লেবাননে সাংবাদিক হত্যাকে 'যুদ্ধাপরাধ' বলল মানবাধিকার সংস্থাগুলো
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৪৮
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অভিজ্ঞ নারী সাংবাদিক আমাল খলিল নিহত এবং তার সহকর্মী জয়নব ফারাজ মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার ঘটনাকে সরাসরি "যুদ্ধাপরাধ" বলে আখ্যায়িত করেছে বিশ্বের তিন শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থা।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ), অ্যামনেস্টি
ইন্টারন্যাশনাল এবং লেবাননভিত্তিক আইনি সংস্থা 'লিগ্যাল এজেন্ডা' যৌথ তদন্তের পর জানায়,
দুই সাংবাদিককে বেসামরিক নাগরিক হিসেবে নিশ্চিত চেনার পরও ইসরায়েলি বাহিনী তাদের ওপর
লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে সরাসরি হামলা চালায়। একই সাথে দীর্ঘ সময় ধরে উদ্ধারকারী অ্যাম্বুলেন্সকে
দুর্ঘটনাস্থলে যেতে বাধা দিয়ে সাংবাদিক আমাল খলিলকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয় বলে
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছিল গত ২২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে,
দক্ষিণ লেবাননের আল-তিরি গ্রামে। ৪২ বছর বয়সী আমাল খলিল লেবাননের খ্যাতনামা সংবাদপত্র
'আল-আখবার'-এর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ছিলেন এবং ২১ বছর বয়সী জয়নব ফারাজ ছিলেন একজন ফ্রিল্যান্স
ফটোজার্নালিস্ট। ইসরায়েলি বাহিনী সীমান্ত এলাকা থেকে সরে গেছে কিনা তা নিশ্চিত হতে
তারা স্থানীয় দুই কর্মকর্তাকে অনুসরণ করে একটি গাড়িতে সেখানে গিয়েছিলেন। তবে বিকেল
২:২৫ মিনিটে তাদের সামনের গাড়িতে হামলা চালিয়ে দুই জ্যেষ্ঠ লেবানিজ নাগরিককে হত্যা
করা হয়। আমাল খলিল তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধারকারী সিভিল ডিফেন্সকে ফোন করে সাহায্য চান।
কিন্তু ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অনুমোদন বা 'সেফ প্যাসেজ' না পাওয়ায় অ্যাম্বুলেন্সগুলো
গ্রামে প্রবেশ করতে পারেনি।
সাংবাদিকরা একপর্যায়ে গাড়ি থেকে নেমে
পার্শ্ববর্তী একটি ভবনে আশ্রয় নেন। জয়নব ফারাজ জানান, সেই সময় ইসরায়েলি নজরদারি
ড্রোন বা কোয়াডকপ্টার একেবারে তাদের মাথার কাছাকাছি এসে উড়ছিল। বিকেল ৩:৪০ মিনিটে
ইসরায়েল প্রথমে তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমাবর্ষণ করে, যাতে দুজনেই গুরুতর আহত হন।
রক্তাত অবস্থায় তারা হামাগুড়ি দিয়ে পাশের একটি ভবনে আশ্রয় নিলে বিকেল ৪:২৫ মিনিটে
ইসরায়েল দ্বিতীয়বার হামলা চালিয়ে পুরো ভবনটি গুঁড়িয়ে দেয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে
চাপা পড়েন দুই সাংবাদিক।
এর প্রায় আধা ঘণ্টা পর রেড ক্রস উদ্ধার
কাজ শুরু করলে, সেখানেও কোয়াডকপ্টার দিয়ে গ্রেনেড ফেলা হয় এবং অ্যাম্বুলেন্স লক্ষ্য
করে গুলি চালানো হয়, ফলে উদ্ধারকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে রাত ৮:১৫ মিনিটে
অনুমতি মেলার পর রাত ১১টায় আমাল খলিলের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। হাসপাতালের মেডিকেল
রিপোর্টে উঠে আসে যে, আমাল খলিল তাৎক্ষণিকভাবে মারা যাননি, বরং বিকেল ৪:২৫ মিনিটে ভবন
ধসে পড়ার পর প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত অবস্থায় সহায়তার জন্য
অপেক্ষা করেছিলেন। সময়মতো চিকিৎসাসেবা না মেলায় রাত ৭টার দিকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
ও শ্বাসরোধে তার মৃত্যু হয়।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যালয়ের
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে অন্তত ১৫
জন এবং গাজায় ২১০ জনেরও বেশি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে
ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি অবিলম্বে বন্ধ করা এবং এই যুদ্ধাপরাধে জড়িত কর্মকর্তাদের
ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যপ্রাচ্য
ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক পরিচালক হেবা মোরায়েফ বলেন, একের পর এক সাংবাদিক ও বেসামরিক
নাগরিক হত্যার ক্ষেত্রে ইসরায়েলি বাহিনীর বিচারে কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় তারা এভাবে
বেআইনি বিমান হামলা চালিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে।
বাংলাদেশের খবর/ এম.আর

