স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে আরও কঠিন শর্ত যুক্তরাষ্ট্রের
হাসান রাজীব
প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬, ২১:৩১
# ইরানে আমাদের হামলা করা উচিত হয়নি: ট্রাম্প
# যুক্তরাষ্ট্রের এমকিউ–১ ড্রোন ভূপাতিতের দাবি ইরানের
# দক্ষিণ লেবাননে বড় অভিযানের ঘোষণা ইসরায়েলের
# হিজবুল্লাহর রকেট-ড্রোনে কাঁপল উত্তর ইসরায়েল
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাতের পর বর্তমানে পরিস্থিতি একটি জটিল ও থমথমে যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক দরকষাকষির পর্যায়ে রয়েছে। গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চলছে, যা ৬০ দিন পর্যন্ত বাড়ানোর আলোচনা চলছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে প্রস্তাবিত চুক্তিতে আরও কঠোর শর্ত যোগ করেছেন। ট্রাম্পের প্রধান দাবি দুটি হলো, ইরানকে নিশ্চিত করতে হবে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি পুনরায় সবার জন্য খুলে দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এমনটাই জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছে এএফপি। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প চুক্তির কিছু অংশ আরও কঠিন করার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর সেই নতুন প্রস্তাব আবার ইরানের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে ঠিক কোন কোন বিষয় বদলানো হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আরেকটি সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিতে চান।
এদিকে, ইরাক ও ইরানের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রবেশ করা বা যুদ্ধে জড়ানো একটি ‘স্তুল ও ভুল সিদ্ধান্ত’ ছিল বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে একই সঙ্গে তিনি জোরালো দাবি করেছেন যে, আজ থেকে ঠিক নয় মাস আগে মার্কিন বিমান বাহিনী যদি ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ না করত, তবে এতক্ষণে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে ফেলত।
মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ ও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে নিজের এই বৈপরীত্য ও চাঞ্চল্যকর কৌশলগত অবস্থান প্রকাশ করেন। বিগত দিনের যুদ্ধগুলোর সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরাকের দিকে তাকান, আমাদের কত বড় ক্ষতি হয়েছে। আমরা কী যে এক বোকামি করেছি! আমাদের আসলে প্রথমেই সেখানে যাওয়া উচিত হয়নি। একইভাবে আমাদের ইরানেও সামরিকভাবে প্রবেশ করা উচিত ছিল না, কিন্তু সমস্যা হলো ইরানের সেই বিপজ্জনক পারমাণবিক সক্ষমতা রয়েছে।’
ইরানের ওপর মার্কিন বিমান হামলার সাফাই গাইতে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন সামরিক শক্তির কার্যকারিতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘নয় মাস আগে আমরা যদি আমাদের সর্বাধুনিক বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান দিয়ে তাদের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোর ওপর নিখুঁত ও বিধ্বংসী আঘাত না হানতাম, তবে তাদের হাতে এখন নিশ্চিতভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র থাকত এবং আজকের বৈশ্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। হয়তো আজ ইসরায়েল নামক রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্ব থাকত না, এমনকি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যেরও কোনো অস্তিত্ব থাকত না; তারপর সেখান থেকে বিশ্ব রাজনীতি ও পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকত, তা কল্পনা করাও কঠিন!’
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও দাবি করেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী যুদ্ধের সময় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই ইরানের মূল সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ ধ্বংস বা নিশ্চিহ্ন করেনি।
ইরানি সেনাবাহিনীর ওপর বড় ধরনের আঘাত না করার কৌশল ব্যাখ্যা করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ইরানের নিয়মিত সামরিক বাহিনীকে এক রকম স্পর্শই করিনি, কারণ আমরা মনে করি তাদের সেনাবাহিনী কিছুটা নমনীয় ও বাস্তববাদী। তবে তাদের প্রশাসনের ভেতরে অন্য কিছু লোক আছে যারা মোটেও নমনীয় নয়, আমরা মূলত বেছে বেছে কেবল তাদেরই খতম করেছি। আমরা দেশটির উগ্র নেতৃত্বের বিভিন্ন অংশকে চিরতরে সরিয়ে দিয়েছি, কিন্তু সামরিক বাহিনীকে অক্ষত রেখেছি।’ ট্রাম্প আরও যোগ করেন, ‘মানুষ এটি শুনে হয়তো অবাক হবে, কারণ যুদ্ধে যখন আপনি একটি দেশের সবাইকে বা পুরো বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন, তখন এক ধরনের ঐতিহাসিক ভুল করা হয়; যার ফলে সেই দেশটি পরবর্তী ৪০ বছরেও নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারে না। আমরা ইরানের ক্ষেত্রে সেই ভুলটি করতে চাইনি।’
ইরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা বা শান্তি চুক্তি নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের কোনো তাড়াহুড়ো নেই বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ইরানের সাথে একটি ‘অসাধারণ চুক্তি’ করতে যাচ্ছে। আর তেহরান যদি সেই শর্তে রাজি না হয়, তবে ‘আমরা স্রেফ ফিরে গিয়ে ওদের সামরিকভাবে সম্পূর্ণ শেষ করে দেব’। তবে ট্রাম্প উল্লেখ করেন যে, তিনি যুদ্ধের চেয়ে চুক্তির মাধ্যমে ‘অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করতেই’ বেশি আগ্রহী। চুক্তি সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বর্তমানে অবরুদ্ধ থাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লাইফলাইন ‘হরমুজ প্রণালী’ পুরোপুরি খুলে দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ইরানের নেতাদের দরকষাকষির দক্ষতার প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, ‘ওরা দরকষাকষিতে অত্যন্ত দক্ষ। তবে যুক্তরাষ্ট্র যা চায়, ধীরে ধীরে তা আদায় করে নিচ্ছে। এতে লম্বা সময় লাগবে এবং আমার কোনো তাড়াহুড়ো নেই। কারণ তাড়াহুড়ো করলে ভালো চুক্তি করা যায় না। আর আমরা যা চাই, সেটি না পেলে অন্য উপায়ে এর শেষ করব।’
