ব্রিটিশ কমন ‘ল’ থেকে শরিয়াহ
বাংলাদেশের আইনে বহুমাত্রিক প্রভাব
অমিত শাহ
প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬, ২২:৪৪
বাংলাদেশের বর্তমান আইনব্যবস্থা একক কোনো উৎস থেকে গড়ে ওঠেনি। বরং উপনিবেশিক ঐতিহ্য, আঞ্চলিক ইতিহাস, ধর্মীয় বিধান এবং আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের সমন্বয়ে একটি বহুমাত্রিক ও মিশ্র আইন কাঠামো গড়ে উঠেছে। ফলে দেশের বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক বিধান ও আইনি কাঠামোর বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বের নানা দেশের আইনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের আইনের সবচেয়ে বড় ভিত্তি ব্রিটিশ কমন ল’ ব্যবস্থা। ব্রিটিশ শাসনামলে উপমহাদেশে যে আইনি কাঠামো চালু হয়েছিল, তার অনেক অংশই এখনো বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় বহাল রয়েছে। আদালতে নজির অনুসরণ, ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিচারপ্রক্রিয়া, চুক্তি আইন, সাক্ষ্য আইন ও কোম্পানি আইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্রিটিশ আইনের প্রভাব সুস্পষ্ট।
আইনবিদদের মতে, ভারতীয় দণ্ডবিধি (১৮৬০), সাক্ষ্য আইন (১৮৭২), চুক্তি আইন (১৮৭২), দেওয়ানি কার্যবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধির মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো ব্রিটিশ আমলেই প্রণীত হয়েছিল এবং সেগুলো এখনো বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আদালত যুক্তরাজ্যের উচ্চ আদালতের রায়ও নজির হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।
বাংলাদেশের আইনব্যবস্থার সঙ্গে ভারতেরও ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে উপমহাদেশে একই আইনি কাঠামোর মধ্যে আইন প্রণীত হওয়ায় দুই দেশের বিচারব্যবস্থা, আদালতের কাঠামো এবং সাংবিধানিক অনেক নীতিতে মিল দেখা যায়। হাইকোর্টের রিট ক্ষমতা, মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত বিধান এবং আদালতের স্তরবিন্যাসের ক্ষেত্রে এই সাদৃশ্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
অন্যদিকে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের অংশ হিসেবে থাকার কারণে প্রশাসনিক কাঠামো, পুলিশ ব্যবস্থা, ভূমি আইন এবং কিছু ব্যক্তিগত আইনে পাকিস্তানি আইনের প্রভাবও এখনো বিদ্যমান। বিশেষ করে বিবাহ, তালাক, মোহরানা ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিধানে দুই দেশের আইনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।
সংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বাংলাদেশের আইনব্যবস্থায় বহির্বিশ্বের প্রভাব রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সংবিধানে মৌলিক অধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রক্ষমতার বিভাজনের মতো ধারণায় যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক দর্শনের প্রভাব আংশিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। মানবাধিকার সুরক্ষা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক আইনি নীতির প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।
প্রশাসনিক আইনের ক্ষেত্রেও ইউরোপীয় ধারা, বিশেষ করে ফরাসি প্রশাসনিক আইনের কিছু প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সরকারি প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং প্রশাসনিক বিচার ব্যবস্থার কিছু দিক ফরাসি আইনি কাঠামোর সঙ্গে তুলনীয় বলে মনে করেন আইন বিশ্লেষকেরা।
বাংলাদেশের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন মূলত শরিয়াহভিত্তিক হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর আইনের সঙ্গেও কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। বিবাহ, তালাক, মোহরানা, ভরণপোষণ ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিধানে ইসলামি আইনধারার অনুসরণ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
বিশ্বায়নের ফলে আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক মানদণ্ডের প্রভাবও বাংলাদেশের আইনব্যবস্থায় ক্রমেই বাড়ছে। মানবাধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, শ্রম অধিকার, নারী ও শিশুর সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন ও সংশোধনে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আইন গবেষকদের মতে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সম্পূর্ণ নতুন আইনব্যবস্থা গড়ে না তুলে ঐতিহাসিকভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া আইনি কাঠামোকেই সময়োপযোগীভাবে সংস্কার ও উন্নয়ন করেছে। ফলে ব্রিটিশ কমন ল’, আঞ্চলিক আইন, শরিয়াহভিত্তিক ব্যক্তিগত বিধান এবং আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের সমন্বয়ে একটি বৈচিত্র্যময় ও বাস্তবসম্মত আইনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বহুমাত্রিক প্রভাব একদিকে যেমন বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তেমনি বৈশ্বিক আইনি মানদণ্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতেও সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
বিকেপি/এমএম

