Logo

আইন ও বিচার

অনলাইন জুয়া ও বেটিং

২ বছর কারাদণ্ড ও কোটি টাকা জরিমানা

Icon

বায়েজিদ তাশরীক

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬, ০৭:৫০

২ বছর কারাদণ্ড ও কোটি টাকা জরিমানা

দেশের ডিজিটাল পরিসর দ্রুত বিসৃত হচ্ছে। ইন্টারনেটে প্রতিদিন হাজার হাজার  মানুষ জীবন, কাজ, শিক্ষা এবং বিনোদন খুঁজছে। কিন্তু এই অনলাইন বিশ্বে অন্য এক ভয়াবহ বিপত্তি। অনলাইন জুয়া ও বেটিং-এর অভূতপূর্ব বিস্তার সমাজের দুর্বলতম স্তরগুলোকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সহজে টাকা কামানোর লোভে তরুণ থেকে বৃদ্ধ সবাই এতে আকৃষ্ট হচ্ছেন, আর্থিক ধ্বংস, ঋণজট, মানসিক অসমর্থতা, পারিবারিক মতভেদের মতো সমস্যা দিনে দিনে বাড়ছে।

অনলাইন জুয়া এখন শুধুই খেলা বা বিনোদনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িত হচ্ছে অর্থপাচার, প্রতারণা, স্মার্টফোন এবং মোবাইল ব্যাংকিংকে ব্যবহার করে অপরাধমূলক লেনদেন, সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও মানসিক সংকট যা সমাজের জন্য গভীর বিপদ সংকেত।

সরকার অনলাইন জুয়া সম্পর্কিত আইনগত শূন্যস্থান দ্রুত ভরাট করেছে। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এ অনলাইন জুয়া এবং বেটিং স্পষ্টভাবে অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। 

এই অধ্যাদেশের ধারা ২০ অনুসারে, অনলাইনে জুয়া খেলা, প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, পরিচালনা করা বা প্রচার করা- সবই অপরাধ। 

অপরাধী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা, বা উভয় দণ্ড হতে পারে। 

শুধুমাত্র প্ল্যাটফর্ম বা ওয়েবসাইট নয়, সামাজিক মাধ্যম, অ্যাপ, বিজ্ঞাপন বা প্রচারণা সব ক্ষেত্রেই একই শাস্তি। 

এ আইন ডিজিটাল যুগে জুয়ার বিস্তার রোধের জন্য দেশের আইনি কাঠামোকে শক্ত ভিত্তিতে দাঁড় করিয়েছে। এর আগেও বাংলাদেশে জুয়ার বিরুদ্ধে আইন ছিল, যেমন ‘দ্য পাবলিক গ্র্যাম্বলিং অ্যাক্ট ১৮৬৭’, কিন্তু তা ছিল পুরনো, অফলাইন হাউস এবং নির্দিষ্ট গেম কেসে সীমাবদ্ধ। অনলাইন জুয়া বা ডিজিটাল বেটিং এর ব্যাপারে তার কার্যকারিতা ছিল না। সাইবার সুরক্ষা আইন এ ঘাটতি পূরণ করেছে।

অনলাইন জুয়া শুধু বাজির টাকা হারানোর বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক আন্তঃসম্পর্ক, পরিবার ভাঙনের কারণ, ঋণগ্রস্ততা, মানসিক স্বাস্থ্য পর্যায়ে নেমে গেছে। অনেক যুবক প্রতিদিনের কাজের সময় বা চাকরি ছাড়াও অনলাইন বেটিং এ অংশ নিচ্ছে, দ্রুত টাকা আয় করার ভুল ধারণায় ঋণে জড়িয়ে পড়ছে। এই ঋণ তাদের স্বপ্ন, শিক্ষা, পরিবার ও ভবিষ্যৎ বিনষ্ট করছে। এটি সমাজে অর্থপাচার, অবৈধ লেনদেন ও ডিজিটাল ট্রানজেকশন জালিয়াতিকে বাড়াচ্ছে,  যা শুধু খেলোয়াড়দের ক্ষতি করছে না, দেশের আর্থিক নিরাপত্তাকেও বিপন্ন করছে।

আইন থাকলেও অনলাইন জুয়া সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা বাস্তবে সহজ নয়।

অনেক অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্ম বিদেশী সার্ভার বা অফশোর ঠিকানায় থাকে, যেখানে দেশের আইনের কার্যকারিতা সীমিত। ফলে বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। 

তাছাড়া ইন্টারনেটের গোপন কৌশল, ভিপিএন, ডিজিটাল ই ওয়ালেটের মাধ্যমে অসমর্থিত লেনদেন- সবই অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

জনসচেতনতা না বাড়লে বা শিক্ষা না দিলে, আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি থাকা সত্ত্বেও অনেকে আইনের আওতায় আসা বা ধরা পরার আগে আর্থিক ক্ষতি ও নৈতিক দুর্বলতায় পড়ে যাবে।

দেশে অনলাইন জুয়া বন্ধে কেবল আইন যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি দরকার- জনসচেতনতা বৃদ্ধি- পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে তরুণদের অনলাইন জুয়ার ঝুঁকি ও ক্ষতি সম্পর্কে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো।

ডিজিটাল সাক্ষরতা: যুবকদের মধ্যে নিরাপদ অনলাইন ব্যবহার ও কৃত্রিম লোভ থেকে বাঁচার উপায় শেখানো।

প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব অনলাইন জুয়া- যা শুরু হয়েছিল বিনোদনের নামে এখন একটি ডিজিটাল ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এটি এখন শুধুই ব্যক্তি নয়, সমগ্র সমাজকে প্রভাবিত করছে।

আইন যেমন কঠোর হয়েছে, তেমনই এর যথাযথ বাস্তবায়ন, সমাজের সহযোগিতা এবং তরুণদের মনে ইতিবাচক মনোভাব গঠন অপরিহার্য। আইন সরকারে শুধু থাকলে চলবে না; তা প্রতিটি নাগরিকের প্রতিশ্রুতি ও সচেতনতার প্রয়োগ হলে বাস্তবে জীবনে রূপ নেবে। দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে আগামী দিনে অনলাইন জুয়ার প্রতি “শূন্য সহনশীলতা” নীতি মানতে হবে- যাতে এ দেশ একটি সুস্থ, শান্তিপূর্ণ ও ডিজিটাল নিরাপদ সমাজ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। 

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত আইনি প্রশ্ন ও উত্তর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর