সৌদি-হুতি পাল্টাপাল্টি হামলায় নিহত ৫
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:২৫
# সৌদির অনুরোধে ইরানকে চীনের চাপ
# ইয়েমেনে আরও ৩৭ হামলা চালিয়েছে সৌদি
# মক্কায় হামলার দাবি প্রত্যাখ্যান হুতিদের
# আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
# সৌদির জন্য ‘যেকোনো পর্যায়ে’ যাবে পাকিস্তান
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের পাল্টাপাল্টি হামলা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এসব হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে তিনজনই শিশু। সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইফ এলাকায় হুতিদের একটি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। এতে সৌদি আরবে বসবাসকারী ইয়েমেনি এক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে দুজন।
হুতিরা হামলা জোরদার করার পর চলতি মাসে সৌদি আরবে এই প্রথম কোনো প্রাণহানির ঘটনা প্রকাশ করা হলো। ইয়েমেনে হুতিরা শুক্রবার দাবি করেছে, সৌদি আরবের যুদ্ধবিমান তাইজ প্রদেশে তিনটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলা চালিয়েছে।
এদিকে, ইয়েমেনের তায়েজ ও হাজ্জাহ প্রদেশের বেসামরিক এলাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৭টি বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি আরবের এফ-১৫ যুদ্ধবিমান। খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটি থেকে উড়ে আসা যুদ্ধবিমানগুলোর এই হামলায় বেশ কয়েকজন বেসামরিক লোক হতাহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি।
শুক্রবার তাসনিম নিউজের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়। হামলার প্রতিক্রিয়ায় আনসারুল্লাহ নেতা সাইয়্যেদ আবদুল মালিক আল-হুথি জানান, মার্কিন তত্ত্বাবধান এবং ইসরায়েলি উসকানিতে সৌদি আরব ইয়েমেনের বিরুদ্ধে তাদের আগ্রাসন ও অবরোধ অব্যাহত রেখেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘ ১২ বছরের এই যুদ্ধে সৌদি আরব কখনোই বেসামরিক জীবনের তোয়াক্কা করেনি এবং বাজার, ঘরবাড়ি, হাসপাতাল ও স্কুলে হামলা চালিয়ে হাজার হাজার নারী ও শিশুকে হত্যা করেছে।
হুথি নেতা দাবি করেন, ইয়েমেন কখনো আগে যুদ্ধ শুরু করেনি এবং তারা কেবল আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে রয়েছে। সানা বিমানবন্দরে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক অহেতুক বিমান হামলার মাধ্যমেই এই নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। সৌদি নেতৃত্ব ইয়েমেনি জনগণকে দুর্বল ও দমন করে নিজেদের ক্ষমতা বজায় রাখতে চায় বলে তিনি অভিযোগ তোলেন।
হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আল-মাসিরাহ টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, তাইজে একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ইয়েমেনের আবস শহরে হামলায় একজন আহত হয়েছেন। পরে হুতিদের সমর্থক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সৌদি-সমর্থিত ‘ভাড়াটে যোদ্ধাদের’ হামলায় তিন শিশু নিহত এবং বেশ কয়েকজন ইয়েমেনি নাগরিক আহত হয়েছেন। ‘ভাড়াটে যোদ্ধা’ বলতে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারপন্থী বাহিনীকে বোঝানো হয়েছে।
এদিকে, সৌদি আরবের অনুরোধের পর ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানকে ব্যক্তিগতভাবে আহ্বান জানিয়েছে চীন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিন ইরানি সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে। সূত্রগুলো জানায়, গত এক সপ্তাহে হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার পর রিয়াদ চীনের সহায়তা চায়। হুথিদের এই তৎপরতায় সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
প্রকাশ্যে চীন সংঘাতের বিষয়ে সংযম, সংলাপ এবং নিরাপদ নৌ চলাচল পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছে। তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে দেওয়া বার্তায় চীন আরও সরাসরি অবস্থান নিয়েছে বলে ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে।
চীন চায়, হুথিদের ওপর ইরানের যে প্রভাব রয়েছে, তা ব্যবহার করে সংঘাত যেন আরও বিস্তৃত না হয়। বিশেষ করে চীনের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন ও বাণিজ্যিক নৌপথে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে বেইজিং এ উদ্যোগ নিয়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, চীনের এই বার্তা কীভাবে ইরানের কাছে পৌঁছানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির চীন সফরের সময় বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছিল কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।
