জাপানি ইয়েন রক্ষায় মার্কিন পদক্ষেপ
নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ২০:১৭
টানা দরপতনের মুখে থাকা জাপানি মুদ্রা 'ইয়েন'-এর অবমূল্যায়ন রুখতে একযোগে মুদ্রাবাজারে বড় ধরনের হস্তক্ষেপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ। গত প্রায় তিন দশকের মধ্যে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ সরাসরি জাপানি ইয়েন কিনে মুদ্রাটির মান বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিরল পদক্ষেপকে
জাপানের প্রতি “বন্ধুত্বের নিদর্শন” এবং “বিশ্ব অর্থনীতির
জন্য কল্যাণকর” হিসেবে আখ্যা দিলেও, বিশ্লেষকরা
বলছেন এর পেছনে ওয়াশিংটনের নিজস্ব গভীর আর্থিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ কাজ করছে।
২০২২ সাল থেকে জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়
শত শত কোটি ডলার খরচ করেও ইয়েনের পতন ঠেকাতে পারছিল না, যা অতি সম্প্রতি প্রতি ডলারে
১৬৩.৯৯ ইয়েনে নেমে ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। এই নজিরবিহীন পতনের পেছনে
কয়েকটি মৌলিক কারণ সক্রিয় ছিল: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ
বিঘ্নিত হওয়ায় আমদানিনির্ভর জাপানের জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের খরচ হু-হু করে বাড়ে। ব্যাংক
অব জাপান দীর্ঘকাল সুদের হার প্রায় শূন্যের কোঠায় ধরে রাখায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা
ইয়েন বিক্রি করে উচ্চ সুদের মার্কিন ডলারে বিনিয়োগ শুরু করে (যা ‘ক্যারি ট্রেড’ নামে পরিচিত)। জাপানের মোট সরকারি ঋণের
পরিমাণ দেশের মোট জিডিপির ২০০ শতাংশেরও বেশি, যা জি২০ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
অর্থনীতি চাঙ্গা করতে সরকারি বিপুল ব্যয় মুদ্রাবাজারে ইয়েনের ওপর চরম মনস্তাত্ত্বিক
চাপ সৃষ্টি করে।
গত শুক্রবার ট্রাম্প প্রশাসনের এক ক্যাবিনেট
বৈঠকে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের একটি প্যাডে হস্তলিখিত নোট ছবি তোলার সময়
সামনে আসে, যেখানে স্পষ্ট লেখা ছিল: “To Do: Buy
Japanese Yen (JPY) $5-10 bil”। এরপরই রোববার ট্রাম্প নিশ্চিত করেন
যে মার্কিন ট্রেজারি বিলিয়ন ডলারের ইয়েন কিনেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জাপানকে সাহায্য করার
চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ঋণবাজার রক্ষা করাই ছিল ওয়াশিংটনের মূল উদ্দেশ্য। এতদিন
নিজেদের মুদ্রার মান বাড়াতে জাপান তাদের বৈদেশিক রিজার্ভে থাকা মার্কিন সরকারি বন্ড
(ট্রেজারি সিকিউরিটিজ) দেদার বিক্রি করছিল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় মার্কিন বন্ড ধারণকারী
দেশ জাপান যদি বিপুল পরিমাণে বন্ড বাজারে ছেড়ে দেয়, তবে বন্ডের দাম কমে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের
ওপর সুদের হার অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। বন্ডের ইল্ড বাড়লে মার্কিন সরকারের নিজস্ব অর্থ
ধার করার খরচ বেড়ে যায়, যা ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বাজেট ব্যবস্থাপনাকে সংকটে
ফেলে দেয়।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ ফেলো
রেবেকা প্যাটারসনের মতে, ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে—জাপান
যাতে নিজস্ব রিজার্ভ থেকে বন্ড বিক্রি না করে দ্রুত ইয়েনকে স্থিতিশীল করতে পারে, সে
ব্যবস্থা করাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থে সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত।
জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে
তাকাইচি বর্তমানে তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ পার করছেন। জীবনযাত্রার ব্যয়
বৃদ্ধির ক্ষোভ সামলাতে তিনি খাদ্যপণ্যের ওপর অস্থায়ীভাবে বিক্রয় কর স্থগিত করেছেন এবং
বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। তবে বিশাল ঋণের মধ্যে এই অতি-ব্যয় নীতি ব্রিটেনে
সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের মেয়াদের মতো এক ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি করতে
পারে বলে বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করেন, যা ইয়েনের দরপতনকে আরও দ্রুত করেছিল। মার্কিন
যৌথ হস্তক্ষেপ তাকাইচিকে রাজনৈতিকভাবে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিল। অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের
পাশাপাশি কৌশলগত মিত্রতাও এই পদক্ষেপের অন্যতম চালিকাশক্তি।
ঠিক যেমন গত বছর আর্জেন্টিনার ডানপন্থী
প্রেসিডেন্ট ও ট্রাম্পের আদর্শিক মিত্র হাভিয়ের মিলেইয়ের অর্থনীতিকে বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্র
বিলিয়ন ডলার পেসো কিনেছিল, ঠিক একইভাবে সানায়ে তাকাইচিকেও মার্কিন প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ
মিত্র হিসেবে দেখছে। তাকাইচির নেতৃত্বে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্ববৃহৎ সামরিক
সংস্কারের পরিকল্পনা নিয়েছে, যেখানে প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করার
কথা বলা হয়েছে। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই মিত্রদেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষায় অতিরিক্ত
ব্যয়ের তাগিদ দিয়ে আসছিল, যা তাকাইচি বাস্তবায়ন করছেন।
যৌথ হস্তক্ষেপের খবরের পরপরই আন্তর্জাতিক
মুদ্রাবাজারে ইয়েনের দর দ্রুত চাঙ্গা হয়ে ওঠে। চার দশকের সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে ঘুরে
দাঁড়িয়ে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের বিনিময় হার বর্তমানে ১৫৫ থেকে ১৫৭ ইয়েনের মধ্যে উঠে
এসেছে, যা গত তিন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং জাপানের
অর্থ মন্ত্রণালয় এক যৌথ বার্তায় নিশ্চিত করেছে, বাজারের অস্থিরতা কমাতে প্রয়োজনে তারা
আরও যৌথ বাজার হস্তক্ষেপ চালাতে দ্বিধা করবে না।
বাংলাদেশের খবর/ এম.আর

