Logo

আন্তর্জাতিক

আগামী সপ্তাহে ইসলামাবাদে ফের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ২১:২৯

আগামী সপ্তাহে ইসলামাবাদে ফের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক

ইরানের বিরুদ্ধে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করলে প্রতিবাদে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে এবং ইসরায়েলে ১০০ দফা আক্রমণ চালায় ইরান। টানা ৪০ দিন যুদ্ধের পর গত ৮ এপ্রিল ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তারপর একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে গত ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বৈঠকে বসেন মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিরা।

তবে ২১ ঘণ্টা ধরে আলোচনার পরও কোনো সমাধান ছাড়াই শেষ হয় এবং উভয় দেশের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছেন। এরপর গত মাসে শেষের দিকে আবারো ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছিল পাকিস্তান। তবে তা ভেস্তে যায়।

এমন অবস্থায় ১৩ এপ্রিল থেকে হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধ আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জলপথটি খুলতে ট্রাম্প সম্প্রতি নৌ অভিযান ‘প্রোজেক্ট ফ্রিডমও’ শুরু করেছিলেন। যদিও তিনদিন পরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট তা স্থগিত ঘোষণা করেন। 

তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিচ্ছে অন্যদিকে, বন্দর অবরোধ করে চাপ সৃষ্টি করছে — দুটো জিনিস একসঙ্গে চলতে পারে না। এই পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় দফার আলোচনায় বসা অর্থহীন। এ প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার উচ্চ-পর্যায়ের শান্তি আলোচনা সম্ভাবনা রয়েছে। আলোচনা সম্পর্কে অবগত পাকিস্তান কর্মকর্তাদের বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে এক মাসব্যাপী পরোক্ষ আলোচনার পর মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষ বর্তমানে এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা স্মারকের খসড়া নিয়ে কাজ করছে। ১৪ দফার এ খসড়ার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি আনুষ্ঠানিক আলোচনার কাঠামো তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে সংঘাত নিরসনের পথ তৈরি করবে।

সূত্রগুলোর দাবি, প্রস্তাবিত খসড়ায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা প্রশমন এবং ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ অন্য কোনো দেশের কাছে হস্তান্তরের সম্ভাব্য বিষয় নিয়ে আলোচনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যদিও কিছু মূল বিষয় অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পরিমাণ নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে, যা আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংলাপ ইতিবাচকভাবে এগোলে উভয় পক্ষের সম্মতিতে প্রাথমিক এক মাসের আলোচনার সময়সীমা বাড়ানো হতে পারে।

যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাবের মধ্যে হরমুজে বড় হামলা: ইরানের সঙ্গে ইসলামাবাদে প্রথম সরাসরি আলোচনার সময় গত মাসে হরমুজ প্রণালির বাইরে অবরোধ বসায় যুক্তরাষ্ট্র। এবার যুদ্ধ বন্ধে এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারক তেহরানে পাঠিয়ে তারা হরমুজ উন্মুক্ত করার অভিযানে নেমেছিল। সে অনুযায়ী প্রণালিটির দিকে ছোট যুদ্ধজাহাজ বা ডেস্ট্রয়ার নিয়ে এগোলে ইরানের পাল্টা হামলার মুখে পড়ে তারা। ইরানের উপকূলীয় বিভিন্ন দ্বীপ ও অঞ্চলে বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে। 

এ অবস্থায় গতকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে চলমান নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি বড় ঝুঁকিতে পড়ে। আকস্মিকভাবে আবারও তৈরি হয় যুদ্ধের আবহ। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ারের মধ্যে সংঘর্ষ সত্ত্বেও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এখনও বলবৎ আছে।

বিবিসি জানায়, হরমুজ প্রণালি ঘিরে এ সংঘর্ষের জন্য উভয় পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ইরান তাদের তিনটি যুদ্ধজাহাজের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট নৌকা থেকে হামলা চালিয়েছে। তারা এটিকে ‘উস্কানিহীন হামলা’ বলে বর্ণনা করেছেন। ট্রাম্প বলেন, ইরান ‘আজ আমাদের সঙ্গে ছেলেখেলা করেছে।’ 

জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ইরানের জনগণ কখনও চাপের কাছে মাথা নত করে না।

ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির দিকে এগিয়ে আসা ইরানের একটি তেলের ট্যাঙ্কার ও আরেকটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। সেই সঙ্গে তারা বেশ কয়েকটি উপকূলীয় এলাকায় ‘আকাশপথে হামলা’ চালিয়েছে।

