অস্ট্রেলিয়ায় স্ত্রী ও দুই সন্তানকে
হত্যা করে পুলিশে খবর দিলেন বাংলাদেশি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ২০:২৬
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাঁর স্ত্রী ও অটিজমে আক্রান্ত দুই সন্তানকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার লোমহর্ষক অভিযোগ উঠেছে। সিডনির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ক্যাম্পবেলটাউনে ঘটে যাওয়া এই নির্মম ঘটনাকে দেশটির পুলিশ ‘অত্যন্ত সহিংস, নৃশংস ও হৃদয়বিদারক পারিবারিক অপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
নিহত দুই শিশুর একজনের বয়স ১২ বছর এবং
অন্যজনের বয়স মাত্র ৪ (কারো মতে ৫) বছর। এই হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই
পুলিশের জরুরি নম্বরে ফোন করে অপরাধের কথা স্বীকার করেন।
গ্রেপ্তারকৃত ওই ব্যক্তির নাম সুমন আহমেদ
(৪৭)। গত সোমবার রাতে সিডনির রেমন্ড অ্যাভিনিউর নিজ বাসা থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার
করে। গতকাল মঙ্গলবার তাকে ক্যাম্পবেলটাউন লোকাল আদালতে হাজির করা হলে তাঁর বিরুদ্ধে
পারিবারিক সহিংসতার অধীনে তিনটি হত্যা মামলা করা হয়েছে।
পুলিশ ও আদালতের নথিসূত্রে জানা যায়, সোমবার
রাত ৮টার দিকে সুমন আহমেদ নিজেই অস্ট্রেলিয়ার জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করেন। ফোনে তিনি
অপারেটরকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় বলেন, ‘আমি আমার সন্তান
আর স্ত্রীকে ছুরি দিয়ে হত্যা করেছি।’ খবর পেয়ে দ্রুত
ক্যাম্পবেলটাউনের ওই বাড়িতে পৌঁছায় পুলিশ। বাড়ির পৃথক তিনটি কক্ষ থেকে ৪৬ বছর বয়সী
স্ত্রী এবং ১২ ও ৪ বছর বয়সী দুই ছেলের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিউ সাউথ ওয়েলস
পুলিশের অ্যাক্টিং সুপারিনটেনডেন্ট মাইকেল মরোনি স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, “ঘটনাস্থলটি ছিল
অত্যন্ত ভয়াবহ ও নৃশংস। তিনজনের শরীরেই ধারালো অস্ত্রের গভীর ও গুরুতর জখমের চিহ্ন
ছিল।” ঘটনার তীব্র নৃশংসতার কারণে নিহতদের
সম্মানার্থে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি পুলিশ। তবে ঘরের ভেতর থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত
বেশ কয়েকটি ধারালো বস্তু উদ্ধার করা হলেও কোনো আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া যায়নি।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দাবি, এটি কোনো
আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং কয়েক মাস ধরে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সাজানো একটি পূর্বপরিকল্পিত
হত্যাকাণ্ড। প্রায় এক দশক আগে বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানো এই পরিবারটির
দুই শিশুই গুরুতর মানসিক বিকাশজনিত সমস্যা ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতায় (অটিজম) ভুগছিল।
সুমন আহমেদ মূলত বাসায় থেকে দুই সন্তানের দেখাশোনা করতেন এবং তাঁর স্ত্রী চাকরি করে
পুরো পরিবারের খরচ চালাতেন।
আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি
বছরের জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে ঘটে যাওয়া একটি হত্যাকাণ্ড-আত্মহত্যার ঘটনা
থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সুমন এই অপরাধের ছক আঁকেন। পার্থে অটিস্টিক সন্তানদের লালন-পালনের
মানসিক চাপ সামলাতে না পেরে এক দম্পতি নিজেদের সন্তানদের হত্যা করে নিজেরাও আত্মহত্যা
করেছিলেন। সেই খবর পড়ার পর থেকেই সুমন এই নৃশংসতার পরিকল্পনা শুরু করেন। এছাড়া, ২০২৪
সালে সুমনের শরীরে ক্যান্সার ধরা পড়ার পর থেকেই তিনি তীব্র হতাশায় ভুগছিলেন বলে পুলিশকে
জানিয়েছেন, যদিও ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে তিনি সম্পূর্ণ রোগমুক্ত ছিলেন।
মঙ্গলবার ক্যাম্পবেলটাউন লোকাল কোর্টে
মামলার সংক্ষিপ্ত শুনানিতে সুমন আহমেদকে সশরীরে হাজির করা হয়নি। তাঁর পক্ষ থেকে কোনো
জামিনের আবেদনও করা হয়নি। আদালতের বাইরে সুমনের আইনজীবী জাওয়াদ হোসেন সাংবাদিকদের
বলেন, “পুলিশ হেফাজতে
আমার মক্কেল মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন। এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক একটি ঘটনা।”
পুলিশ জানায়, সুমনের বিরুদ্ধে আগে কোনো
অপরাধ বা পারিবারিক সহিংসতার রেকর্ড ছিল না এবং সমাজসেবা বিভাগের কাছেও এই পরিবারের
কোনো নেতিবাচক তথ্য ছিল না। মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ১৫ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে। এই
ঘটনার পর সিডনির পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং স্থানীয় প্রতিবেশীদের মাঝে গভীর শোক ও
স্তব্ধতা নেমে এসেছে।
এক প্রতিবেশী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“ওরা তো শিশু,
একদমই শিশু! কীভাবে কেউ এটা করতে পারে?” আরেক প্রতিবেশী
জানান, শিশু দুটি সবসময় খুব হাসিখুশি থাকত এবং প্রায়ই বাড়ির সামনে খেলত। এক নারী প্রতিবেশী
শ্রদ্ধা জানাতে নিজের বাগান থেকে ফুল কেটে ঘটনাস্থলে রেখে এসেছেন।
এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যার মাত্র কয়েক
দিন আগেই নিউ সাউথ ওয়েলসজুড়ে পারিবারিক সহিংসতাবিরোধী বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন আমারক’ চালিয়ে ৯৯৩ জনকে
গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। নৃশংস হত্যাকাণ্ডে গভীর শোক ও স্তম্ভিত প্রকাশ করেছেন নিউ সাউথ
ওয়েলসের প্রিমিয়ার ক্রিস মিন্স।
তিনি বলেন, “পারিবারিক সহিংসতা
মোকাবিলায় আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি সরাসরি সামনের সারির সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর
ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছি। তবে সাধারণ মানুষ যেভাবে বলছেন—এটুকুই যথেষ্ট
নয়, আমিও তা মনে করি।” আগামী জুনে রাজ্যের আসন্ন বাজেটে পারিবারিক
সহিংসতা প্রতিরোধে আরও অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সাথে বিবেচনা
করছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

