Logo

আইন ও বিচার

ডিজিটালে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি নিরাপত্তায় উপর সরাসরি আঘাত

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬, ২২:৫৯

ডিজিটালে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি নিরাপত্তায় উপর সরাসরি আঘাত

ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত তথ্যই আজ সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ কিংবা কম্পিউটারে জমা থাকে মানুষের ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও, পারিবারিক মুহূর্ত, ব্যাংক তথ্য, পাসওয়ার্ড- যা একদিকে ব্যক্তিগত জীবনের স্মৃতি, অন্যদিকে নিরাপত্তার চাবিকাঠি। কিন্তু প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি বেড়েছে এর অপব্যবহার। অন্যের কম্পিউটার বা মোবাইল থেকে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি কিংবা ভিডিও চুরি এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয়; এটি একটি বাস্তব, ভয়াবহ ও দ্রুত বিস্তারমান অপরাধ। বাংলাদেশের আইনব্যবস্থায় এই অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে এর প্রতিকার ও প্রয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে।

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা মানবাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংবিধান ব্যক্তি জীবনের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেছে। প্রযুক্তি যখন জীবনের প্রতিটি স্তরে ঢুকে পড়েছে, তখন গোপনীয়তার ধারণাও ডিজিটাল পরিসরে বিস্তৃত হয়েছে। কারও অনুমতি ছাড়া তার মোবাইল বা কম্পিউটারে প্রবেশ, তথ্য কপি করা বা সংরক্ষণ করা সরাসরি ব্যক্তিগত অধিকারে হস্তক্ষেপ।

ডিজিটাল তথ্য চুরি নানা উপায়ে ঘটে। কখনো পরিচিতজন সুযোগ নিয়ে মোবাইল থেকে ছবি কপি করে, কখনো হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে দূর থেকে ডিভাইসে ঢুকে পড়ে অপরাধী। আবার ফিশিং লিংক, ভুয়া অ্যাপ, পাবলিক ওয়াই-ফাই কিংবা ম্যালওয়্যারের মাধ্যমেও ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে চুরি করা ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করা হয় ব্ল্যাকমেইল, মানহানি কিংবা আর্থিক প্রতারণার জন্য।

বাংলাদেশে ডিজিটাল তথ্য চুরির বিরুদ্ধে প্রধান আইন হলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮। এই আইনে কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, নেটওয়ার্ক বা ডিজিটাল তথ্যের অননুমোদিত প্রবেশ, তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ বা ব্যবহারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এছাড়া দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এ প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও মানহানির ধারাগুলো প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, বিশেষ করে যখন চুরি করা তথ্য ব্যবহার করে ক্ষতি সাধন করা হয়।

অননুমোদিত প্রবেশ ও তথ্য সংগ্রহের শাস্তি

কোনো ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তার কম্পিউটার বা মোবাইলে প্রবেশ করা এবং সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এ ধরনের অপরাধের জন্য কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। অপরাধের গুরুত্ব, ক্ষতির পরিমাণ ও পুনরাবৃত্তির ওপর শাস্তির মাত্রা নির্ভর করে।

ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও চুরির ঘটনা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এসব উপাদান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হলে ভুক্তভোগীর সামাজিক সম্মান, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক আঘাত আসে। আইন এখানে আরও কঠোর। কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া ধারণ, সংরক্ষণ, বিকৃতি বা প্রচার করলে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশু ভুক্তভোগী হলে আইন আরও সংবেদনশীলভাবে প্রয়োগ করার কথা বলা হয়েছে।

তথ্য বা ছবি চুরির পর অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা ভুক্তভোগীকে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে। এটি শুধু ডিজিটাল অপরাধ নয়; এটি চাঁদাবাজি ও মানসিক নির্যাতনেরও শামিল। দণ্ডবিধির আওতায় এ ধরনের অপরাধের জন্য আলাদা শাস্তির বিধান থাকায় অভিযুক্ত ব্যক্তি একাধিক ধারায় দণ্ডিত হতে পারে।

ডিজিটাল অপরাধের বড় সমস্যা হলো প্রমাণ সংগ্রহ। তথ্য চুরি অনেক সময় নিঃশব্দে ঘটে, অপরাধী রেখে যায় না দৃশ্যমান চিহ্ন। ভুক্তভোগী দেরিতে বিষয়টি জানতে পারেন, তখন প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়। যদিও ডিজিটাল ফরেনসিক প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, তবুও প্রশিক্ষিত জনবল ও অবকাঠামোর ঘাটতি তদন্তকে জটিল করে তোলে।

আইন থাকা সত্ত্বেও অনেক ভুক্তভোগী মামলা করতে ভয় পান। সামাজিক লজ্জা, থানায় হয়রানির আশঙ্কা, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া- সব মিলিয়ে ন্যায়বিচারের পথ সহজ নয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে আইনের অপব্যবহার নিয়ে বিতর্ক থাকায় প্রকৃত ভুক্তভোগীর অভিযোগও সন্দেহের চোখে দেখা হয়। এই দ্বন্দ্ব আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি চুরির শিকার হলে প্রথম করণীয় হলো দ্রুত প্রমাণ সংরক্ষণ- স্ক্রিনশট, কল লগ, মেসেজ, ই-মেইল ইত্যাদি। এরপর নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি বা মামলা দায়ের করা জরুরি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উল্লেখ করলে তদন্ত কার্যক্রম সহজ হয়।

আইনি শাস্তির পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জরুরি। শক্তিশালী পাসওয়ার্ড, দুই ধাপের নিরাপত্তা, অজানা লিংক এড়িয়ে চলা, সন্দেহজনক অ্যাপ ইনস্টল না করা, এসব অভ্যাস তথ্য সুরক্ষার প্রথম ধাপ। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো সময়ের দাবি।

ডিজিটাল অপরাধের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। তাই আইনকেও সময়োপযোগী হতে হবে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগে মানবিকতা জরুরি, যেন ভুক্তভোগী আরও ভীত না হন। দ্রুত তদন্ত, ভুক্তভোগীবান্ধব পরিবেশ ও প্রযুক্তিনির্ভর বিচারপ্রক্রিয়া গড়ে তুলতে পারলেই আইনের উদ্দেশ্য সফল হবে।

অন্যের কম্পিউটার কিংবা মোবাইল থেকে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি ও ভিডিও চুরি শুধু একটি প্রযুক্তিগত অপরাধ নয়; এটি ব্যক্তিস্বাধীনতা, মর্যাদা ও নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। বাংলাদেশের আইন এ অপরাধকে গুরুত্ব দিয়ে শাস্তির বিধান করেছে, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে আরও দৃঢ়তা ও দক্ষতা প্রয়োজন। ডিজিটাল যুগে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে আইন, প্রযুক্তি ও সামাজিক সচেতনতার সমন্বয়ই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ। 

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর