Logo

আন্তর্জাতিক

ইরানের ওপর ফের মার্কিন নৌ-অবরোধ, পাল্টাপাল্টি হামলা

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ২০:৫২

ইরানের ওপর ফের মার্কিন নৌ-অবরোধ, পাল্টাপাল্টি হামলা

# মার্কিন হামলায় ইরানের ৭ সেনাসহ নিহত ৩৭

# মধ্যপ্রাচ্যের সব সমুদ্রপথ বন্ধের হুমকি ইরানের

ইরানের ওপর আবারও নৌ-অবরোধ আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে তেহরান আলোচনার টেবিলে না বসলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলো উড়িয়ে দেওয়া হবে। গতকাল মঙ্গলবার রাত ৮টা থেকে ইরানের সব বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় নৌ-অবরোধ পুনরায় কার্যকর করেছে মার্কিন বাহিনী।

এর আগে গত এপ্রিলের মাঝামাঝিতে প্রথমবার এই অবরোধ আরোপ করা হয়েছিল এবং স্থায়ীভাবে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে গত জুনে হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির পর তা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। ওই চুক্তিতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু হরমুজ প্রণালি নিয়ে দ্বন্দ্ব তীব্র হওয়ায় সেই আলোচনা থমকে গেছে।

ফক্স নিউজ-এর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'স্পেশাল রিপোর্ট উইথ ব্রেট বেয়ার'-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, 'আজ রাতে আমরা তাদের ওপর খুব শক্ত হামলা চালাতে যাচ্ছি। আগামীকাল রাতেও আমরা খুব শক্ত হামলা চালাব। এর পরের রাতেও হামলা চালানো হবে। আর আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতি তাদের জন্য আরও ভয়াবহ হবে, কারণ আগামী সপ্তাহে আমরা তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করতে যাচ্ছি। আগামী সপ্তাহে আমরা তাদের সেতুগুলো ধ্বংস করতে যাচ্ছি। তারা যদি আলোচনার টেবিলে এসে আলোচনা শুরু না করে, তবে আমরা তাদের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু গুঁড়িয়ে দেব।'

তিনি আরও যোগ করেন, 'আমি জ্বালানি খাতের লক্ষ্যবস্তুগুলোকে সবার শেষের জন্য বাঁচিয়ে রাখছি, তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে আমরা সেখানেও আঘাত করব।'

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ইরানি প্রতিনিধিদের কাছে ওয়াশিংটন কী বার্তা পাঠিয়েছে? জবাবে ট্রাম্প বলেন, 'তোমাদের জন্য একটি চুক্তিতে পৌঁছানোই ভালো হবে। তোমাদের কাছে আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। আমরা বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তার বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করছি, তবে তোমাদের জন্য একটি চুক্তিতে পৌঁছানোই ভালো হবে, অন্যথায় তোমাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।'

যুক্তরাষ্ট্রের এই চাপ প্রয়োগের তীব্র সমালোচনা করে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদী রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে আমাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা কঠোর করে, সামরিক শক্তি খাটিয়ে কিংবা অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়ে আমাদের আলোচনায় ফেরানো যাবে, তবে তারা ভুল করছে।'

পাল্টাপাল্টি হামলা: বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের (ফিফথ ফ্লিট) প্রধান ঘাঁটিতে বড় ধরনের এক 'বিধ্বংসী হামলা' চালিয়ে সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করেছে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি)। আজ সকালে চালানো এই হামলায় ঘাঁটির কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার, নৌ-সহায়তা ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র, গুদামঘর এবং জ্বালানি ট্যাংকগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে বলে আইআরজিসির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

অন্যদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা স্থানীয় সময় গত ১৪ জুলাই রাত ১০টায় ইরানের ওপর নতুন করে আরেক দফা বিমান হামলা সম্পন্ন করেছে। এই হামলায় 'হরমুজ প্রণালি এবং ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত ডজনখানেক সামরিক লক্ষ্যবস্তু' ধ্বংস করা হয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সাত ঘণ্টাব্যাপী পরিচালিত এই অভিযানে মার্কিন ফাইটার জেট, ড্রোন এবং যুদ্ধজাহাজ থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সাইট, নৌ সক্ষমতা এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্য করে নিখুঁতভাবে 'গাইডেড' বা নির্ভুল যুদ্ধাস্ত্র (প্রিসিশন মিউনিশন) নিক্ষেপ করা হয়েছে।

