দেশের আইনব্যবস্থার একটি বড় অংশ এখনও ঔপনিবেশিক আমলের উত্তরাধিকার বহন করছে। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রণীত বহু আইন আজও কাগজে-কলমে কার্যকর রয়েছে, যদিও বাস্তব জীবনে সেগুলোর প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। প্রযুক্তি, সমাজব্যবস্থা, নগরায়ণ এবং মানুষের জীবনযাত্রার ধরন বদলে গেলেও এসব আইনের অনেকগুলো আজও আইনগ্রন্থে বহাল। ফলে এগুলোকে অনেকেই “অচল কিন্তু বহাল আইন” বলে আখ্যায়িত করেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাষ্ট্র পরিচালনার আধুনিক বাস্তবতায় আইনকে সময়োপযোগী করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ আইনের লক্ষ্য কেবল শাস্তি প্রদান নয়; বরং সমাজে শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন কোনো আইন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য হারায়, তখন তা আইনব্যবস্থার কার্যকারিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর প্রশ্ন তোলে।
দেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ আইন ব্রিটিশ শাসনামলে তৈরি। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়- Police Act 1861, Penal Code 1860 Ges Criminal Procedure Code 1898.
এই আইনগুলো সেই সময়ের সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছিল। তখনকার সমাজে ঘোড়ার গাড়ি, কেরোসিন বাতি, গ্রামীণ পাহারাদারি- এসবই ছিল দৈনন্দিন বাস্তবতা। কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে সেই প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
তারপরও এসব আইনের অনেক ধারা এখনো আইনগ্রন্থে বহাল আছে। ফলে মাঝে মাঝে এমন কিছু বিধান চোখে পড়ে যা আধুনিক নাগরিকদের কাছে অদ্ভুত কিংবা হাস্যকর বলে মনে হয়।
কিছু অচল কিন্তু বহাল আইন :
১. জনসমাবেশে পুলিশের অনুমতির বিধান
Police Act ১৮৬১- এর একটি ধারায় বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জনসমাবেশ বা মিছিলের জন্য পুলিশের অনুমতি নিতে হবে। এই বিধান ব্রিটিশ শাসনের সময় রাজনৈতিক আন্দোলন দমন করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল।
বর্তমানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত হলেও এই পুরনো বিধান এখনও বহাল রয়েছে।
২. মাতাল অবস্থায় জনসমক্ষে চলাফেরার শাস্তি
Penal Code ১৮৬০- এর একটি ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি মাতাল অবস্থায় জনসমক্ষে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তাকে শাস্তি দেওয়া যাবে। ঐতিহাসিকভাবে এই বিধানটি এমনকি ঘোড়ায় চড়ে মাতলামি করার ঘটনাকেও অন্তর্ভুক্ত করত।
আজকের যুগে ঘোড়ায় চড়ে মাতলামি খুব একটা দেখা না গেলেও আইনের ভাষায় সেই ধারা এখনও রয়ে গেছে।
৩. রাস্তার পাশে আবর্জনা বা মৃত পশু ফেলে রাখার অপরাধ :
একসময় শহরের পরিচ্ছন্নতা রক্ষার জন্য পুলিশকে এই ধরনের বিষয় দেখভালের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। তখন পৌর প্রশাসন এত শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু বর্তমানে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা এই কাজগুলো পরিচালনা করে। তবুও আইনগতভাবে এই বিধান এখনো বিদ্যমান।
৪. রাতের আলোর ব্যবস্থা না রাখার বিধান :
ঔপনিবেশিক সময়ে শহরের নিরাপত্তার জন্য বাড়ি বা দোকানের সামনে আলো জ্বালিয়ে রাখার নির্দেশ ছিল। কারণ তখন বৈদ্যুতিক স্ট্রিটলাইটের ব্যবস্থা ছিল না। এখন নগর এলাকায় আধুনিক আলোকব্যবস্থা থাকলেও সেই পুরনো বিধানের অস্তিত্ব আইনগ্রন্থে রয়ে গেছে।
যেসব কারণে পুরনো আইন রয়ে গেছে?;
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আইন বাতিল করা বা সংশোধন করা সহজ বিষয় নয়। এর জন্য সংসদে নতুন আইন পাস করতে হয়, প্রশাসনিক পর্যালোচনা করতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। ফলে বহু পুরনো আইন বছরের পর বছর ধরে বহাল থেকে যায়।
আরেকটি কারণ হলো- অনেক আইন আংশিকভাবে এখনও প্রাসঙ্গিক। তাই পুরো আইন বাতিল না করে কেবল কিছু ধারা সংশোধন করাই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করা হয়। কিন্তু বাস্তবে সেই সংশোধনের কাজ অনেক সময় দীর্ঘদিন আটকে থাকে।
আধুনিক রাষ্ট্রে আইন সংস্কারের প্রয়োজন।
বিশ্বের অনেক দেশ নিয়মিতভাবে তাদের আইন পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় বিধান বাতিল করে। যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশে “Law Reform Commission” বা আইন সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে পুরনো আইন বাতিল বা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বাংলাদেশেও Law Commission Bangladesh আইন সংস্কারের সুপারিশ করে থাকে। তবে বাস্তবে সেই সুপারিশের অনেকগুলোই দীর্ঘদিন বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকে।
বেশ কয়েকজন আইনজীবী গতকাল বাংলাদেশের খবরকে বলেন, পুরনো ও অপ্রাসঙ্গিক আইন বহাল থাকলে তা আইনের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতাকে দুর্বল করে। অনেক সময় প্রশাসনিক অপব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি হয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনকেও পরিবর্তিত হতে হয়। এজন্য প্রয়োজন পুরনো আইনসমূহের নিয়মিত পর্যালোচনা, অপ্রাসঙ্গিক ধারাগুলো বাতিল করা, আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন আইন প্রণয়ন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
আইন একটি জীবন্ত ব্যবস্থা, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন কোনো আইন কেবল ইতিহাসের স্মৃতি হয়ে আইনগ্রন্থে রয়ে যায়, তখন তা নাগরিকদের কাছে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। দেশের আইনব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী করতে হলে অচল কিন্তু বহাল আইনগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা জরুরি। নচেৎ আইনের বই আর বাস্তব জীবনের দূরত্ব আরও বাড়তেই থাকবে।
বিকেপি/এমএম

