ভেস্তে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা চুক্তি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ২০:৫৯
# পাল্টাপাল্টি দোষারোপ
# ইরানের অস্তিত্ব থাকবে না: ট্রাম্প
# ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি
# ইরাক সফরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
# লেবানন–ইসরায়েল চুক্তি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর
সম্প্রতি ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন হামলার জবাবে গতকাল রোববার ভোরে ইরান পাল্টা আঘাত হানে। আইআরজিসি-র নৌবাহিনী এক কঠোর বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘মার্কিন হামলা হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করতে পারবে না।’ ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই পাল্টাপাল্টি হামলায় ভেস্তে যেতে বসেছে যুদ্ধবিরতির চুক্তি। দুই পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী বলছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলার সুযোগ নষ্ট করেছে ইরান। জবাবে আইআরজিসি হুঁশিয়ারি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি লঙ্ঘন করলে আগের চেয়েও কঠোর জবাব দেয়া হবে। এমন অবস্থায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির আগে বিস্তৃত আলোচনার ভিত্তিতে সমঝোতা স্মারকের আওতায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল অন্তর্ভুক্ত ছিল। কারণ এই জলপথটি বন্ধ হওয়ার পর থেকেই বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বেড়ে যায় আকস্মিকভাবে। ইরান বলছে, ৬০ দিনের অন্তর্বর্তী সময়ে হরমুজে জাহাজ চলাচলে নতুন ব্যবস্থা চালু করা হবে। এমনকি তাদের অনুমতি ছাড়া কেউ এই নৌপথ ব্যবহার করতে পারবে না। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এ অবস্থানের বিরোধিতা করে আসছে।
গতকাল শনিবার হরমুজ প্রণালিতে পানামার পতাকাবাহী একটি জাহাজে ইরানের ড্রোন হামলার জেরে তেহরানে পাল্টা হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। নতুন করে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতা স্মারক ও যুদ্ধবিরতির চুক্তি ভেস্তে যেতে বসেছে। এ ঘটনায় একে অপরকে দোষারোপ করছে ওয়াশিংটন ও তেহরান।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর অব্যাহত আগ্রাসনের জবাবে তারা ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে তারা। এর প্রতিশোধ হিসেবে কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী।
সেন্টকম এক বিবৃতিতে বলেছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলার সুযোগ দেয়া হয়েছিল ইরানকে। তবে তা লঙ্ঘন করেছে তারা। তাই হরমুজ প্রণালির সুরক্ষায় ১০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে, আইআরজিসি হুঁশিয়ারি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাহলে, ইরানের জবাব আগের চেয়েও কঠোর হবে। আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, শত্রুর যেকোনো আক্রমণ মোকাবিলায় প্রস্তুত ইরান।
আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণকে নিষ্ঠুর হামলা উল্লেখ করে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের অভিযোগ, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বভাব। আর ট্রাম্প বলছে, তেহরান কখনোই শিক্ষা নেবে না। সামরিক উপায়েই তাদের দমন করতে হবে।
বেশ কিছুদিন ধরেই ট্রাম্প ও মার্কিন কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ কমে এসেছে। তবে, ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ বলেছেন, হরমুজ প্রণালি কখনোই যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে দুই দেশের এই নতুন সামরিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের চলমান শান্তি আলোচনাকে সম্পূর্ণ ভেস্তে দেওয়ার পাশাপাশি অত্যন্ত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিটিকে চূড়ান্ত পতনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।
ইরানের অস্তিত্ব থাকবে না-ট্রাম্প: যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ‘দোজখের অভিজ্ঞতা’ দেওয়ার পাল্টা হুমকি দিয়ে কুয়েত ও বাহরাইনে একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এই ঘটনার পর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র পুরোদমে যুদ্ধ শুরু করলে এই পৃথিবীতে ইরান নামক রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।
হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলার জের ধরে শনিবার (২৭ জুন) রাতে ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন বাহিনীর টানা দ্বিতীয়বার বোমাবর্ষণের পর এই চরম যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লিখেছেন, ‘এটি অত্যন্ত সম্ভব যে তারা (ইরান) কখনোই শিক্ষা নেবে না। এমন একটি সময় আসতে পারে যখন আমরা আর যুক্তিসঙ্গত আচরণ করতে পারব না এবং আমরা অত্যন্ত সফলভাবে যে সামরিক কাজটি শুরু করেছিলাম তা সম্পূর্ণভাবে শেষ করতে বাধ্য হব।’
ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে এই যৌথ অভিযান চালায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)।
সম্প্রতি ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন হামলার জবাবে গতকার ভোরে তারা এই পাল্টা আঘাত হানে। আইআরজিসি-র নৌবাহিনী এক কঠোর বিবৃতিতে জানিয়েছে, মার্কিন হামলা হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করতে পারবে না। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো নরকীয় পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে। এ ছাড়া ওয়াশিংটনের যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দেওয়া হবে বলেও তারা ঘোষণা করেছে।
এই ঘটনার পর দুই সপ্তাহের মাথায় দুই দেশের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তেহরানকে সতর্ক করেছেন যে, নতুন করে সংঘাত বাড়লে ইরানের অস্তিত্ব চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। ইরানের আইআরজিসি জানিয়েছে, শনিবার (২৭ জুন) হরমুজ প্রণালির কাছে সিরিক দ্বীপে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুতকেন্দ্র এবং রাডার সাইটে মার্কিন হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে ২০ লাখ ব্যারেল তেলবাহী একটি বাণিজ্যিক ট্যাঙ্কারে ইরানের ড্রোন হামলার জবাবেই তারা এই সামরিক অ্যাকশন নিয়েছিল।
কুয়েতের সেনাবাহিনী নিশ্চিত করেছে যে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে প্রতিহত করছে। তবে মার্কিন ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের পরিমাণ এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।
ইরাক সফরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী: যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা আমেরিকার ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য বানাচ্ছে ইরান। ঠিক এই সময়ে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সরকারি সফরে ইরাকের রাজধানী বাগদাদের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
গতকাল শনিবার টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় আরাগচি এ তথ্য জানান। সফরকালে তিনি ইরাকের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বৈঠকে ইরান-ইরাকের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সর্বশেষ আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হতে পারে। যদিও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৈঠকের বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেনি। তবে সফরটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতির মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
লেবানন–ইসরায়েল চুক্তি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে স্বাক্ষরিত রূপরেখা চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন হিজবুল্লাহর প্রধান নাইম কাশেম। গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে নাইম কাশেম ওই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকের আলোকে লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলের সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার করার আহ্বান জানান।
তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর একটি প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। গত শুক্রবার বৈরুত ও তেল আবিবের মধ্যে পঞ্চম দফা আলোচনা শেষে ওয়াশিংটনে ওই রূপরেখা চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর এই প্রথম এ নিয়ে মন্তব্য করলেন হিজবুল্লাহর প্রধান।
হিজবুল্লাহর প্রধান বলেন, ‘এ চুক্তি সম্পূর্ণ অবৈধ ও অকার্যকর এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতিগুলো অবশ্যই কার্যকর করতে হবে।’
বিবৃতিতে কাশেম সতর্ক করে আরও বলেন, ‘লেবাননের পুরো ভূখণ্ডে প্রতিরোধ বাহিনীর (হিজবুল্লাহ) নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারকে যুক্ত করা অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি প্রস্তাব, যা সব বিপৎসীমা অতিক্রম করে। এমন পদক্ষেপ লেবাননকে শত্রু ইসরায়েলের হাতের পুতুলে পরিণত করবে।’
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

