দেশে নির্মাণ খাত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা শহর, উপজেলা এমনকি গ্রাম পর্যায়েও এখন বহুতল ভবন নির্মাণের প্রবণতা বাড়ছে। কিন্তু এই উন্নয়নের আড়ালে প্রায়ই ঘটছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ ধসে পড়া, দেয়াল ভেঙে পড়া কিংবা নিরাপত্তাহীন পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা এখন আর বিরল নয়।
নির্মাণ শ্রমিকরা দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশাজীবীদের মধ্যে অন্যতম। তারা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উঁচু ভবনে কাজ করেন, ভারী নির্মাণ সামগ্রী বহন করেন এবং বিপজ্জনক পরিবেশে শ্রম দেন। অথচ তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যে মৌলিক ব্যবস্থা থাকা দরকার, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় না। হেলমেট, সেফটি বেল্ট, নিরাপদ স্ক্যাফোল্ডিং কিংবা মানসম্মত নির্মাণ কাঠামো- এসবের অভাবেই অনেক শ্রমিক দুর্ঘটনার শিকার হন।
ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রধান দায়িত্ব থাকে ভবনের মালিক, প্রকৌশলী, ঠিকাদার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর। একটি ভবন নির্মাণের আগে যথাযথ নকশা অনুমোদন, মাটি পরীক্ষা, মানসম্মত নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, দ্রুত লাভের আশায় অনেক মালিক ও ঠিকাদার নির্মাণবিধি উপেক্ষা করেন। ফলে ভবনের কাঠামোগত ত্রুটি তৈরি হয় এবং সামান্য চাপেই দুর্ঘটনা ঘটে।
এক্ষেত্রে ভবনের নকশা ও তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রকৌশলী যদি যথাযথভাবে নির্মাণ কাজ তদারকি না করেন কিংবা নির্মাণবিধি মানার বিষয়ে কঠোর না হন, তবে ভবনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে। একইভাবে ঠিকাদাররা যদি নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করেন বা নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা করেন, তবে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে নির্মাণ খাত নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন আইন ও বিধিমালা রয়েছে। যেমন বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (ইঘইঈ), নির্মাণ শ্রমিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধান, এবং শ্রম আইন ২০০৬-এ কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব আইনে বলা হয়েছে, নির্মাণ কাজের সময় শ্রমিকদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম প্রদান করা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা নিয়োগকর্তার দায়িত্ব। এছাড়া ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশা অনুসরণ না করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু সমস্যা হলো আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ প্রায়ই দেখা যায় না। দুর্ঘটনা ঘটলে কিছুদিন আলোচনা হয়, তদন্ত কমিটি গঠন হয়, কিন্তু পরে সবকিছু ধামাচাপা পড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের পরিবার সামান্য ক্ষতিপূরণ পেয়ে নীরবে বিষয়টি মেনে নিতে বাধ্য হয়। ফলে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়; এটি অনেক সময় অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার ফল। তাই ভবন দোষে যদি কোনো শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে, তবে তার দায় নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। ভবনের মালিক, ঠিকাদার, প্রকৌশলী এবং তদারককারী সংস্থা- যে যার দায়িত্বে অবহেলা করেছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানীতে যেমন রাজউক ভবন নির্মাণ তদারকি করে, তেমনি অন্যান্য এলাকায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এই দায়িত্ব পালন করে থাকে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, যথাযথ তদারকির অভাবেই নিয়মভঙ্গ করে নির্মাণ কাজ চলতে থাকে। এই তদারকি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নির্মাণ শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হলে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। উন্নত বিশ্বে নির্মাণ খাতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশেও সেই মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি।
সবশেষে বলা যায়, ভবন দোষে নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি সমাজের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা। উন্নয়নের নামে যদি মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে, তবে সেই উন্নয়নের মূল্য অনেক বেশি হয়ে যায়। তাই নির্মাণ খাতে শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ প্রতিটি শ্রমিকের জীবন মূল্যবান। তাদের ঘাম ও পরিশ্রমেই গড়ে ওঠে শহরের সুউচ্চ অট্টালিকা। সেই শ্রমিকদের জীবন যদি নিরাপদ না হয়, তবে উন্নয়নের সেই ভবন আসলে মানবতার ভিত্তিতেই ফাটল ধরায়।

