# যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা
# ইরানের হামলার পর ইউএই’র ঐক্যের ডাক
# যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর জবাবের হুঁশিয়ারি ইরানের
# কুয়েত বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত, ফ্লাইট চলা বন্ধ
# ফের বাড়লো জ্বালানি তেলের দাম
মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে চলমান আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানে নতুন করে ‘আত্মরক্ষামূলক’ হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তারা বিভিন্ন জাহাজ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে ছোড়া ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের হামলার চেষ্টার জবাবে হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে ইরানের বৃহত্তম দ্বীপে এ হামলা চালানো হয়েছে। তারা দাবি করে, ইরানের একটি সামরিক স্থল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়।
এদিকে ইরানও বলেছে, তারা প্রতিশোধ হিসেবে একটি আঞ্চলিক দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও হেলিকপ্টারে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, ইরান কুয়েতের দিকে দুটি এবং বাহরাইনের দিকে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল, যার সব কটিই মাঝপথে বিধ্বস্ত হয়েছে অথবা প্রতিহত করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে গত সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠিত আলোচনা কোনো অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয়। ওই আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরপরই নতুন করে এই হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড আরও জানায়, কেশম দ্বীপে হামলার সময় বেসামরিক নাবিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার উদ্দেশ্যে ছোড়া ইরানের তিনটি ড্রোনও তারা ভূপাতিত করেছে।
বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে এর আগেও ইরান হামলা চালিয়েছে বলে দাবি রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনার আগে মার্কিন পক্ষ জানায়, হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধের অংশ হিসেবে তারা ইরানগামী একটি খালি তেলবাহী ট্যাংকারে আঘাত করে সেটি অচল করে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা: মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ধারাবাহিক কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ‘সফলভাবে প্রতিহত করেছে’ আর ইরানের কেশম দ্বীপে ‘আত্মরক্ষামূলক’ হামলা চালিয়েছে। কেশম দ্বীপে হামলার জবাবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো কুয়েত ও বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যস্থল করেছিল।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরে আঘাত হেনেছে ও ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের পৃথক আরেকটি বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।
গত মঙ্গলবার মার্কিন বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে বলেছে, আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের দিকে বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। তবে সবগুলোই তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানতে ব্যর্থ হয়েছে। কুয়েতের দিকে ছোড়া দুটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হয় অথবা পথেই ভেঙে পড়ে। আর বাইরানের দিকে ছোড়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন ও বাহরাইনের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিহত করেছে।
কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী ‘শত্রুর’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছে। সেন্টকম জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী ‘আঞ্চলিক জলপথ দিয়ে বৈধভাবে চলাচলরত বেসামরিক নাবিকদের দিকে’ ইরানের পাঠানো তিনটি আক্রমণাত্মক ড্রোন গুলি করে নামিয়েছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় কেশম দ্বীপে ‘ইরানি সামরিক বাহিনীর গ্রাউন্ড কন্ট্রেলি স্টেশন’কে লক্ষ্যস্থল করে সেখানে আঘাত হানা হয় বলে জানিয়েছে সেন্টকম। তাদের দাবি, এ পাল্টা-পাল্টি হামলায় কোনো মার্কিন সেনা সদস্য আহত হয়নি।
কেশম দ্বীপের অবস্থান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে তেহরান পারস্য উপসাগরের তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রধান এই পথটি কার্যকরভাবে বন্ধ করে রেখেছে। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ইরনায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করেছে, কেশম দ্বীপে হামলার জবাবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা আঘাত হেনেছে।
ইরানের হামলার পর ইউএই’র ঐক্যের ডাক: কুয়েত ও বাহরাইনে নতুন হামলার ঘটনায় পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। ওই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা হচ্ছে।
আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেছেন, ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র কুয়েত ও বাহরাইনের ওপর ইরানের আগ্রাসনের মুখে উপসাগরীয় দেশগুলোকে দৃঢ়, ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত অবস্থান গড়ে তুলতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে গারগাশ লিখেছেন, কোনো উপসাগরীয় রাষ্ট্রকেই ইরানের হামলার মুখে একা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। কারণ উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর নিরাপত্তা একে অপরের সঙ্গে জড়িত। তাদের স্বার্থ অভিন্ন এবং ভবিষ্যৎ এক সুতোয় গাঁথা।
যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর জবাবের হুঁশিয়ারি ইরানের: ইরানের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, দেশটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কোনো সামরিক হামলা চালালে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার। ইরানের সামরিক নেতাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হবে। তাদের মতে, কাতার, বাহরাইন এবং কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
কুয়েত বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত, ফ্লাইট চলা বন্ধ: কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় একজন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কুয়েতের সামরিক বাহিনী।
কুয়েত নিউজ এজেন্সি (কুনা) এবং রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, হামলার পর পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কুয়েতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরের সব ধরনের ফ্লাইট চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে যেসব ফ্লাইট কুয়েতের উদ্দেশ্যে আসছিল, সেগুলোকে অন্য বিমানবন্দরে অবতরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, হামলায় বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১ (টি-১) ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফের বাড়লো জ্বালানি তেলের দাম: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে মারাত্মক সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে।
ইরানের কৌশলগত কেশম দ্বীপে মার্কিন বিমানবাহিনীর বোমাবর্ষণ এবং এর জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনায় চরম অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় বাজার আরও বেশি অস্থির হয়ে উঠেছে।
কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সংঘাতের জেরে বুধবার সকালে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ০৫ ডলার বা ১ দশমিক ০৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৭ দশমিক ০৫ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ০১ ডলার বা ১ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়ে ৯৪ দশমিক ৭৭ ডলারে উঠেছে।
উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতির সূত্রপাত ঘটেছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমানবাহিনী একজোট হয়ে ইরানের অভ্যন্তরে একযোগে নজিরবিহীন বিমান হামলা চালায়।
পরবর্তীতে প্রতিবেশি দেশ পাকিস্তানের বিশেষ মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা সম্ভব হলেও তা স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেয়নি। বরং যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের পর থেকেই উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে বারবার চুক্তি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় নতুন করে সামরিক চাপ ও পাল্টাপাল্টি হুমকি অব্যাহত রেখেছে।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

