যুদ্ধ এড়াতে প্রতিরক্ষা জোরদার করাই একমাত্র পথ: কোইজুমি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ২১:০২
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে 'শান্তিবাদী' বা যুদ্ধবিরোধী নীতি জাপানের রাষ্ট্রীয় পরিচয় নির্ধারণ করেছিল, তা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিলেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি।
বিবিসি-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি সাফ জানিয়েছেন, এ অঞ্চলে নতুন কোনো যুদ্ধ যাতে বেঁধে না যায়, তা নিশ্চিত করতে জাপানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের শান্তিবাদী সংবিধান সংশোধন করা এখন সময়ের দাবি।
টোকিওতে নিজের দপ্তরে বসে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে
৪৫ বছর বয়সী এই প্রভাবশালী নেতা বলেন, "জাপানকে অবশ্যই তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা
শক্তিশালী করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জোটকে আরও সুদৃঢ় করা এবং সমমনা দেশগুলোর সাথে
সহযোগিতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমেই কেবল এই অঞ্চলে একটি বহুমাত্রিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে
তোলা সম্ভব।"
বিগত কয়েক দশক ধরে জাপানের ওপর মারাত্মক
আত্মরক্ষামূলক বিধিনিষেধ ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে টোকিওর প্রতিরক্ষা নীতিতে বড় ধরনের
পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। দীর্ঘ ৫০ বছরের মধ্যে এই প্রথম জাপান
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের ১৭টি দেশের কাছে মারাত্মক ও প্রাণঘাতী অস্ত্র এবং
সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই করেছে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানি সামরিক
সরঞ্জাম বাণিজ্যের এই নতুন রূপরেখাকে 'নজিরবিহীন' আখ্যা দিয়ে কোইজুমি বলেন, অস্ট্রেলিয়া
ইতিমধ্যে জাপানি যুদ্ধজাহাজ বেছে নিয়েছে। জাপানের মেরিটাইম সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সের ব্যবহৃত
ডেস্ট্রয়ার (যুদ্ধজাহাজ) নেওয়ার বিষয়ে ফিলিপাইনের সাথে আলোচনা চলছে। এছাড়া আমরা ইন্দোনেশিয়ার
সাথে গভীর আলোচনা চালাচ্ছি এবং নিউজিল্যান্ডও আমাদের ডেস্ট্রয়ার কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে জাপানের ক্ষমতায় আসেন
কট্টর ডানপন্থী ও রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই
তিনি জাপানি সংবিধানের ঐতিহাসিক 'ধারা ৯' সংশোধনের
জন্য জোরালো চাপ দিচ্ছেন। এই ধারা অনুযায়ী, সার্বভৌম অধিকার হিসেবে জাপান কখনো কোনো
যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে না এবং আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে বলপ্রয়োগ করতে পারবে
না। এমনকি কাগজে-কলমে জাপান কোনো স্থল, নৌ বা বিমান বাহিনীও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে
না।
প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির এই পদক্ষেপকে সমর্থন
জানিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী কোইজুমি (যিনি জাপানের সাবেক জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী জুনিচিরো
কোইজুমির ছেলে) বলেন, বিগত আট দশকে আমাদের চারপাশের নিরাপত্তা পরিবেশ নাটকীয়ভাবে বদলে
গেছে। জাপানকে যদি শান্তিতে থাকতে হয়, তবে এই পরিবর্তনের সাথে আমাদের মানিয়ে নিতে হবে।
আইনি ও রাজনৈতিকভাবে জাপানের সামরিক বাহিনীকে
'সামরিক বাহিনী' না বলে 'সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সেস' বা আত্মরক্ষা বাহিনী বলা হয়। কোইজুমি
চান এই বাহিনীর সেনারা যেন গর্ব ও সম্মানের সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে এবং
সংবিধানে তাদের আইনি স্বীকৃতি মেলে। জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের সর্বশেষ শ্বেতপত্রে
চীনের সামরিক তৎপরতাকে দেশটির জন্য "সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ" হিসেবে
চিহ্নিত করেছে।
স্বশাসিত তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে বেইজিংয়ের
দাবি এবং বিরোধপূর্ণ সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জে (চীন যাকে দিয়াওইউ বলে) চীনা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের
নিয়মিত অনুপ্রবেশ টোকিওকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। এর পাশাপাশি জাপানের ওপর দিয়ে উত্তর
কোরিয়ার একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা এই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
যদিও বেইজিং জাপানের এই তৎপরতাকে
"নতুন সামরিকবাদ" বলে সমালোচনা করেছে। তবে কোইজুমি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন,
চীনের বিশাল অস্ত্রভাণ্ডারই বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।
তবে জাপান বেইজিংয়ের সাথে আলোচনার দুয়ার সবসময় খোলা রেখেছে বলেও তিনি জানান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মার্কিন-জাপান
নিরাপত্তা চুক্তিই ছিল জাপানের প্রতিরক্ষার মূল ভিত্তি। বর্তমানে জাপানে প্রায় ৫০,০০০
মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয়
মেয়াদ শুরু হওয়ার পর মিত্র দেশগুলোর ওপর প্রতিরক্ষা ব্যয় ভাগ করে নেওয়ার চাপ বাড়ছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথও স্পষ্ট করে বলেছেন যে, ধনী দেশগুলোর
প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ভর্তুকি দেওয়ার দিন শেষ।
এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির প্রশাসন
জাপানের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়ে জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করেছে, যা যুদ্ধ-পরবর্তী
ইতিহাসের দীর্ঘদিনের রেকর্ডকে ভেঙে দ্বিগুণ করা হলো।
এই বিপুল অর্থ জাপান নতুন প্রযুক্তির সারফেস-টু-শিপ
(উপকূল থেকে জাহাজে নিক্ষেপণযোগ্য) মিসাইল, চালকবিহীন ড্রোন এবং আধুনিক সাবমেরিন তৈরিতে
বিনিয়োগ করছে। তবে সরকারের এই সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে জাপানের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম
যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভও দানা বাঁধছে। সমালোচকদের মতে, সংবিধান সংশোধন না করেও বর্তমান
আইনি কাঠামোর মধ্যেই চীনকে মোকাবেলা করা সম্ভব।
সবশেষে প্রতিরক্ষামন্ত্রী কোইজুমি মনে
করিয়ে দেন, সংবিধান সংশোধনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসলে জাপানের জনগণের হাতেই থাকবে, যা
একটি জাতীয় গণভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
তবে নিজের দেশের সুরক্ষায় জাপানের একক ভূমিকার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, "এটি আমাদের
দেশ। আমাদেরই একে রক্ষা করতে হবে।"