যুক্তরাষ্ট্রের এমকিউ–১ ড্রোন ভূপাতিতের দাবি ইরানের: ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউ–১ ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, শত্রুতামূলক অভিযান পরিচালনার উদ্দেশ্যে মার্কিন ড্রোনটি ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল। দ্রুত সেটিকে শনাক্ত করে আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ভূপাতিত করে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে গালফ নিউজ।
এর আগে গত মঙ্গলবার আইআরজিসি বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করলে তার জবাব দেওয়ার ‘বৈধ ও সুনিশ্চিত’ অধিকার তারা সংরক্ষণ করে। একই সময় তারা যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউ–৯ ড্রোন ভূপাতিত করার দাবিও করেছিল।
স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করা শত্রুপক্ষের একটি যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করেও গুলি চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ‘আত্মরক্ষামূলক হামলার’ পরই মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার এ দাবি সামনে আনলো ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। সূত্র: গালফ নিউজ
দক্ষিণ লেবাননে বড় অভিযানের ঘোষণা ইসরায়েলের: দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত করেছে ইসরায়েল। রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী নাবাতিয়েহ শহরের কাছে অবস্থিত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ক্রুসেডারদের বোফোর্ট দুর্গ (কালাআত আল-শাকিফ) দখল করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে বড় অভিযানের ঘোষণাও দিয়েছে।
ইসরায়েলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ‘কান’ বোফোর্ট দুর্গের ওপর ইসরায়েলি পতাকা উড়তে থাকা ছবি প্রকাশ করার পর দুর্গটি দখলের খবর সামনে আসে। ক্রুসেডার আমলে নির্মিত এই দুর্গটি লেবানন-ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে একটি উঁচু পাহাড়ি রিজের ওপর অবস্থিত। তবে এ বিষয়ে লেবাননের কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তথ্যটি নিশ্চিত হলে, ২ মার্চ থেকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে এটি ইসরায়েলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। ইউনেস্কো-সুরক্ষিত এই ঐতিহাসিক দুর্গটি ২০০০ সালে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের আগে ১৮ বছর ধরে ইসরায়েলের দখলে ছিল।
এদিকে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র এলা ওয়াওইয়া জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননের বোফোর্ট রিজ এবং ওয়াদি আল-সালুকি এলাকায় একটি ‘বৃহৎ পরিসরের অভিযান’ শুরু হয়েছে।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, দক্ষিণ লেবাননে কার্যক্রমগত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং গালিলি প্যানহ্যান্ডেল অঞ্চল ও মেতুলা বসতির প্রতি সরাসরি হুমকি দূর করার অংশ হিসেবে সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংস ও নাশকতাকারীদের নির্মূল করাই এই অভিযানের লক্ষ্য।
ওয়াওইয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন আগে বিপুলসংখ্যক স্থলবাহিনী নিয়ে অভিযানটি শুরু হয়েছে। সামনের প্রতিরক্ষা রেখা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে সেনারা বর্তমানে আক্রমণাত্মক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তিনি আরও দাবি করেন, ইসরায়েলি বাহিনী লিতানি নদী অতিক্রম করেছে এবং নদীর উত্তরাঞ্চলে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা আরও জোরদার করেছে। একই সঙ্গে অভিযান অতিরিক্ত এলাকাতেও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
হিজবুল্লাহর রকেট-ড্রোনে কাঁপল উত্তর ইসরায়েল: লেবানন থেকে নতুন করে রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। এতে উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। হামলার ফলে কিরিয়াত শমোনা এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনার পর উত্তরাঞ্চলের একাধিক স্থানে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে।
গত শনিবার ভিডিওসহ প্রকাশিত আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে রকেট হামলার পর ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তবে হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, লেবানন থেকে ছোড়া একটি ড্রোন ইসরায়েলের আকাশসীমায় প্রবেশ করলে সেটিকে ভূপাতিত করা হয়। এছাড়া আরেকটি সন্দেহভাজন আকাশযান লেবানন সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় ইসরায়েলি ভূখণ্ডে আছড়ে পড়ে।
এদিকে, ঘটনাস্থলে থাকা সংবাদদাতাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, লেবানন থেকে উত্তর ইসরায়েলের দিকে অন্তত ১০টি রকেট নিক্ষেপ করা হয়। হামলার পর পশ্চিম গ্যালিলি অঞ্চলেও বিমান হামলার সতর্কসংকেত সক্রিয় করা হয়।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, তারা পূর্ব লেবাননের জৌতার শহরের উপকণ্ঠে অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একটি মারকাভা ট্যাংক লক্ষ্য করে নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

