সাংবাদিক ডাফনে হত্যা
মায়ের রক্তাক্ত স্মৃতি বুকে নিয়ে লড়ছি: ম্যাথিউ কারুয়ানা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ২০:৪৮
মাল্টার ইতিহাসে সর্বাধিক আলোচিত অনুসন্ধানী সাংবাদিক ডাফনে কারুয়ানা গ্যালিজিয়া হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় আদালতে এক চাঞ্চল্যকর ও আবেগঘন জবানবন্দি দিয়েছেন তাঁর ছেলে ম্যাথিউ কারুয়ানা গ্যালিজিয়া।
তিনি আদালতকে জানিয়েছেন, ২০১৭ সালের অক্টোবরে
গাড়িতে বোমা হামলায় নিহত হওয়ার সময় তার মা দেশের তৎকালীন শীর্ষ রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী
ইয়োর্গেন ফেনেকের সরাসরি দুর্নীতিতে জড়িত থাকার তথ্য তদন্ত করছিলেন। মাল্টার অন্যতম
ধনী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ইয়োর্গেন ফেনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ডাফনেকে হত্যার
জন্য মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চুক্তিভিত্তিক হত্যাকারী নিয়োগ করেছিলেন এবং অর্থায়ন
করেছিলেন।
প্যানামা পেপারস অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায়
পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী আন্তর্জাতিক দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন ডাফনে-পুত্র সফটওয়্যার
প্রকৌশলী ম্যাথিউ। আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তিনি বর্ণনা করেন, কীভাবে তিনি তাঁর মায়ের
অনুসন্ধানী কাজে তথ্য-প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেওয়া শুরু করেছিলেন।
ম্যাথিউ জানান, ২০১৫ সালের প্যানামা পেপারসের
গোপন নথি ডাটাবেজে রূপান্তর করার সময় তিনি মাল্টা সম্পর্কিত অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর কিছু
নথি দেখতে পান। এতে দেখা যায়, ২০১৩ সালে মাল্টায় লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পরপরই
তৎকালীন জ্বালানি মন্ত্রী কনরাড মিজি এবং প্রধানমন্ত্রীর চিফ অব স্টাফ কিথ সেমব্রি
বিদেশে গোপনে অফশোর কোম্পানি খুলছিলেন। রবর্তীতে ২০১৭ সালে ডাফনে তার অনুসন্ধানের স্বার্থে
মাল্টার অন্যতম প্রধান বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প ‘ইলেকট্রোগ্যাস’-এর হাজার হাজার অভ্যন্তরীণ ই-মেইল নথি
আকারে হাতে পান। ইলেকট্রোগ্যাসের অন্যতম মালিক ছিলেন অভিযুক্ত ব্যবসায়ী ইয়োর্গেন
ফেনেক। যখন গোপন নথিগুলো আমি অনুসন্ধানযোগ্য সিস্টেমে সাজাচ্ছিলাম, তখন দেখতে পাই যে
প্রতিটি অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের কেন্দ্রে ছিলেন ইয়োর্গেন ফেনেক। সেই তথ্যগুলো দেখে
আমার মনে হয়েছিল—যেন কোনো এক নরকের
দুয়ার আমাদের সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেছে।
ম্যাথিউ আদালতকে জানান, তার মা ডাফনে চেয়েছিলেন
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে জোট বেঁধে এই ইলেকট্রোগ্যাস কেলেঙ্কারি
উন্মোচন করতে (যেভাবে প্যানামা পেপারস উন্মোচিত হয়েছিল)। ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সঙ্গে এ নিয়ে প্রাথমিক
যোগাযোগও হয়েছিল, কিন্তু কাজ শুরু করার আগেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে।
নিহত হওয়ার দিনের মর্মান্তিক বর্ণনা দিয়ে
ম্যাথিউ বলেন, বাড়িতে কাজ করার সময় হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনি। ধোঁয়ার কুণ্ডলী
দেখে আমি রাস্তার দিকে দৌড়াতে থাকি। রাস্তা জুড়ে আগুন, গাড়ির ভগ্নাংশ আর মাংসপিণ্ড
ছড়িয়ে ছিল। একটি জ্বলন্ত গাড়ির হর্ন একটানা বেজেই যাচ্ছিল। আগুনের মধ্যে একটা ছায়ামূর্তি
দেখে আমি বুঝতে পারি—ওটা আমার মা।
২০১৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জোসেফ মুসকাটের সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর মাল্টার বিদ্যুৎ খাতের বেসরকারীকরণ শুরু করে, যার বিশাল চুক্তি পায় ‘ইলেকট্রোগ্যাস’। সাংবাদিক ডাফনে কারুয়ানা গ্যালিজিয়া তার ব্লগে অভিযোগ করেছিলেন যে, এই চুক্তি বাস্তবায়নের পেছনে বিপুল অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয়েছে। ২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবর ডাফনেকে তার নিজ বাড়ির কাছেই গাড়িতে পাতা শক্তিশালী বোমায় হত্যা করা হয়।
ডাফনে হত্যাকাণ্ডের পর তার কাজ চালিয়ে নিতে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের সমন্বয়ে
‘দ্য ডাফনে প্রজেক্ট’
গঠিত হয়। সেখানে উদঘাটিত হয় যে, অভিযুক্ত ফেনেকের দুবাই-ভিত্তিক রহস্যময় প্রতিষ্ঠান
‘১৭ ব্ল্যাক’ থেকে
তৎকালীন সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের অফশোর অ্যাকাউন্টে অর্থ লেনদেনের পরিকল্পনা ছিল।
ডাফনে হত্যার তদন্তকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক অসন্তোষ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৯ সালে বিলাসবহুল ইয়াট নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রেপ্তার হন ইয়োর্গেন ফেনেক। এই ঘটনার পর পর্যায়ক্রমে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন মন্ত্রী কনরাড মিজি, চিফ অব স্টাফ কিথ সেমব্রি এবং পরবর্তীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জোসেফ মুসকাট নিজেও। যদিও ইয়োর্গেন ফেনেকসহ সাবেক ওই রাজনৈতিক নেতারা দুর্নীতি ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছেন।
মায়ের হত্যার বিচারের জন্য নিজের
ক্যারিয়ার ও জীবন বিসর্জন দেওয়া ম্যাথিউ আদালতের সামনে দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “যারা আমার মাকে হত্যা করেছেন, তাদের জবাবদিহিতার
আওতায় আনাকেই আমি আমার জীবনের একমাত্র মিশনে পরিণত করেছি।”
বর্তমানে আদালত প্রাঙ্গণে মামলাটির শুনানি
কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশের খবর/ এম.আর