এমন একসময় এ উত্তেজনা দেখা দিল, যখন মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো একটি যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব বিবেচনা করছে ইরান। গত বৃহস্পতিবারই এ নিয়ে ইরানের প্রতিক্রিয়া জানানোর কথা। তবে গত শুক্রবার শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তারা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কিছু জানায়নি। ইউরোপ সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ নিয়ে তাদের অপেক্ষার বিষয়টি জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে যথাসময়ে জবাব দেবে ইরান: যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাব এখনো পর্যালোচনা করছে ইরান।  ‘যথাসময়ে’ এর জবাব দেওয়া হবে।  ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই এ তথ্য জানান। একইসঙ্গে বাঘেই যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত সময়সীমাকে গুরুত্বহীন বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘এসব সময়সীমা বা চাপ সৃষ্টির কৌশলের কাছে ইরান নতি স্বীকার করবে না।’

ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, প্রস্তাবিত চুক্তিটি অত্যন্ত কারিগরি ও জটিল হওয়ায় সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছে। পাশাপাশি তেহরানের ক্ষমতার বিভিন্ন স্তরের অনুমোদনও প্রয়োজন।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ প্রক্রিয়ায় পার্লামেন্টের শীর্ষ নেতা মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এবং সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির অনুমোদন প্রয়োজন। 

খামেনির চূড়ান্ত সম্মতির পরই ওয়াশিংটনের কাছে আনুষ্ঠানিক জবাব পাঠানো হবে।

এদিকে, সংঘাত নিরসনে ওয়াশিংটনের দেওয়া প্রস্তাবের বিষয়ে দ্রুত তেহরানের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া পাওয়ার প্রত্যাশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুক্রবার ইতালির রাজধানী রোমে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। 

রুবিও বলেন, ইরানের সেই জবাবে কী থাকছে, তা দেখার পর পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে তেহরানের প্রতিক্রিয়াটি ইতিবাচক হবে, যা উভয় পক্ষকে একটি গুরুত্বর ও ফলপ্রসূ আলোচনার প্রক্রিয়ার দিকে নিয়ে যেতে সহায়ক হবে। 

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে যুক্তরাজ্য: হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল সুরক্ষায় সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক মিশনের আগে মধ্যপ্রাচ্যে একটি ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে যুক্তরাজ্য। গতকাল শনিবার দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।

লন্ডন থেকে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্রের বরাতে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, ‘এইচএমএস ড্রাগনকে আগাম মোতায়েন করা সতর্কতামূলক পরিকল্পনার অংশ। এর মাধ্যমে পরিস্থিতি অনুকূলে এলে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের যৌথ নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক জোটের অংশ হিসেবে প্রণালীটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্য প্রস্তুত থাকবে।’

গত মাসে ব্রিটেন ও ফ্রান্স জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালী সুরক্ষায় সামরিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে বাণিজ্য প্রবাহ পুনরুদ্ধারে তা সফল হবে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, এইচএমএস ড্রাগন মোতায়েন বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে আস্থা বাড়াবে এবং সংঘাত শেষ হলে মাইন অপসারণ কার্যক্রমে সহায়তা করবে।

গত এপ্রিলে লন্ডনে দুই দিনব্যাপী এক বৈঠকে ৪৪টির বেশি দেশের সামরিক পরিকল্পনাবিদরা অংশ নেন। সেখানে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক মিশনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার বাস্তব দিকগুলো নিয়ে আলোচনা হয়।

ধারণা করা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করতে প্রস্তাবিত এ মিশনে প্রায় ৪০টি দেশ অংশগ্রহণে সম্মত হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হতো। কিন্তু গত কয়েক মাসে সেই প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ইরান কার্যত প্রণালীটি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয় এবং তেলের দাম বেড়ে যায়। পরে এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নিজস্ব অবরোধ আরোপ করে।

লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ২০: লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী। গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় একজন উদ্ধারকর্মীসহ অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২,৭৫৯ জনে।

গতকাল শুক্রবার লেবাননের তোরা শহরে বিমান হামলায় দুই নারীসহ ৪ জন নিহত ও ৮ জন আহত হয়েছেন।

ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ এক কিশোরীর সন্ধানে এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে। ব্লাত শহর থেকে নিখোঁজ দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে রেড ক্রস। হাসবায়া জেলায় ড্রোন হামলায় একজন উদ্ধারকর্মী নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া নাবাতিয়েহ ও সিডনসহ বিভিন্ন গ্রামে নিহতের খবর পাওয়া গেছে।

কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি থাকলেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের বেশ কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং নতুন করে বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ দাবি করেছে যে তারা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবে ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় অন্তত তিনজন ইসরায়েলি সেনা আহত হয়েছে। সংঘাতের অবসান ঘটাতে আগামী ১৪ ও ১৫ মে ওয়াশিংটনে দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এই আলোচনায় মধ্যস্থতা করবে। আলোচনার লক্ষ্য হলো সীমান্ত নির্ধারণ, সেনা প্রত্যাহার ও লেবাননে মানবিক সাহায্য পৌঁছানোর একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরি করা। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম জানিয়েছেন, তারা সেনা প্রত্যাহারের সময়সূচি নির্ধারণ এবং লেবাননের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করবেন।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন