Logo

আইন ও বিচার

কর্মস্থলে যৌন হয়রানি নীরবতা ভাঙলেই নিরাপত্তা শুরু

Icon

সোহানা ইয়াসমিন

প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬, ২৩:০৫

কর্মস্থলে যৌন হয়রানি নীরবতা ভাঙলেই নিরাপত্তা শুরু

কর্মস্থল মানেই নিরাপত্তা, সম্মান ও পেশাদারিত্ব- এই ধারণাই সভ্য সমাজের ভিত্তি। অথচ বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অফিস, কারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা করপোরেট দপ্তর প্রায় সব ক্ষেত্রেই নীরবে বেড়ে চলেছে যৌন হয়রানি ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা। ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই মুখ খুলতে সাহস পান না। কেউ চাকরি হারানোর ভয়ে, কেউ সামাজিক অপমানের আতঙ্কে, আবার কেউ প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাধর ব্যক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ঝুঁকি নিতে চান না। এই নীরবতাই অপরাধকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, যা ক্রমে একটি সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিচ্ছে।

যৌন হয়রানি কোনো বিচ্ছিন্ন বা ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন, একটি ফৌজদারি অপরাধ, এবং সর্বোপরি একটি অসুস্থ ক্ষমতার চর্চা। কর্মক্ষেত্রে এর প্রভাব শুধু একজন কর্মীর ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না- এটি পুরো প্রতিষ্ঠানের কর্মসংস্কৃতি, উৎপাদনশীলতা ও নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

যৌন হয়রানি কী- এ নিয়ে বিভ্রান্তির সুযোগ নেই

অনেকেই যৌন হয়রানিকে কেবল শারীরিক নির্যাতনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। বাস্তবে বিষয়টি অনেক বিস্তৃত। অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ যেমন যৌন হয়রানি, তেমনি অশালীন মন্তব্য, কটূক্তি, দৃষ্টিভঙ্গি, ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশোভন বার্তা, চাকরি বা পদোন্নতির প্রলোভনে যৌন সুবিধা দাবি- সবই যৌন হয়রানির অন্তর্ভুক্ত।

এ ধরনের আচরণ একজন কর্মীর ব্যক্তিগত মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে, তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয় এবং কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী দীর্ঘদিন মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় ভোগেন। অথচ সমাজে এসবকে এখনও “তেমন কিছু না” বলে হালকা করে দেখার প্রবণতা রয়ে গেছে- যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

দেশে কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আইন ও বিচারিক নির্দেশনা স্পষ্ট। দণ্ডবিধিতে নারীর শালীনতা ক্ষুণ্ন করা, মানসিক নির্যাতন ও ভীতি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে। পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনেও যৌন নিপীড়নের জন্য কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে।

এর বাইরে ২০১১ সালে দেশের সর্বোচ্চ আদালত এক যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বাধ্যতামূলক নির্দেশনা দেন। এই নির্দেশনা প্রদান করেছে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। নির্দেশনায় বলা হয়েছে। সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে একটি যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি থাকতে হবে।

অনেক প্রতিষ্ঠানে এই কমিটি কাগজে-কলমে থাকলেও কার্যত নিষ্ক্রিয়। কোথাও আবার কমিটিই গঠন করা হয়নি। ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের পথেই এগোতে পারেন না।

কর্মস্থলে যৌন হয়রানির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নীরবতা। ভুক্তভোগীরা যখন চুপ থাকেন, তখন অপরাধী আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিযোগ করলেই উল্টো ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। তার পোশাক, আচরণ, চলাফেরা- সবকিছু নিয়ে বিচার শুরু হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু অন্যায় নয়, বরং অপরাধকে বৈধতা দেওয়ার শামিল।

একটি সভ্য সমাজে প্রশ্ন হওয়া উচিত- কেন একজন কর্মী অফিসে নিরাপদ বোধ করবেন না? কেন তিনি নিজের মর্যাদা রক্ষার জন্য চাকরি হারানোর ঝুঁকি নেবেন?

যৌন হয়রানির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানসিক নির্যাতন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার আগে ভয়, উদ্বেগ, আতঙ্ক- এগুলো ধীরে ধীরে একজন মানুষকে ভিতর থেকে শেষ করে দেয়। কর্মক্ষমতা কমে যায়, আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়ে, অনেকেই চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

এই মানসিক ক্ষতির কোনো দৃশ্যমান দাগ না থাকলেও এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রতিফলন পড়ে। অথচ মানসিক নির্যাতনকে এখনও আমরা অপরাধ হিসেবে গুরুত্ব দিতে শিখিনি।

যৌন হয়রানির শিকার হলে প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো- প্রমাণ সংরক্ষণ। মেসেজ, ই-মেইল, কল রেকর্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ক্রিনশট কিংবা সহকর্মীর সাক্ষ্য- সবই গুরুত্বপূর্ণ। এরপর প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটিতে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা উচিত। যদি সেখানে ন্যায়বিচার না মেলে বা হয়রানি গুরুতর হয়, তবে আইনগত পথে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি কিংবা সরাসরি মামলা করা যায়। এ ক্ষেত্রে সহায়তা নিতে পারেন বাংলাদেশ পুলিশ-এর।

কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা কেবল রাষ্ট্রের নয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়ন, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, অভিযোগের গোপনীয়তা রক্ষা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা- এসব ছাড়া নিরাপদ কর্মপরিবেশ কল্পনা করা যায় না।

যে প্রতিষ্ঠান ভুক্তভোগীকে সুরক্ষা দেয় না, বরং তাকে চুপ করিয়ে দিতে চায়- সে প্রতিষ্ঠান নিজেই অপরাধের অংশীদার হয়ে ওঠে।

যৌন হয়রানি বন্ধ করতে হলে শুধু আইন থাকলেই হবে না; দরকার সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। ভুক্তভোগীকে সন্দেহ নয়, সমর্থন দিতে শিখতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতা বাড়াতে হবে, নীরবতা ভাঙতে হবে।

এটি ব্যক্তিগত লজ্জার বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতিফলন। আইন আছে, আদালতের নির্দেশনা আছে- এখন দরকার সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ ও সাহসী অবস্থান।

নীরবতা অপরাধীকে রক্ষা করে, প্রতিবাদ ভুক্তভোগীকে শক্তি দেয়। কর্মস্থল হোক নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক- এই দাবি কোনো একক গোষ্ঠীর নয়, এটি একটি সভ্য রাষ্ট্রের মৌলিক শর্ত। এখনই সময় নীরবতা ভাঙার।

বিকেপি/এমএম 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর