Logo

আইন ও বিচার

জেলখানায় ডিভিশন প্রথা

সমতার সংবিধানে বৈষম্যের ছায়া

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬, ২২:৫৩

সমতার সংবিধানে বৈষম্যের ছায়া

দেশের কারাগার ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নানা কাঠামোগত সংকট, মানবাধিকার প্রশ্ন এবং প্রশাসনিক বৈষম্যের অভিযোগে আলোচিত। এর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত ও সংবেদনশীল একটি বিষয় হলো জেলখানায় কয়েদি ও সাজাপ্রাপ্তদের তথাকথিত “ডিভিশন” ব্যবস্থা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই প্রথা আজও বাংলাদেশের কারাগার ব্যবস্থায় নানা রূপে বিদ্যমান। অথচ সংবিধান, আদালতের রায় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে এর মৌলিক ধারণা ক্রমশ সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের কারাগার ব্যবস্থার আইনগত ভিত্তি মূলত প্রিজনস অ্যাক্ট, ১৮৯৪ এবং এর আলোকে প্রণীত বাংলাদেশ জেল কোড। ব্রিটিশ শাসনামলে এসব আইনের উদ্দেশ্য ছিল শাসক শ্রেণি এবং তথাকথিত ‘ভদ্র সমাজের’ বন্দিদের সাধারণ অপরাধীদের থেকে আলাদা সুবিধা দেওয়া। সে সময় শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক মর্যাদা ও পেশার ভিত্তিতে বন্দিদের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ডিভিশনে ভাগ করা হতো।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও কারাগারের এই শ্রেণিভিত্তিক কাঠামো পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর রূপ বদলালেও ডিভিশন ব্যবস্থাকে ঘিরে বিতর্ক এখনো বিদ্যমান।

আইনগতভাবে কারাগারের বন্দিরা প্রধানত দুই শ্রেণিতে বিভক্ত-

১. বিচারাধীন বন্দি (আন্ডার ট্রায়াল),

২. সাজাপ্রাপ্ত বন্দি।

জেল কোড অনুযায়ী বিচারাধীন বন্দিদের অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যায় না; বরং মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা আইনের চোখে নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হন। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিচারাধীন বন্দিদেরও সাজাপ্রাপ্তদের মতো কঠোর ও মানবেতর পরিস্থিতিতে দিন কাটাতে হয়।

সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের ক্ষেত্রেও ঐতিহাসিকভাবে ডিভিশনভিত্তিক সুবিধার ব্যবস্থা ছিল। প্রথম ডিভিশনের বন্দিরা আলাদা কক্ষ, উন্নত খাবার, বিছানা, পত্রপত্রিকা ও বই পড়ার সুযোগসহ বিভিন্ন সুবিধা পেয়ে থাকেন। বিপরীতে সাধারণ বন্দিদের অনেক সময় অতিরিক্ত ভিড়, সীমিত স্বাস্থ্যসেবা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে হয়।

সংবিধান ও মানবাধিকারের প্রশ্ন

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান। একই সঙ্গে ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এই সাংবিধানিক নীতির আলোকে কারাগারের ডিভিশন প্রথা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এছাড়া বাংলাদেশ যেসব আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের সদস্য, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদে বন্দিদের সঙ্গে মানবিক আচরণ এবং বৈষম্যহীন ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস-এও বন্দিদের সামাজিক বা অর্থনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিরোধিতা করা হয়েছে।

আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি

বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ে কারাগারে ডিভিশন প্রথা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আদালত একাধিক রায়ে উল্লেখ করেছেন, শুধুমাত্র সামাজিক মর্যাদা বা পেশার কারণে কোনো বন্দিকে আলাদা সুবিধা দেওয়া সংবিধানের সমতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তবে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন বা শারীরিক অক্ষমতার মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে পৃথক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু সেটিকে “ডিভিশন” হিসেবে নয়, বরং প্রশাসনিক ও মানবিক প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।

বাস্তবতা: আইন একদিকে, চর্চা আরেকদিকে

বাস্তবে পরিস্থিতি অনেক সময় ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত আসামিদের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। কখনো “বিশেষ শ্রেণি”, কখনো “ভিআইপি বন্দি” কিংবা “নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থা”- নাম পরিবর্তিত হলেও বৈষম্যের প্রশ্ন থেকেই যায়।

অন্যদিকে সাধারণ বন্দিদের বড় একটি অংশ চরম ভিড়ের মধ্যে মানবেতর পরিবেশে জীবন কাটাতে বাধ্য হন। দেশের অধিকাংশ কারাগারে ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দির সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি, মানসিক চাপ এবং পুনর্বাসনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

সংস্কারের প্রয়োজন

কারাগার কোনো প্রতিশোধের স্থান নয়; এটি হওয়া উচিত সংশোধন ও পুনর্বাসনের কেন্দ্র। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ডিভিশন প্রথার মৌলিক সংস্কার জরুরি।

প্রথমত, জেল কোড ও সংশ্লিষ্ট আইনসমূহকে আধুনিক ও মানবাধিকারসম্মত করে পুনর্গঠন করতে হবে। ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সমতার ভিত্তিতে বন্দি ব্যবস্থাপনার নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, বিচারাধীন বন্দিদের জন্য পৃথক ও মানবিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা সাজাপ্রাপ্তদের মতো আচরণের শিকার না হন।

তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য, বয়স বা বিশেষ চাহিদার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আলাদা ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ নীতিমালার আওতায় আনতে হবে, যাতে কোনো ধরনের অপব্যবহার না ঘটে।

শেষকথা

জেলখানায় ডিভিশন প্রথা মূলত একটি শ্রেণিভিত্তিক ও বৈষম্যমূলক ধারণা, যা স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের চেতনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আইন, সংবিধান এবং মানবাধিকার মানদণ্ডের আলোকে এ ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি।

কারাগার ব্যবস্থার সংস্কার শুধু বন্দিদের অধিকার রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠারও অপরিহার্য শর্ত। রাষ্ট্র যদি সত্যিই আইনের শাসন ও সমতার নীতিতে বিশ্বাসী হয়, তবে জেলখানার দেয়ালের ভেতরেও সেই নীতির প্রতিফলন ঘটাতে হবে। অন্যথায় ডিভিশনের নামে বৈষম্য আমাদের বিচারব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে।

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর