Logo

আন্তর্জাতিক

এইচপিভি ভ্যাকসিনে ব্রিটেনের অভাবনীয় সাফল্য

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ২০:৫৮

এইচপিভি ভ্যাকসিনে ব্রিটেনের অভাবনীয় সাফল্য

ভয়াবহ ও আক্রমণাত্মক জরায়ুমুখ ক্যান্সারের (সার্ভাইকাল ক্যান্সার) চিকিৎসায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে চিকিৎসা বিজ্ঞান। সম্প্রতি প্রকাশিত এক যুগান্তকারী গবেষণায় দেখা গেছে, হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) ভ্যাকসিনের সফল প্রয়োগের ফলে যুক্তরাজ্যে ৩০ বছরের কম বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে জরায়ুমুখ ক্যান্সারে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় 'শূন্যে' নেমে এসেছে।

বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী 'দ্য ল্যানসেট'-এ চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত এই গবেষণা প্রতিবেদনটি বিশ্বজুড়ে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো, যেখানে এই ভ্যাকসিনের গণ-টিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তাদের জন্য এই ফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির গবেষকদের দ্বারা পরিচালিত এবং 'ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে'র অর্থায়নে করা এই গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যবর্তী পাঁচ বছরে যুক্তরাজ্যে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী একজন নারীও জরায়ুমুখ ক্যান্সারে মারা যাননি। অথচ এই ভ্যাকসিন না থাকলে পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই সময়ে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হতে পারতো। তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, ২০০০ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে এই বয়সী ২৫ জন নারী মারা গিয়েছিলেন; ২০০৫-২০০৯ এর মধ্যে ১৬ জন; এবং ২০১০-২০১৪ এর মধ্যে তা ছিল ২৭ জন। ২০০৮ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে কিশোর-কিশোরীদের নিয়মিত এইচপিভি টিকা দেওয়া শুরু হয়, যার ফল মিলছে এখন।

ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে-র প্রধান নির্বাহী মিশেল মিচেল বলেন, এটি ক্যান্সার জয়ের অভিযানে এক অবিশ্বাস্য মাইলফলক। আমরা জানতাম এইচপিভি ভ্যাকসিন ক্যান্সার শুরু হওয়ার আগেই তা রুখে দিতে অত্যন্ত কার্যকর। এবার প্রথমবারের মতো প্রমাণিত হলো যে এটি জীবনও বাঁচাচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এইচপিভি বা হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস হলো ২০০টিরও বেশি ভাইরাসের একটি গ্রুপ, যা মূলত ত্বকের সংস্পর্শে এবং প্রধানত যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ায়। যৌনভাবে সক্রিয় অধিকাংশ মানুষই জীবনে অন্তত একবার এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন, যার কোনো লক্ষণ সাধারণত প্রকাশ পায় না। ৯০ শতাংশ মানুষের শরীর নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মাধ্যমে দুই বছরের মধ্যে এই ভাইরাস ধ্বংস করে দেয়। তবে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এইচপিভি স্ট্রেনগুলো যদি শরীরে দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তবে তা কোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। এর ফলে কোষগুলো অস্বাভাবিক হয়ে প্রাক-ক্যান্সার অবস্থায় পৌঁছায়। চিকিৎসা না করালে এটি জরায়ুমুখ ক্যান্সার ছাড়াও নারী ও পুরুষের শরীরের অন্যান্য অংশে ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া প্রায় ৬৬০,০০০ নারীর মধ্যে ৯৫ শতাংশেরই মূল কারণ এই এইচপিভি। ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে ৩ লাখ ৫০ হাজার নারী এই ক্যান্সারে মারা গেছেন, যার ৯৪ শতাংশই ঘটেছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।

জরায়ুমুখ ক্যান্সারে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি সাব-সাহারা আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ভারতেই ৭৯,৯০৬ জন নারী এই রোগে মারা গেছেন। চীনে এই সংখ্যা ছিল ৫৫,৬৯৪ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ২০,৭০৮ জন। এই ভয়াবহতা রুখতে সম্প্রতি এশিয়ার দেশগুলোতে বড় ধরনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের (২০২৬) ফেব্রুয়ারিতে ভারত ১১.৫ মিলিয়ন (১ কোটি ১৫ লাখ) কিশোরীর জন্য মার্কিন প্রস্তুতকৃত 'গার্ডাসিল' ভ্যাকসিনের মাধ্যমে বিনামূল্যে দেশব্যাপী এইচপিভি টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে চীন তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি 'সেকোলিন' ভ্যাকসিনের মাধ্যমে ১৩ বছর বয়সী মেয়েদের বিনামূল্যে দুই ডোজ টিকা দেওয়া শুরু করে। 

