অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডে প্রথম বার্ড ফ্লুর হানা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ২১:০৭
এতদিন পর্যন্ত পৃথিবীর একমাত্র মহাদেশ হিসেবে মারাত্মক 'এইচ৫এন১' বার্ড ফ্লুর প্রকোপ থেকে মুক্ত ছিল অস্ট্রেলিয়া। তবে সেই স্বস্তির দিন বুঝি এবার শেষ হতে চলেছে। দ্য গার্ডিয়ানের বরাতে জানা গেছে, দক্ষিণ পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডে একটি পরিযায়ী সামুদ্রিক পাখির শরীরে বার্ড ফ্লু ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।
পাখিটির শরীরে পাওয়া ভাইরাসটি বিশ্বজুড়ে
লাখ লাখ পাখির প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই প্রাণঘাতী এইচ৫এন১ স্ট্রেন কি না, তা নিশ্চিত করতে
চলছে চূড়ান্ত পরীক্ষা।
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া সরকারের পক্ষ থেকে
জানানো হয়েছে, কেপ লে গ্র্যান্ড ন্যাশনাল পার্কের সৈকত থেকে একটি অসুস্থ 'ব্রাউন স্কুয়া'
(এক ধরণের উপ-অ্যান্টার্কটিক সামুদ্রিক পাখি) উদ্ধার করা হয়, যা পরবর্তীতে মারা যায়।
এছাড়া একই এলাকা থেকে একটি 'জায়ান্ট পেট্রেল' নামের আরেকটি অসুস্থ পাখি উদ্ধার করা
হয়েছে, যার শরীর থেকেও নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
প্রাথমিক ল্যাব টেস্টে সামুদ্রিক পাখিটির
শরীরে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার "সম্ভাব্য পজিটিভ" ফলাফল এসেছে বলে নিশ্চিত
করেছেন দেশটির কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী জুলি কলিন্স। চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে নমুনাগুলো
মেলবোর্নের সিএসআইআরও অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিপেয়ার্ডনেস-এ পাঠানো হয়েছে,
যার ফলাফল আজ শনিবার আসার কথা রয়েছে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে শুক্রবারই রাজ্য
ও আঞ্চলিক সংস্থা এবং শিল্প বিশেষজ্ঞদের সাথে জরুরি বৈঠকে বসেন কৃষিমন্ত্রী। জুলি কলিন্স
বলেন, এখন পর্যন্ত মূল ভূখণ্ডে বন্যপ্রাণীর ব্যাপক মৃত্যু বা হাঁস-মুরগির খামারে (পোল্ট্রি)
এই ভাইরাসের সংক্রমণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এটি যদি সত্যিই এইচ৫ বার্ড ফ্লু
হিসেবে নিশ্চিত হয়, তবে তা হবে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যদিও বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায়
এটি আমাদের জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল না।
একমাত্র মহাদেশ হিসেবে আমরা চিরকাল বার্ড
ফ্লু মুক্ত থাকব, এমনটা ভাবা ঠিক হতো না। তিনি সাধারণ জনগণকে কোনো অসুস্থ বা মৃত পাখি
এবং বন্যপ্রাণী স্পর্শ না করার জন্য বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন। এই খবরটি এমন এক সময়ে
এল যার মাত্র কয়েক দিন আগেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে, অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ড
থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত 'হার্ড আইল্যান্ড' -এ এই ভাইরাসের সংক্রমণে
প্রায় ১৩,০০০ সাউদার্ন এলিফ্যান্ট সিল শাবক এবং শত শত কিং পেঙ্গুইন মারা গেছে।
পরিবেশবাদী সংস্থা 'ইনভ্যাসিভ স্পিসিস
কাউন্সিল'-এর পলিসি ডিরেক্টর ড. ক্যারল বুথ বলেন, আমরা মনেপ্রাণে আশা করছি আমাদের সবচেয়ে
খারাপ দুঃস্বপ্নটি যেন সত্যি না হয়। হার্ড আইল্যান্ডে হাতির সিলের ব্যাপক মৃত্যু ছিল
মূলত একটি সতর্কবার্তা যে, ভাইরাসটি অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডে চলে এলে আমাদের বন্যপ্রাণীর
ওপর কতটা ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
তিনি আরও যোগ করেন, যদি এটি এইচ৫এন১ হিসেবে
নিশ্চিত হয়, তবে তা অস্ট্রেলিয়ার বিপন্ন বন্যপাখি এবং সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের
জন্য এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে। তবে গত দুই বছর ধরে অস্ট্রেলিয়া সরকার এই ভাইরাসের আগমন
ঠেকাতে যে প্রস্তুতি নিয়ে আসছিল, এটি হবে সেই প্রস্তুতি ও সাড়াদান ব্যবস্থার আসল অগ্নিপরীক্ষা।
'বার্ডলাইফ অস্ট্রেলিয়া'-এর প্রধান নির্বাহী
কেট মিলার এই ঘটনাকে "চরম উদ্বেগজনক" বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, তাদের
সংস্থার বিজ্ঞানী ও মাঠপর্যায়ের কর্মীরা সরকারের সাথে যুক্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই ভাইরাসের
সম্ভাব্য প্রবেশপথগুলো নিয়ে কাজ করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার
এই মারাত্মক স্ট্রেনটি মূলত দুটি পথে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করতে পারে—একটি হচ্ছে সাব-অ্যান্টার্কটিক
দ্বীপপুঞ্জের মাধ্যমে দক্ষিণ দিক থেকে এবং অন্যটি এশিয়া থেকে পরিযায়ী পাখিদের মাধ্যমে
উত্তর অস্ট্রেলিয়া হয়ে।
২০২১ সালে ইউরোপে শুরু হওয়ার পর থেকে এইচ৫এন১
বার্ড ফ্লু বিশ্বজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এবং কোটি কোটি বন্যপাখি, গৃহপালিত হাঁস-মুরগি
এবং সিলের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়েছে। যদি অস্ট্রেলিয়ার ল্যাব টেস্টের
ফলাফল পজিটিভ আসে, তবে দেশজুড়ে একযোগে দ্রুত ও সমন্বিত জরুরি জাতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার
কৃষি মন্ত্রণালয়।

