Logo

আন্তর্জাতিক

পাল্টাপাল্টি হামলায় ফের উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য

Icon

হাসান রাজীব

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬, ২১:৩০

পাল্টাপাল্টি হামলায় ফের উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য

# ইরানের সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা

# মার্কিন বিমানঘাঁটিতে পাল্টা হামলা ইরানের

# ইরানের সঙ্গে চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো হবে: ট্রাম্প

# যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেই যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র: ইরান

# লেবাননে হামলা জোরদারের নির্দেশ নেতানিয়াহুর

# লেবাননে যুদ্ধবিরতি ছাড়া কোনো চুক্তি নয়: ইরান

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ‘আত্মরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। ইরানের গোড়ুক শহর এবং কেশম দ্বীপে অবস্থিত রাডার ও ড্রোন স্থাপনাগুলোতে এ হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলার পরই মধ্যপ্রাচ্যের একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে সফল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস ‘আইআরজিসি’।

মূলত মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান এই পাল্টা জবাব দিল। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ প্রায় মাসখানেকের বেশি সময় ধরে আলোচনার পরও দুই পক্ষ চূড়ান্ত কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় প্রায় ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি চুক্তি, যার ফলে ফের পুরোদমে যুদ্ধ শুরুর শঙ্কা দেখা দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে।

এদিকে, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই আরও বেগবান করতে লেবাননের ভেতরে ইসরায়েলি সেনাদের আরও অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আর যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে লেবাননে যুদ্ধবিরতি বজায় থাকাকে ‘অপরিহার্য শর্ত’ হিসেবে পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান। একইসঙ্গে, এই মুহূর্তে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা চলছে না বলেও দাবি করেছে তেহরান।

ইরানের সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা: যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা গত সপ্তাহান্তে ইরানের গোরুক শহর ও কেশম দ্বীপে দেশটির রাডারসহ ড্রোন–সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ‘আত্মরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে। সেন্টকম বলেছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি মার্কিন এমকিউ-১ ড্রোনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়াসহ ইরানের ‘আগ্রাসী পদক্ষেপের’ জবাবে যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা চালিয়েছে।

সেন্টকমের দাবি, মার্কিন বাহিনী ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, একটি স্থলভিত্তিক নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ও একমুখী হামলার জন্য ব্যবহৃত দুটি ড্রোন ধ্বংস করেছে। এগুলো আঞ্চলিক জলসীমা দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের জন্য ‘স্পষ্ট হুমকি’ ছিল।

এর আগে গতকাল রোববার ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে দাবি করে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউ–১ ড্রোন ভূপাতিত করেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, শত্রুতামূলক অভিযান পরিচালনার উদ্দেশ্যে মার্কিন ড্রোনটি ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল। ড্রোনটিকে দ্রুত শনাক্ত করা হয়। আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ড্রোনটিকে ভূপাতিত করা হয়।

মার্কিন বিমানঘাঁটিতে পাল্টা হামলা ইরানের: মধ্যপ্রাচ্যের একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে সফল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস ‘আইআরজিসি’। গতকাল সোমবার ভোরে এই হামলা চালানো হয় বলে বাহিনীর পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে হামলার শিকার হওয়া সেই মার্কিন ঘাঁটিটি মধ্যপ্রাচ্যের ঠিক কোন দেশে অবস্থিত, নিরাপত্তা জনিত কারণে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু জানায়নি আইআরজিসি। 

মার্কিন বাহিনী ঠিক যে ঘাঁটিটি থেকে ইরানের ভূখণ্ডে ওই হামলা চালিয়েছিল, পাল্টা প্রতিরোধ হিসেবে ঠিক সেই ঘাঁটিতেই এই হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, তাদের অ্যারোস্পেস ফোর্স মার্কিন ঘাঁটিটিকে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু করে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং পূর্বনির্ধারিত সব টার্গেটে সফলভাবে আঘাত হানা হয়েছে।

ইরানি এই এলিট বাহিনী মার্কিন প্রশাসনকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছে, ভবিষ্যতে ইরানের ওপর এ ধরনের কোনো আগ্রাসন চালানো হলে তার জবাব ‘মাত্রা ও প্রকৃতির দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন’ হবে। পাশাপাশি তারা উল্লেখ করে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে এর সম্পূর্ণ দায়ভার কেবল যুক্তরাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে। তবে ওয়াশিংটনের সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের এই সফল হামলার দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর বা কোনো মার্কিন কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

ইরানের সঙ্গে চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো হবে- ট্রাম্প: ইরান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন একটি বিবৃতি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, তেহরান সত্যিই একটি চুক্তি করতে চায় এবং শেষ পর্যন্ত যে চুক্তিই হোক না কেন, তা যুক্তরাষ্ট্র এবং যারা আমাদের সঙ্গে আছে তাদের সবার জন্যই ভালো হবে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া ওই পোস্টে ট্রাম্প এই সংঘাত মোকাবিলায় তার ভূমিকার সমালোচনা করায় সমালোচকদের তীব্র আক্রমণ করেছেন। সমালোচকদের নিশানা করে ট্রাম্প লিখেছেন, কিন্তু ডেমোক্র্যাট (‘ডামোক্র্যাট’ বলে ব্যঙ্গ করেছেন) এবং দৃশ্যত দেশপ্রেমহীন বিভিন্ন রিপাবলিকানরা কি এটা বোঝেন না যে রাজনৈতিক সুবিধাবাদীরা যখন নজিরবিহীন স্তরে বারবার নেতিবাচকভাবে কিচিরমিচির করতে থাকে, তখন সঠিকভাবে কাজ করা এবং আলোচনা চালানো আমার জন্য অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে? তারা অনবরত বলতে থাকে যে আমার আরও দ্রুত এগোনো উচিত, নাকি ধীর হওয়া উচিত, যুদ্ধে যাওয়া উচিত, নাকি যুদ্ধে না যাওয়া উচিত বা আরও কত কী!’

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেই যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র- ইরান: যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেই যাচ্ছে বলে দাবি করেছে তেহরান। সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দক্ষিণের একটি বন্দরে মার্কিন হামলার পর সংক্ষিপ্ত সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন অব্যাহত রেখেছে। 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আজ সকালেও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। তিনি অঙ্গীকার করেছেন যে, ইরান তার জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

এর আগে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করা যায় না এবং ইরানি জনগণের অধিকার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তেহরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে সম্মত হবে না। তার এ বক্তব্য এমন সময় এলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের কাছে আরও কঠোর শর্তযুক্ত একটি নতুন শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। এতে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

লেবাননে হামলা জোরদারের নির্দেশ নেতানিয়াহুর: গত দেড় মাস আগে ঘোষিত একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি বজায় থাকা সত্ত্বেও সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই আরও বেগবান করতে লেবাননের ভেতরে ইসরায়েলি সেনাদের আরও অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। 

হিজবুল্লাহর গত শনিবারের ব্যাপক রকেট ও ড্রোন হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ‘আইডিএফ’ দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক ‘বোফোর্ট দুর্গ’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আমি লেবাননে আমাদের স্থল অভিযান আরও সম্প্রসারিত ও জোরদার করতে সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছি।’ 

এদিকে লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ইসরায়েলি বিমান বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের দেইর আল-জাহরানি গ্রামে রাতভর তীব্র বিমান হামলা চালিয়ে অন্তত ৮ জন সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে। গত শুক্রবারই ওয়াশিংটনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর আতিথ্যে দুই দেশের প্রতিরক্ষা প্রতিনিধিদের মধ্যে শান্তি ও যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৪৫ দিন বাড়ানোর আলোচনা হলেও নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাত সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলেছে।

লেবাননে যুদ্ধবিরতি ছাড়া কোনো চুক্তি নয়: যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে লেবাননে যুদ্ধবিরতি বজায় থাকাকে ‘অপরিহার্য শর্ত’ হিসেবে পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান। একইসঙ্গে, এই মুহূর্তে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা চলছে না বলেও দাবি করেছে তেহরান। গতকাল এক সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই অবস্থান স্পষ্ট করেন। 

ইসমাইল বাঘাই বলেন, “আমরা জোরালোভাবে বলতে চাই, যুদ্ধ বন্ধের উদ্দেশ্যে যেকোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য লেবাননে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা একটি আবশ্যকীয় শর্ত।”

গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে লেবাননে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও তা উপেক্ষা করে ইসরায়েল সম্প্রতি তাদের সামরিক আগ্রাসন ও হামলা আরো জোরদার করেছে। বাঘাই জানান, লেবাননের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো চুক্তি হতে পারে না।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন