কঙ্গোয় ইবোলা মহামারি
নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা চাইলেন ডব্লিউএইচও প্রধান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬, ২০:১২
তেদরোস আধানোম গেব্রেউসাস
ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোয় (ডিআরসি) চলমান ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা কামনা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, এই মহামারি প্রতিরোধ করা এখন "সবার দায়িত্ব"।
সম্প্রতি কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ইবোলায় মৃতদের
মরদেহ দাফনের কঠোর চিকিৎসাগত নিয়মের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দারা বিক্ষোভ শুরু করলে
এই আহ্বান জানান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেউসাস। রোববার
দেশটির ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়ায় একটি নতুন চিকিৎসা কেন্দ্র উদ্বোধনের সময় তিনি
এই মন্তব্য করেন।
গেব্রেউসাস বলেন, "আমরা এই ইবোলা
রুখতে পারি এবং আক্রান্ত ব্যক্তিরাও সুস্থ হতে পারেন। তবে মূল নিয়ম হলো—এই লড়াই সবার। প্রতিটি নাগরিককে এতে শামিল
হতে হবে।"
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাস্থ্য বিভাগের
প্রবর্তিত কঠোর প্রটোকল তাদের ঐতিহ্যবাহী শেষকৃত্য ও ধর্মীয় রীতির পরিপন্থী। এই ক্ষোভের
জেরে ইতিমধ্যে অন্তত তিনটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য
সংস্থার প্রধান জানান, বর্তমান প্রাদুর্ভাবের পেছনে রয়েছে ইবোলার 'বুন্দিবুগিও' স্ট্রেন,
যার কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন নেই। তবে সঠিক সময়ে চিকিৎসা পেলে রোগীরা
সুস্থ হতে পারেন। লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বান জানান
তিনি। বুনিয়ার ইভানজেলিক্যাল মেডিকেল সেন্টারে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন রোগী সুস্থ হয়ে
বাড়ি ফিরেছেন।
কঙ্গোর তথ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ
হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে নিশ্চিতভাবে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮২ জনে, যার মধ্যে
৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া আরও ৯০৬ জন সন্দেহভাজন রোগী এবং ২২৩টি সন্দেহভাজন মৃত্যুর
ঘটনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কঙ্গোর প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও ইতিমধ্যে ৯ জন আক্রান্ত এবং
১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই পরিস্থিতিকে
"আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ" হিসেবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। ইতুরি অঞ্চলের
খনিজ সমৃদ্ধ এলাকায় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যকার গৃহযুদ্ধ এই চিকিৎসাসেবা ও ত্রাণ
তৎপরতাকে চরমভাবে ব্যাহত করছে।
এ প্রসঙ্গে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশ্ব
স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান একটি যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে বলেন, "প্রতিরোধযোগ্য
একটি রোগে নিরীহ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার মতো কোনো কারণ বা সংঘাত যুক্তিযুক্ত
হতে পারে না।"
কঙ্গোর এই প্রাদুর্ভাবের রেশ পৌঁছেছে লাতিন
আমেরিকাতেও। ব্রাজিলের সাও পাওলো এবং রিও ডি জেনিরোতে কঙ্গো ও উগান্ডা ফেরত দুই ব্যক্তির
শরীরে ইবোলার লক্ষণ দেখা দেওয়ায় তাদের কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে। যদিও একজনের পরীক্ষার
ফল নেতিবাচক এসেছে, তবুও তাকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে।
এদিকে কঙ্গোর স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী ও
সাহায্য সংস্থাগুলো মাস্কসহ প্রয়োজনীয় জরুরি চিকিৎসাসামগ্রীর তীব্র সংকটের কথা জানিয়েছে।
সংকট মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ আর্থিক ও চিকিৎসা সহায়তা
পাঠাতে শুরু করেছে।
আফ্রিকা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড
প্রিভেনশনের (আফ্রিকা সিডিসি) মহাপরিচালক জিন কাসেয়া আন্তর্জাতিক সহায়তার গুরুত্ব স্বীকার
করে বলেন, "ইবোলার বিরুদ্ধে আফ্রিকার লড়াই অবশ্যই আফ্রিকার নিজস্ব কৌশলেই পরিচালিত
হতে হবে।"
তবে চিকিৎসাভিত্তিক আন্তর্জাতিক দাতব্য
সংস্থা 'মেডিসিন্স সান্স ফ্রন্টিয়ার্স' (এমএসএফ) সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, এবারের প্রাদুর্ভাবের
গতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংস্থাটির উপ-পরিচালক অ্যালান গঞ্জালেজ বলেন, "বাস্তবতা
হলো এই মহামারির প্রকৃত ভয়াবহতা এখনো কেউ পুরোপুরি জানে না। প্রতিদিন শত শত নমুনা পরীক্ষার
অপেক্ষায় পড়ে রয়েছে।"
কঙ্গোর ইতিহাসে এটি ১৭তম ইবোলা প্রাদুর্ভাব।
১৯৭৬ সালে প্রথম এই ভাইরাসটি শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ রোগীর
মৃত্যু হয়েছে এই রোগে। বর্তমান স্ট্রেনটির মৃত্যুর হারও ৩০ থেকে ৫০ শতাংশের মতো, যা
অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