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানে প্রথম এইচপিভি ক্যাম্পেইন শুরু হয়, যার লক্ষ্য ছিল ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সী ১ কোটি ৩০ লাখ মেয়েকে টিকা দেওয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পাকিস্তানে প্রতিদিন ৮ জন নারী জরায়ুমুখ ক্যান্সারে মারা যান। ইন্দোনেশিয়া ২০২৩ সাল থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের এই টিকা দিচ্ছে। বাংলাদেশও সাম্প্রতিক সময়ে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে দেশব্যাপী বিনামূল্যে এইচপিভি টিকাদান ক্যাম্পেইন জোরদার করেছে।

যুক্তরাজ্যের সাফল্য বিশ্বকে আশান্বিত করলেও, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে 'ভ্যাকসিন দ্বিধা' এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপপ্রচার। সামাজিক রক্ষণশীলতার কারণে অনেকে দাবি করছেন, যেহেতু এটি যৌনবাহিত ভাইরাস, তাই দক্ষিণ এশিয়ার মতো রক্ষণশীল সমাজে কিশোরীদের এই টিকার প্রয়োজন নেই।

২০২৫ সালে পাকিস্তানের টিকাদান কর্মসূচির সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) একজন ব্যবহারকারী লেখেন, "জরায়ুমুখ ক্যান্সার ছড়ায় যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে, যা পাকিস্তানে ৯-১৪ বছর বয়সীদের মধ্যে অসম্ভবএটি কেবল পশ্চিমাদের জন্য।" বিশেষজ্ঞরা এই ধারণাকে চরম ভুল এবং বিপজ্জনক বলে আখ্যা দিয়েছেন, কারণ ভাইরাসটি শরীরে বহু বছর সুপ্ত থেকে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় ক্যান্সার রূপ নিতে পারে। এছাড়া আরেকটি বড় গুজব ছড়ানো হচ্ছে যে, এই ভ্যাকসিন নারীদের বন্ধ্যাত্ব বা ইনফার্টিলিটি তৈরি করে। তবে ২০২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক পিয়ার-রিভিউড গবেষণায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে, গার্ডাসিল বা অন্য কোনো এইচপিভি ভ্যাকসিনের সাথে বন্ধ্যাত্বের কোনো সম্পর্ক নেই।

পাকিস্তানে এই টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার পেছনে একটি ঐতিহাসিক মনস্তাত্ত্বিক কারণও রয়েছে। ২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেনকে ধরার জন্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ অ্যাবোটাবাদে একটি ভুয়া হেপাটাইটিস-বি টিকাদান কর্মসূচি চালিয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকে দেশটির সাধারণ মানুষের মনে আন্তর্জাতিক টিকাদান কর্মসূচির প্রতি এক ধরনের স্থায়ী অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। জরায়ুমুখ ক্যান্সারকে প্রাথমিক অবস্থায় (স্টেজ-১) শনাক্ত করা গেলে বেঁচে থাকার হার ৯০ শতাংশের ওপরে।

কিন্তু প্রাথমিক লক্ষণ না থাকায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগটি স্টেজ ২ বা ৩-এ যাওয়ার পর ধরা পড়ে, তখন বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মাত্র ৪০ শতাংশে নেমে আসে। তাই চিকিৎসকদের পরামর্শ৩০ থেকে ৬৫ বছর বয়সী নারীদের প্রতি তিন বছর পর পর 'প্যাপ স্মিয়ার' পরীক্ষা করা উচিত। ব্রিটেনের এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, সঠিক সময়ে টিকাদান এবং কুসংস্কার দূরীকরণের মাধ্যমে জরায়ুমুখ ক্যান্সারকে পৃথিবী থেকে চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব। এখন প্রয়োজন কেবল সরকারি সদিচ্ছা এবং জনসচেতনতা।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন