Logo

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত

‎সমুদ্রপথে পাল্টাপাল্টি হামলা, সমঝোতা অনিশ্চিত ‎

Icon

হাসান রাজীব

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫০

‎সমুদ্রপথে পাল্টাপাল্টি হামলা, সমঝোতা অনিশ্চিত  ‎

‎# আলোচনায় ফেরাতে পাকিস্তানের প্রচেষ্টা অব্যাহত

‎# বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে হামলায় নিহত ৬

‎# যুক্তরাষ্ট্র শর্ত না মানা পর্যন্ত হরমুজ স্বাভাবিক হবে না: ইরান

‎# আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি

‎ইরান যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখ ও লোহিত সাগরে জাহাজে পৃথক হামলার ঘটনা ঘটেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই দুই নৌপথ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হওয়ায় এ হামলায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে নতুন করে ‘আলোচনার টেবিলে’ ফিরিয়ে আনতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বজায় রাখতে পাকিস্তান সর্বাত্মক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

‎গতকাল বুধবার ইসলামাবাদে সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি।

‎গত মঙ্গলবার লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে একটি ছোট কার্গো জাহাজে সন্দেহভাজন হুথি হামলায় চারজন ক্রু সদস্য নিহত হয়েছেন। হামলার পর উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেওয়া হুথিবিরোধী সামরিক গোষ্ঠীর আরও দুই সদস্য নিহত হয়েছেন।

‎ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় ও কোস্টগার্ডের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানিয়েছে, মিসরের মালিকানাধীন ‘তিহামাহ’ নামের জাহাজটিতে নিহত চারজনের মৃত্যু নিশ্চিত হলে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জাহাজে হুথিদের হামলায় এটিই হবে প্রথম প্রাণহানির ঘটনা।

‎হুথিদের পরিচালিত সংবাদ সংস্থা সাবা জানিয়েছে, সৌদি আরবের সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী একটি জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তবে জাহাজটির নাম প্রকাশ করা হয়নি এবং এ বিষয়ে সৌদি আরব তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

‎অন্যদিকে, ওমান উপসাগরে পানামার পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ লঙ্ঘন করে জাহাজটি চলাচল করছিল এবং বারবার সতর্ক করার পরও থামেনি। পরে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি এমএইচ-৬০ হেলিকপ্টার থেকে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে জাহাজটির স্টিয়ারিং ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া হয়।
‎সামুদ্রিক সূত্র জানিয়েছে, পাকিস্তানের উপকূলের কাছে ওমান উপসাগরের দিকে যাওয়ার সময় জাহাজটিতে হামলা হয়।

‎তাহির আন্দ্রাবি জানান, গত সোমবার (১০ আগস্ট) পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরান, সৌদি আরব এবং কুয়েতের কর্মকর্তাদের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করেছেন। এসব আলোচনায় মধ্যপ্রাচে ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা’ নিয়ে নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় করেন তারা।

‎মুখপাত্র আরও বলেন, বর্তমানে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভিও তেহরান সফরে রয়েছেন। তার এই সফরটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

‎যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি পুনর্বহাল এবং হরমুজ প্রণালি সংক্রান্ত বিরোধ সমাধানের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বাস্তবায়নের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এসব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

‎ব্রিফিংয়ে সম্প্রতি সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের স্বাক্ষরিত ‘মক্কা চুক্তি’ বিষয়ে কথা বলে তাহির আন্দ্রাবি। এই চুক্তিকে সৌদি আরব ও তুস্ককের সাথে পাকিস্তানের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়াসেরই একটি অংশ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘এই চুক্তিটি সম্পূর্ণরূপে আত্মরক্ষামূলক প্রকৃতির এবং এটি তিনটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য হুমকি ও নিরাপত্তা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার সুযোগ করে দেবে।’

‎এদিকে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরান কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্ত মেনে না নেওয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে না। ইরানের শর্তের মধ্যে দেশটির জব্দ করা সম্পদ ছাড় এবং লেবানন ও গাজাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতের অবসান রয়েছে।

‎এর আগে সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের কাছে কয়েক দশকের যুদ্ধ, হামলা ও বিক্ষোভে নিহতদের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি কখনো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনার কথা বলছেন, আবার কখনো ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের হুমকি দিচ্ছেন।

‎গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
‎তিনি বলেন, ইরান কোনো পদক্ষেপ নিলে তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

‎ইরানের কর্মকর্তারাও পাল্টা কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন। দেশটির বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডারের উপদেষ্টা মোহাম্মদ রেজা নাকদি জানিয়েছেন, শত্রুর ভূখণ্ডে অভিযান চালানোর সক্ষমতা অর্জনে কাজ করছে বাহিনীটি। প্রয়োজন ও নির্দেশ দেওয়া হলে অভিযান শত্রুর ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়াই তাদের লক্ষ্য বলে তিনি মন্তব্য করেন।

‎গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। পাল্টা হামলায় ইরান ওমান, জর্ডান, কুয়েত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্থাপনা ও অবকাঠামোতে আঘাত হেনেছে।

‎যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। ফলে এই নৌপথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের অবসান নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় গত মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়েছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৮ দশমিক ৯১ ডলারে এবং মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ৮৩ দশমিক ২০ ডলারে উঠেছে।


‎বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন