পাকিস্তানে গোয়েন্দা ঘাটিতে হামলার দাবি আফগানিস্তানের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ২১:০০
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। আল জাজিরা ও রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং "শত্রুভাবাপন্ন গোয়েন্দা চক্রের" আস্তানা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে আফগানিস্তান। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শুক্রবার এই সামরিক অভিযানের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়।
এর আগে গত সপ্তাহে আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের
বিমান হামলার জবাবেই বৃহস্পতিবার রাতে এই পাল্টা হামলা চালায় কাবুল। এই ঘটনার পর দুই
প্রতিবেশী দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা এখন যুদ্ধাবস্থায় রূপ নিয়েছে।
আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সামাজিক
যোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে পাকিস্তানের দুটি সীমান্তবর্তী প্রদেশ—বেলুচিস্তান এবং
খাইবার পাখতুনখোয়ায় আফগান বিমান বাহিনী এই হামলা পরিচালনা করে। কাবুলের দাবি, এই ঘাঁটিগুলো
নির্দিষ্ট কিছু "শত্রুভাবাপন্ন গোয়েন্দা চক্রের" (যা মূলত পাকিস্তানি গোয়েন্দা
সংস্থাকে ইঙ্গিত করে) সহযোগিতায় আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে হামলা ও নাশকতা চালানোর পরিকল্পনা
তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছিল। তবে আফগানিস্তান এই হামলা কীভাবে পরিচালনা করেছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে
জানায়নি।
লন্ডনের ‘ইন্টারন্যাশনাল
ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ -এর তথ্যমতে, আফগানিস্তানের কোনো অত্যাধুনিক
ফাইটার জেট বা যুদ্ধবিমান নেই। তবে তাদের কাছে অন্তত ৬টি বিমান, ২৩টি হেলিকপ্টার এবং
বেশ কিছু সামরিক ড্রোন রয়েছে, যা এর আগেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তালেবান বাহিনী
ব্যবহার করেছিল।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয়
এক বিবৃতিতে কাবুলের এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায়
ফেরার পর থেকেই ইসলামাবাদের সাথে কাবুলের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। পাকিস্তানের ধারাবাহিক
অভিযোগ—টিটিপি বা তেহরিক-ই-তালেবান
পাকিস্তানের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দিচ্ছে কাবুল, যারা পাকিস্তান সীমান্তে
নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে। আফগানিস্তান অবশ্য সবসময় এই অভিযোগ অস্বীকার করে একে পাকিস্তানের
অভ্যন্তরীণ সমস্যা বলে দাবি করে আসছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে
পাকিস্তানের বিমান হামলার জবাবে আফগানিস্তান সীমান্ত পার হয়ে পাল্টা আক্রমণ চালালে
সংঘাত চরম আকার ধারণ করে। পরবর্তীতে মার্চ মাসে চীনের মধ্যস্থতায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি
চুক্তি হলেও, একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনায় তা দ্রুত ভেস্তে যায়।
বেইজিংয়ের ধারাবাহিক শান্তি প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো
সম্ভব হয়নি।
এই সীমান্ত সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে
সাধারণ নাগরিকেরা। জাতিসংঘের মে মাসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন
মাসেই সীমান্ত সংঘর্ষের কারণে অন্তত ৩৭২ জন আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৩৯৭ জন
আহত হয়েছেন। গত সপ্তাহেও আফগানিস্তানের সীমান্ত এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছিল ইসলামাবাদ।
তালেবান প্রশাসনের দাবি, পাকিস্তানের সেই
"পরিকল্পিত হামলায়" ১১টি শিশুসহ অন্তত ১৩ জন নিরীহ বেসামরিক মানুষ নিহত এবং
১৪ জন আহত হন। যদিও পাকিস্তান দাবি করেছিল, তাদের হামলায় ২৬ জন সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত
হয়েছে।
গত সপ্তাহের সেই হত্যাকাণ্ডের বদলা হিসেবেই
বৃহস্পতিবার রাতের এই হামলা চালানো হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আফগান প্রতিরক্ষা
মন্ত্রণালয় শুক্রবার তাদের বিবৃতিতে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, আফগানিস্তান তার নিরাপত্তা
ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে আর কোনো হুমকি সহ্য করবে না। যেকোনো হুমকির উৎসকে গোড়াতেই
ধ্বংস এবং নির্মূল করার জন্য আফগানিস্তান তার সমস্ত উপলব্ধ উপায় ও সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার
করবে।
এই বিমান হামলার পর দুই দেশের সীমান্তে
অতিরিক্ত সেনা ও ভারী অস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলের আঞ্চলিক
স্থিতিশীলতাকে এক বড় ঝুঁকিতে ফেলে দিল।