ইরানের পক্ষ থেকে চীনকে জানানো হয়েছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। ইরানি সূত্রগুলোর দাবি, হুথিদের ওপর প্রভাব খাটাতে ব্যর্থ হলে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কোনো হুমকি চীন দেয়নি।
রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইয়েমেন ও লোহিত সাগরে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়ুক—এটি তারা চায় না। তাদের মতে, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়ানো কোনো পক্ষের স্বার্থেই নয়।
চীন আরও বলেছে, সব দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে এবং মানুষের জীবনযাত্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা করা উচিত নয়। পরিস্থিতি আরও জটিল করে এমন কর্মকাণ্ড বন্ধ করে সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং।
এ বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সৌদি সরকারের গণমাধ্যম দপ্তর রয়টার্সের প্রশ্নের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি।
মক্কায় হামলার দাবি প্রত্যাখ্যান হুতিদের: সৌদি আরবের দাবি, হুতিরা মক্কার দিকে একটি ড্রোন পাঠিয়েছিল। সেটি প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের উত্তেজনা আরও বেড়েছে। তবে হুতিদের নেতা আবদুল-মালিক আল-হুতি এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। গতকাল টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘এটি একটি জঘন্য মিথ্যাচার।’ হুতিরা ইসলামের পবিত্রতম শহর মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে—সৌদি আরবের এমন দাবিকে তিনি ‘বড় ধরনের প্রচারণা’ বলে উল্লেখ করেছেন।
আল-হুতি বলেন, মক্কার পবিত্রতা ইয়েমেনের মানুষের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণে সৌদি আরব ‘মিথ্যাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে’ বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক ইউসুফ মাওরি বলেন, আল-হুতির ভাষণ শুধু ইয়েমেনের জনগণের উদ্দেশে দেওয়া হয়নি। বিশ্ববাসীর কাছেও তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করতে চেয়েছেন যে সৌদি আরবের দাবি অনুযায়ী হুতিরা পবিত্র শহর মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু করেনি।
আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা: চীন এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। একই সঙ্গে ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতাও চীন। পণ্যবাজারবিষয়ক তথ্য ও বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন। এর পরিমাণ ছিল গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল।
অঞ্চলটির এক জ্যেষ্ঠ পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করার মতো সক্ষমতা এখনো যেসব দেশের রয়েছে, চীন তাদের অন্যতম।
১৯৯০-এর দশকে ইয়েমেনে সৌদি আরবের সুন্নি ধর্মীয় প্রভাবের বিরোধিতা করে হুথি আন্দোলনের উত্থান ঘটে। ইরানি ও পশ্চিমা সূত্রগুলোর দাবি, গোষ্ঠীটি ইরানের কাছ থেকে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও অর্থসহায়তা পেয়ে থাকে। হুথিরা ইরানের পশ্চিমবিরোধী ও ইসরায়েলবিরোধী ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এরও অংশ।
সৌদির জন্য ‘যেকোনো পর্যায়ে’ যাবে পাকিস্তান: ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান হামলার মধ্যে সৌদি আরবকে রক্ষায় ‘যেকোনো পর্যায়ে’ যেতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেছেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি পাকিস্তানের অঙ্গীকার ‘নিঃশর্ত’।
গতকাল বৃহস্পতিবার আরব নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনসের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক আহমেদ শরিফ চৌধুরী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান কূটনৈতিক ও শারীরিক দুইভাবেই সৌদি আরবের পাশে রয়েছে। এখানে আমি শারীরিকভাবে শব্দটির ওপর জোর দিতে চাই। আমরা যেকোনো পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত।’
আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেন, সৌদি আরবের পাশাপাশি মক্কা ও মদিনায় ইসলামের দুই পবিত্র স্থান রক্ষার ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের অঙ্গীকার রয়েছে। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশটি প্রতিরোধ অব্যাহত রাখবে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

