অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে টনি অ্যাবটের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ২১:০৯
টনি অ্যাবট
অস্ট্রেলিয়ার সক্রিয় রাজনীতিতে আবারও এক নাটকীয় ও বড় ধরণের প্রত্যাবর্তন ঘটতে যাচ্ছে দেশটির রক্ষণশীল ধারার সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবটের। ডানপন্থী রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী এই মুখ দলটির সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ—ফেডারেল লিবারেল পার্টির নতুন সভাপতি (প্রেসিডেন্ট) নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। আগামী সপ্তাহে মেলবোর্নে অনুষ্ঠেয় লিবারেল পার্টির ফেডারেল কাউন্সিলের সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে তার এই নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। মূলত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এবং দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডাউনার শেষ মুহূর্তে সভাপতির দৌড় থেকে সরে দাঁড়িয়ে সহ-সভাপতি পদে লড়ার সিদ্ধান্ত নিলে টনি অ্যাবটের এই পদে আসার পথ সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক হয়।
২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে সিডনির ওয়েরিংগাহ
আসনে আকস্মিক পরাজয়ের পর দীর্ঘ সাত বছর ধরে টনি অ্যাবট ক্ষমতার মূল স্রোতের বাইরে ছিলেন।
দলটির বর্তমান কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রিমিয়ার জন ওলসেনের
স্থলাভিষিক্ত হবেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার ২৮তম এই প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ফ্রন্টলাইনে
ফিরে আসার এই ঘটনা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের আভাস দিচ্ছে। লিবারেল
পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতির পদটি মূলত একটি অবৈতনিক প্রশাসনিক দায়িত্ব। এর প্রধান কাজ
হলো দলের সাংগঠনিক উইং পরিচালনা করা এবং নির্বাচনী প্রচারণার রূপরেখা তৈরি করা। ঐতিহ্যগতভাবেই
এই পদের ব্যক্তিরা সংসদীয় দলের সিদ্ধান্ত থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখেন এবং মিডিয়ার
আলো থেকে দূরে থাকেন। তবে টনি অ্যাবটের মতো একজন হেভিওয়েট ও আগ্রাসী ঘরানার নেতা এই
পদে আসায় দলের অভ্যন্তরে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।
দলটির মডারেট বা মধ্যপন্থী অংশের নেতারা
আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, অ্যাবট এই সাংগঠনিক পদটিকে ব্যবহার করে দলের ভেতরে একটি
'ডি-ফ্যাক্টো' বা সমান্তরাল নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারেন। বিশেষ করে অভিবাসন নীতিসহ বিভিন্ন
গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে তিনি দলকে আরও বেশি কট্টর ডানপন্থী আদর্শের
দিকে ঠেলে দিতে পারেন। এর ফলে বর্তমান বিরোধী দলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলরের সংসদীয় দলের
জন্য অহেতুক রাজনৈতিক বিতর্ক এবং মনোযোগ ভঙ্গের কারণ তৈরি হতে পারে। এমনকি তার এই প্রার্থিতা
চূড়ান্ত হওয়ার আগে দলের একটি অংশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিল, অ্যাঙ্গাস টেইলর যদি এই
সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন, তবে তা হবে তার রাজনৈতিক জীবনের বড় ভুল।
তবে সমস্ত জল্পনা-কল্পনার জবাব দিয়ে সিডনি
রাইটার্স ফেস্টিভ্যালে শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে টনি অ্যাবট নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।
তিনি বলেন, আমার একমাত্র লক্ষ্য হলো অ্যাঙ্গাস টেইলর যাতে অস্ট্রেলিয়ার ৩২তম প্রধানমন্ত্রী
হতে পারেন, তার জন্য আমার সাধ্যের সবকিছু করা। আর ফেডারেল কাউন্সিল যদি আমাকে যোগ্য
মনে করে, তবে দলের সভাপতি হিসেবে আমি তাকে সবচেয়ে ভালোভাবে সাহায্য করতে পারব।
এদিকে লিবারেল পার্টির এই প্রশাসনিক রদবদলের
হাওয়া লেগেছে ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের স্থানীয় শাখাতেও। আজ শনিবার মেলবোর্নে দলটির
রাজ্য কাউন্সিলের বৈঠকে বর্তমান সভাপতি ফিলিপ ডেভিস পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন বলে জানা
গেছে। সেখানে নতুন সভাপতি হিসেবে একমাত্র প্রার্থী হিসেবে নাম এসেছে দলটির সাবেক ফেডারেল
ডিরেক্টর ব্রায়ান লঘনানের। উল্লেখ্য, লঘনান হলেন টনি অ্যাবটের সাবেক অত্যন্ত প্রভাবশালী
চিফ অব স্টাফ পেটা ক্রেডলিনের স্বামী। লঘনানকে মূলত দলের বিভক্তি দূর করতে এবং সব পক্ষকে
একত্রিত করতে রাজ্য বিরোধী দলীয় নেত্রী জেস উইলসন এবং ফেডারেল সিনেটর জেমস প্যাটারসন
ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ জানিয়ে নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছেন।
ভিক্টোরিয়া লিবারেল পার্টির এই আকস্মিক
রদবদলের পেছনে দলটির সাম্প্রতিক কিছু চরম অভ্যন্তরীণ কোন্দল কাজ করছে। গত মার্চে মইরা
ডিমিংয়ের মনোনয়ন বাতিল এবং এক বিতর্কিত প্রার্থীকে কেন্দ্র করে দলের ভেতর ব্যাপক কাদা
ছোড়াছুড়ি হয়। এছাড়া সাবেক দলনেতা জন পেসুটোর বিরুদ্ধে মানহানির মামলায় বিপুল অঙ্কের
আইনি খরচ মেটাতে ১.৫৫ মিলিয়ন ডলারের বিতর্কিত লোন দেওয়াকে কেন্দ্র করে দলের একাংশ বর্তমানে
কার্যনির্বাহী কমিটির বিরুদ্ধে মামলা লড়ছে। এমন একটি সংকটময় মুহূর্তে ২০০৪ ও ২০১৩ সালের
কেন্দ্রীয় নির্বাচনে দলকে বিশাল জয় এনে দেওয়া প্রবীণ সংগঠক লঘনানের আগমন ভিক্টোরিয়া
শাখাকে কিছুটা স্বস্তি দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, টনি অ্যাবটের মতো একজন তুখোড়
ও কট্টরপন্থী সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানের নেতৃত্বে ফেরা এবং অঙ্গরাজ্যগুলোতে অভিজ্ঞ সংগঠকদের
পদায়ন অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে লিবারেল পার্টিকে নতুন করে চাঙ্গা করার পাশাপাশি দলটির
ভেতর অভ্যন্তরীণ আদর্শিক লড়াইকে আরও উস্কে দেবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

