ইবোলা আতঙ্কে কাঁপছে কঙ্গো
গৃহযুদ্ধ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলায় ছড়াচ্ছে মহামারি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ২০:৩১
ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআরসি) মাত্র দুই মাস আগে শনাক্ত হওয়া প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাস এখন দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে পূর্ব আফ্রিকায় মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। কঙ্গো সরকারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই দেশটিতে ১ হাজার ৭৫৯ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬০০ জন। শুধু কঙ্গোতেই নয়, প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও ইবোলা থাবা বসিয়েছে; সেখানে ২০ জন আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি ২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইবোলার
এই প্রাদুর্ভাবটি ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করতে পারে। মূলত বিরল
ও অননুমোদিত ‘বুন্দিবুগিও’ ভ্যারিয়েন্টের
কারণে সৃষ্ট এই রোগের কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন নেই। আফ্রিকা সেন্টার্স
ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন-এর জরুরি প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া বিভাগের প্রধান
উইসাম মানকুলা জানান, ইবোলা ভাইরাসের ইতিহাসে এটিই এযাবৎকালের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল
ও ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব।
কঙ্গোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে
গত মে মাসে প্রথম ইবোলা শনাক্ত হয়। এরপর তা দ্রুত প্রতিবেশী উত্তর কিভু এবং দক্ষিণ
কিভু প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। দুর্ভাগ্যবশত, এই তিনটি জেলাই দীর্ঘদিন ধরে রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র
গোষ্ঠীগুলোর যুদ্ধক্ষেত্র। ইতুরি প্রদেশে খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে বিভিন্ন মিলিশিয়া
বাহিনী নিজেদের মধ্যে লড়ছে, যার ফলে সেখানে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবেতর
জীবনযাপন করছে। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘অ্যাকলেড’-এর সিনিয়র অ্যানালিস্ট ল্যাড সারওয়াত
জানান, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্যের কারণে আক্রান্ত অঞ্চলে মানবিক সহায়তা এবং চিকিৎসা
পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কঙ্গো সেনাবাহিনী এবং বিদ্রোহী ‘এম২৩’ জোটের মধ্যকার যুদ্ধের ফলে উপদ্রুত অঞ্চলের
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমন্বয় ও তথ্য আদান-প্রদান সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
কঙ্গোর এই মানবিক বিপর্যয়ের পেছনে আন্তর্জাতিক
অর্থায়নের অভাবকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন
স্টেট ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে পরিচালিত বিভিন্ন বৈদেশিক সাহায্য কর্মসূচির তহবিল স্থগিত
বা ফ্রিজ করার পর থেকেই কঙ্গোতে মানবিক সহায়তার পরিমাণ মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। জাতিসংঘের
মানবিক বিষয়ক সমন্বয় অফিসের কঙ্গো প্রধান কার্লা মার্টিনেজ বলেন, তহবিল কমে যাওয়ায়
১০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা তাদের কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে।
এর ফলে স্থানীয় স্বাস্থ্য নজরদারি নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়েছিল, যা নতুন করে ইবোলার
মতো ভাইরাসের দ্রুত বিস্তারকে ত্বরান্বিত করেছে।
ইবোলা নিয়ন্ত্রণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে ছড়ানো নানা গুজব ও ভুল তথ্য। দশকের পর দশক ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বহিরাগত হস্তক্ষেপের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা চিকিৎসা স্বেচ্ছাসেবকদের সহজে বিশ্বাস করতে পারছেন না।
রেড ক্রসের আন্তর্জাতিক ফেডারেশনের মুখপাত্র
অ্যালেক্স লক জানিয়েছেন, এই প্রাদুর্ভাবের মধ্যে অন্তত ১০ জন রেড ক্রস স্বেচ্ছাসেবক
উগ্র জনতার হামলার শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪ জন গুরুতর আহত। গত মাসে একটি নিরাপদ
দাফন সম্পন্ন করার সময় স্থানীয়দের হামলায় আহত দুই স্বেচ্ছাসেবককে আশঙ্কাজনক অবস্থায়
হেলিকপ্টারে করে রাজধানী কিনশাসায় স্থানান্তর করা হয়। এই ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার
কারণে রেড ক্রস ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাকে প্রায়শই তাদের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম
স্থগিত রাখতে হচ্ছে, যা ইবোলা প্রতিরোধের সমস্ত চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে। বৈশ্বিক
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কঙ্গোর এই পরিস্থিতি যদি দ্রুত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর
না কাড়ে, তবে এই ভাইরাস পুরো আফ্রিকাজুড়ে এক মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