সেন্টকমের দাবি, 'বাণিজ্যিক জাহাজ এবং বেসামরিক নাবিকদের ওপর হুমকি সৃষ্টি করার ইরানি সক্ষমতা আরও দুর্বল করে দেওয়ার' লক্ষ্যেই এই নতুন হামলাগুলো চালানো হয়েছে।

আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, তারা কুয়েতের মিনা আবদুল্লাহ এলাকায় অবস্থিত 'পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রধান লজিস্টিকস ও সাপোর্ট সেন্টারে' হামলা চালিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি-র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসির 'নসর ২' অভিযানের চতুর্থ ধাপের হামলায় মার্কিন সামরিক স্থাপনাটি 'সম্পূর্ণ জ্বলে ধ্বংস' হয়ে গেছে।

ইরানে মার্কিন হামলায় ৭ সেনাসহ নিহত ৩৭: ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে গত কয়েকদিনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ৩০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। গতকাল বুধবার দেশটির সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি এমন তথ্য দিয়েছেন। আর সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে অন্তত সাতজন সেনা নিহতের কথা বলা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে মোহাজেরানি লিখেছেন, শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহানুভূতি প্রকাশের পাশাপাশি আমরা নিহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। সরকার তার সমস্ত শক্তি দিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়াবে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চল হলো এই ভূখণ্ডের স্পন্দন।

সামরিক বাহিনীর বরাত দিয়ে তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইরানশাহর শহরের বামপুর গ্যারিসনে (সেনাঘাঁটি) যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এতে ৩৮৮ ব্রিগেডের সাতজন সদস্য নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। সামরিক বাহিনী উপযুক্ত সময়ে এই অপরাধের জবাব দেবে।

একইদিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর জানিয়েছেন, গত কয়েকদিনের মার্কিন হামলায় ২৬০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২২২ জনকে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আহতদের মধ্যে তিনজনের বয়স ১৮ বছরের কম। 

সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুশেহর প্রদেশে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলেও তাতে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো সতর্ক অবস্থানে আছে এবং শহরে শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সব সমুদ্রপথ বন্ধের হুমকি ইরানের: ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সুবিধা হয় এমন সব জ্বালানি রপ্তানির করিডর বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। গতকাল বুধবার দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

আইআরজিসির এই হুমকির আগে ইরান হরমুজ প্রণালি নতুন করে বন্ধ করে দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর ফের অবরোধ আরোপ করেছে।

বুধবার আইআরএনএতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, আঞ্চলিক জ্বালানি রপ্তানির সুবিধা সবাই পাবে, নয়তো কেউই পাবে না।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান মূলত ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব-এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি জ্বালানি পরিবহন পথই ঝুঁকিতে পড়বে। সংকীর্ণ এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সৌদি আরবের তেল রপ্তানি এবং বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের বড় অংশ এই পথ দিয়েই হয়।

ইরানের প্রেস টিভির খবরে বলা হয়, গত সোমবার হুতিদের এক জ্যেষ্ঠ নেতা সতর্ক করে বলেছেন, সৌদি আরব যদি ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে যায় তাহলে তারা বাব-এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে প্রস্তুত। তিনি দাবি করেন, এমন হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।

এদিকে সোমবার সৌদি আরব হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিমানবন্দরে বোমা হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করে হুতিরা পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর মাধ্যমে চার বছরের যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেল।

হুতিরা আগেই প্রমাণ করেছে যে, বাব-এল-মান্দেব বন্ধ করে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যাহত করার ক্ষমতা তাদের আছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর তারা লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালিয়ে বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করেছিল। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার সক্ষমতা দুর্বল করতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা শুরু করার একদিন পরই আইআরজিসি এই নতুন হুমকি দিল।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন