# মিসরের গ্যাস বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণ
# পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ ছড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি: ইরান
# আন্তর্জাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ সৌদির
# যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের আলোচনা চলমান: পাকিস্তান
# ট্রাম্পের সঙ্গে সৌদি প্রিন্সের জরুরি বৈঠক
মিসরের দামিয়েত্তা প্রাকৃতিক গ্যাস বন্দরে ড্রোন হামলায় বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তবে গত বুধবার ওই হামলার জবাবে মিসর এখনও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। একই দিনে ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যৌথ বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। এর জবাবে ইরান আবার জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি ও হরমুজ প্রণালিতে থাকা জাহাজ লক্ষ্য করে হামলার কথা স্বীকার করেছে। এদিকে, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার মুখে লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল নিরাপদ রাখতে একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব। আর এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন মোড় ও নতুন মাত্রা পেয়েছে।
এদিকে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তির মধ্যে টেলিফোনে আলোচনা হয়েছে। তারা গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানান।
ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রের তথ্য অনুযায়ী, দামিয়েত্তা বন্দরে একটি জাহাজে ড্রোন আঘাত হানলে আগুন ছড়িয়ে পাশের আরেকটি জাহাজেও পৌঁছে যায়। নাবিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। তবে এ হামলার দায় এখনো কোনো পক্ষ স্বীকার করেনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব জানিয়েছে, ইরাক থেকে সৌদি তেলের স্থাপনায় চালানো ড্রোন হামলার জবাবে তারা ইরান-সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ)-এর বিভিন্ন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। পিএমএফ-এর দাবি, এসব হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মার্কিন সেনাদের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর জবাব দেবে। অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান দেশবাসীকে শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ইরান অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবে না।
এদিকে, রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী দক্ষিণ লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে ফি আদায়ের পরিকল্পনা করছে। যদিও এ পরিকল্পনা কবে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও বড় প্রভাব পড়েছে। বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোর অন্যতম বড় মূল্যবৃদ্ধি।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ ছড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি- ইরান: ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরান। দেশটির দাবি, এই হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পশ্চিম এশিয়াজুড়ে সংঘাত আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে। খবর শাফাক নিউজ এজেন্সির। গত বুধবার এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ইরাকের সরকারি স্থাপনা, আরবাইন তীর্থযাত্রীদের মিছিল এবং বিভিন্ন সেবাকেন্দ্রে হামলা দেশটির সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ হামলার ‘অপরাধমূলক, অমানবিক ও উসকানিমূলক’ পরিণতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের দায়ী করে তেহরান।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ও সৌদি আরব জানায়, মার্কিন বাহিনী ও সৌদি জ্বালানি স্থাপনায় ড্রোন হামলার জবাবে পূর্ব ইরাকে অস্ত্রগুদাম ও সরবরাহকেন্দ্রে যৌথ বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, এসব হামলার জন্য ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দায়ী।
তবে ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের (আনসারুল্লাহ) রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য আবদুল্লাহ আল-নুমি এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, সৌদি আরবে আগের হামলাগুলোর দায় হুথিরা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে এবং সেগুলো ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) পরিচালনা করেনি।
এদিকে পিএমএফ জানিয়েছে, সাতটি প্রদেশে তাদের সদর দপ্তরে চালানো হামলায় অন্তত ২০ সদস্য নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছেন। ঘটনার পর ইরাকের প্রধানমন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আলী আল-জায়েদি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকেন। তবে বৈঠকের ফলাফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক জোট গড়ছে সৌদি: ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার মুখে লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল নিরাপদ রাখতে একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব। সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে বুধবার (২৯ জুলাই) এ তথ্য জানিয়েছে সামা টিভি। সূত্রগুলোর দাবি, সম্ভাব্য এই জোটে কোন কোন দেশ অংশ নেবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে বিশ্বের কয়েক ডজন দেশের সঙ্গে আলোচনা করছে রিয়াদ। তবে সৌদি সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশন এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
গত ২০ জুলাই ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী ঘোষণা দেয়, ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরব অবরোধ আরোপ করেছে। এর জবাবে লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ কার্যকর করার হুমকি দেয় তারা। তবে হুথিদের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে রিয়াদ। এরপর থেকে হুথিরা দাবি করে আসছে, লোহিত সাগরে তারা সৌদি জাহাজ লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে সৌদি আরব ইয়েমেনের হোদেইদা বন্দরে হুথিদের সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। রিয়াদের দাবি, এসব স্থাপনা ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে হুমকি সৃষ্টি করা হচ্ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগরে নৌ অবরোধ ও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ইরানকে ঘিরে চলমান আঞ্চলিক সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরেও জ্বালানি ও পণ্যবাহী জাহাজ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের আলোচনা চলমান-পাকিস্তান: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া ও সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা এখনও বন্ধ হয়নি এবং তা অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেছে পাকিস্তান। দেশটি উভয় পক্ষকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে জোরালো উদ্যোগ নিচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দোরাবি এই তথ্য জানান। তিনি বলেন যে গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বা ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এর অধীনে দুই পক্ষকে আলোচনায় ফেরাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইসলামাবাদ।
পররাষ্ট্র মুখপাত্র তাহির আন্দোরাবি জোর দিয়ে বলেন যে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়নি বরং তা চলমান রয়েছে। পাকিস্তান সরকারের এই মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য হলো সংঘাত থামিয়ে চুক্তি অনুযায়ী কূটনৈতিক পথে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা।
ট্রাম্পের সঙ্গে সৌদি প্রিন্সের জরুরি বৈঠক: ইরাকে দুই দেশের যৌথ হামলার পর জরুরি আলোচনার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। মিডিলিস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনযায়ী, মার্কিন একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে গত বুধবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানায়, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফরসূচিতে এই বৈঠকটি যুক্ত করা হয়। ওই বৈঠকে তিনি ভ্যান্সকে জানান, সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর পক্ষে। যদিও চলতি সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব যৌথভাবে ইরানপন্থী ইরাকি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে।
সূত্রটি জানায়, এই বৈঠকগুলোর উদ্দেশ্য ছিল যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পক্ষ থেকে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এবং অঞ্চলের পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি বার্তা পৌঁছে দেয়া।
সৌদি আরব এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মিত্র। গত পাঁচ মাসে বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলেও, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে রিয়াদ একাধিকবার ট্রাম্পের ইরান-নীতি প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে।
যুবরাজ মোহাম্মদের ভাই এবং ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন প্রিন্স খালিদের গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন সফরে যাওয়ার কথা ছিল। তবে ইরাকে হামলার কারণে তিনি সেই সফর পিছিয়ে দেন।
গত মঙ্গলবার সৌদি সামরিক বাহিনী এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড যৌথভাবে ইরাকে ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে হামলা চালায়।
সেন্টকম জানায়, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নির্দেশনায় পরিচালিত এবং মিলিশিয়াদের মাধ্যমে সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ৩০টিরও বেশি ড্রোন হামলার জবাব হিসেবে এই হামলা চালানো হয়। পরে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও নিশ্চিত করে যে তারা এই হামলায় অংশ নিয়েছিল এবং জানায়, এটি সেন্টকমের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হয়েছে।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

