদের আকাশসীমা ও ঘাঁটি ব্যবহারের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করেছে সৌদি আরব ও কুয়েত। ফলে আবারও দেশ দুটিতে থাকা ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ গতকাল বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে চেষ্টা চালাচ্ছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে তার একটি বড় বাধা দূর হলো।

‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ আবারও শুরুর প্রস্তুতি: যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীর সহায়তায় পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার কার্যক্রম ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ আবার শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে ৩৬ ঘণ্টা চলার পর এই কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের পরিকল্পনাকারীরা এখন এটি আবার শুরুর সময়সীমা নির্ধারণ করছেন। কিছু মার্কিন কর্মকর্তার মতে, এ সপ্তাহেই অভিযানটি আবার শুরু হতে পারে।

ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে ট্রাম্প যে চেষ্টা চালাচ্ছেন, এ সিদ্ধান্তের ফলে তার একটি বড় বাধা দূর হলো।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনা তীব্র হয়ে ওঠে। এর জবাবে ইরানও ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর পাল্টা হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনা কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। পরে ট্রাম্প কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়াই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি করেন।

আরব আমিরাতে ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল ইরান: সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্য করে নতুন করে ইরান আবারও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। ফলে এই আঘাতে দেশটিতে তিনজন আহত হয়েছেন।

গতকাল শুক্রবার (৮ মে) ইরান থেকে এ হামলা চালানো হয়। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে। এপি নিউজের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়। 

আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ইরান নতুন করে দুটি ব্যালিস্টিক মিসাইল ও তিনটি ড্রোন ছুড়েছে। এতে তিনজন আহত হয়েছেন। তবে মিসাইল ও ড্রোনগুলো ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মিসাইল ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে তিনজন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত ইরানের ছোড়া ৫৫১টি ব্যালাস্টিক মিসাইল, ২৯টি ক্রুজ মিসাইল এবং ২ হাজার ২৬৩টি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে।

এদিকে, উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে হামলা হলেও আমিরাতের মূল ভূখণ্ডে কোনো ধরনের মিসাইল বা ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেনি বলে জানা গেছে।

শান্তিচুক্তি না করলে কঠোর হামলার হুমকি ট্রাম্পের: সেন্ট্রাল কমান্ডের বিবৃতির সূত্র ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি ডেস্ট্রয়ার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় হামলার শিকার হয়। তবে জাহাজগুলোর কোনো ক্ষতি হয়নি।

সামরিক কমান্ড বলেছে, হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপ, মূল ভূখণ্ডের বন্দর খামির ও সিরিক এলাকায় বেসামরিক মানুষের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালির পূর্ব ও চাবাহার বন্দরের দক্ষিণে থাকা মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলা চালায়।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, হামলাকারী ইরানিদের ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করা হয়েছে এবং তাঁদের বেশ কিছু ছোট নৌযান ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, ‘ওই নৌযানগুলো খুব দ্রুত ও কার্যকরভাবে সমুদ্রের তলদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের ডেস্ট্রয়ারগুলো লক্ষ্য করে মিসাইল ছোড়া হয়েছিল, যা খুব সহজেই ভূপাতিত করা হয়েছে। একইভাবে ড্রোনগুলোও মাঝ আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে।’

এদিকে, ট্রাম্প ইরানকে দ্রুত আলোচনায় বসে যুদ্ধ শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি দ্রুত চুক্তি সই না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ ও কঠোর হামলা চালানো হবে।

‘যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জেনে রাখা উচিত যে যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা হামলার জবাবে ইরান বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে পাল্টা আঘাত করবে।’

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রস্তাবটি দিয়েছে, তাতে যুদ্ধ শেষ করার কথা থাকলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ বা হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার মতো মূল বিষয়গুলোর সমাধান করা হয়নি।

উল্লেখ্য, যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ করা হতো। ইরান জানিয়েছে, তারা প্রস্তাবটি নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

প্রতিরোধই ইরানের লক্ষ্য- পেজেশকিয়ান: বৈদেশিক চাপ ও শত্রুপক্ষের নানা ষড়যন্ত্রের মুখেও ইরান আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেবে না বলে দৃঢ় অবস্থান জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, জাতীয় মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিরোধের নীতিতেই অটল থাকবে তেহরান। তেহরানে শিল্প, খনি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

পেজেশকিয়ান বলেন, বর্তমানে ইরানের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। একটি হলো জনগণের শক্তি ও সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, আর অন্যটি হলো বিদেশি চাপের কাছে নতি স্বীকার করা। তবে ইরানি জাতি ও সরকার যে প্রতিরোধের পথই বেছে নিয়েছে, তা স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেন তিনি।

তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি জনগণের সক্ষমতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। যদি জাতি ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে কোনো বিদেশি শক্তি ইরানের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ করতে পারবে না।

দেশটির বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। বাজেট ঘাটতি, অর্থনৈতিক চাপ এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার বিষয় স্বীকার করে তিনি বলেন, সরকারকে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের সম্পদ ও সক্ষমতা কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, বিদেশি শক্তির অন্যায্য চাপ যেন জনগণের মনোবল দুর্বল করতে না পারে।

পেজেশকিয়ান মনে করেন, শত্রুপক্ষের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক সংকটকে ব্যবহার করে ইরানের ভেতরে অস্থিরতা সৃষ্টি করা। তবে জনগণ যদি ধৈর্য ও ঐক্য ধরে রাখে, তাহলে সেই পরিকল্পনা সফল হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, সরকার এখন তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে চায়। এর পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, শিল্প খাত সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এখন সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।

যুদ্ধবিরতি এখনও বহাল আছে- ট্রাম্প: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটলেও ‘যুদ্ধবিরতি এখনও বহাল আছে’ বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি চলছে। এটি কার্যকর আছে’। আর সংঘর্ষের ঘটনাকে ‘কেবল হালকা সংঘাত’ বলে বর্ণনা করেন ট্রাম্প।

গতকাল গভীর রাতে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনাটি ঘটে। ইরানি বাহিনী ও মার্কিন বাহিনীও এই সংঘাতের কথা স্বীকার করেছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, গতকাল বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রথম বিস্ফোরণের খবর প্রকাশ করে। সেখানে ঘটনাটিকে ইরানি বাহিনী ও ‘শত্রুপক্ষের’ মধ্যে ‘গুলিবিনিময়’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এক অজ্ঞাত সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানায়, একটি ইরানি ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর এই সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। তাদের দাবি, প্রণালিতে অবস্থানরত ‘শত্রুপক্ষের ইউনিটগুলোকে’ লক্ষ্য করে ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীও সংঘর্ষের বিষয়টি নিশ্চিত করে।

হরমুজে সংঘর্ষের বিষয়ে এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে ওমান উপসাগরের দিকে যাওয়ার সময় মার্কিন নৌবাহিনীর মিসাইল ধ্বংসকারী যুদ্ধজাহাজ ‘কোনও ধরনের উসকানি ছাড়াই ইরানি হামলার’ মুখে পড়ে।

ইরানের হামলায় হরমুজ ছাড়লো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ: পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর তিনটি ডেস্ট্রয়ারকে পিছু হটতে বাধ্য করার দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পরিচালিত এই অভিযানে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে বলে দাবি করেছে তেহরান।

আইআরজিসি নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে মার্কিন হামলার জবাব হিসেবেই এই পাল্টা অভিযান চালানো হয়েছে। পাশাপাশি, বারবার সতর্ক করার পরও মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়ায় ইরান কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।

ইরানি কমান্ডারদের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন বাহিনীর দুটি পদক্ষেপকে ‘উসকানিমূলক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। প্রথমত, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে জাস্ক বন্দরের কাছে একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়।

দ্বিতীয়ত, তেহরানের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মার্কিন নৌবাহিনীর তিনটি ডেস্ট্রয়ার হরমুজ প্রণালির দিকে এগিয়ে আসে। এর জবাবে আইআরজিসি অত্যন্ত সমন্বিত ও নিখুঁত সামরিক অভিযান পরিচালনা করে বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযানে জাহাজ বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ধ্বংসাত্মক ড্রোন ব্যবহার করা হয়।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইরানি বাহিনী সরাসরি মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে বিস্ফোরকবাহী অস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে মার্কিন সামরিক সম্পদের ‘গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি’ নিশ্চিত হয়েছে বলেও দাবি করেছে আইআরজিসি।

ইরানের দাবি, ভয়াবহ হামলার মুখে টিকতে না পেরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো দ্রুত হরমুজ প্রণালি এলাকা ত্যাগ করে। এই ঘটনার মাধ্যমে ইরান আবারও প্রমাণ করেছে, নিজেদের জলসীমায় যেকোনো আগ্রাসনের কঠোর জবাব দিতে তারা প্রস্তুত।

এদিকে, খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি এই ঘটনাকে মার্কিন ‘সামুদ্রিক দস্যুতা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বুঝতে হবে, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের জবাব হবে শক্ত ও চূড়ান্ত।

বর্তমানে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। 

ইসরাইলি হামলায় লেবাননে শিশুসহ নিহত ১২: যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও লেবাননজুড়ে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে কমপক্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু ও এক প্যারামেডিক রয়েছেন।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) লেবাননজুড়ে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে কমপক্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু ও এক প্যারামেডিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এই ঘটনার একদিন আগে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহর এক কমান্ডারকে হত্যা করে ইসরাইল। যুদ্ধবিরতির পর রাজধানীর ওই এলাকায় এটিই ছিল প্রথম হামলা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরেক বিবৃতিতে জানায়, নাবাতিয়েহ জেলার তিনটি গ্রামে হামলায় মোট ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে দুই শিশু রয়েছে। অন্যদিকে মারাজায়ুন জেলায় পৃথক হামলায় হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট ইসলামিক হেলথ কমিটির একজন প্যারামেডিক নিহত হন। আহত হয়েছেন আরো একজন। এটিকে ‘অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে মন্ত্রণালয়।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন