ফুড লাইসেন্সে ‘ঔষধ’ উৎপাদন
নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬, ০০:৪৩
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উদ্বেগজনক এক প্রবণতা নীরবে বিস্তার লাভ করছে খাদ্য উৎপাদনের লাইসেন্স ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে স্যালাইন, ট্যাবলেট ও ক্যাপসুলের মতো সংবেদনশীল পণ্য। যা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, এমন পণ্যগুলো যখন যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া উৎপাদিত হয়, তখন তা এক মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আইনকে পাশ কাটিয়ে খাদ্য লাইসেন্সের আড়ালে ‘ঔষধসদৃশ’ পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করছে যা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের হুমকি।
দেশে ঔষধ উৎপাদন, বিপণন ও মাননিয়ন্ত্রণের জন্য স্পষ্ট আইন রয়েছে। ঔষধ ও প্রসাধনী আইন ১৯৪০ এবং পরবর্তী সংশোধনী অনুযায়ী, কোনো ধরনের ঔষধ, স্যালাইন বা চিকিৎসা-সম্পর্কিত পণ্য উৎপাদনের জন্য বিশেষ অনুমোদন ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। এই লাইসেন্স প্রদান ও তদারকির দায়িত্বে রয়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর।
অন্যদিকে, খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বিপণনের লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বা স্থানীয় প্রশাসন। এই লাইসেন্সের আওতায় কেবল খাদ্য ও পানীয় পণ্য তৈরি করা যায় কোনোভাবেই ঔষধ বা চিকিৎসা-সম্পর্কিত পণ্য নয়।
মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিছু ছোট ও মাঝারি কারখানা খাদ্য লাইসেন্স নিয়ে ‘এনার্জি ড্রিংক’, ‘হারবাল সাপ্লিমেন্ট’ বা ‘ডায়েটারি পণ্য’ নামে এমন কিছু পণ্য তৈরি করছে, যা কার্যত স্যালাইন, ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কিছু ক্ষেত্রে এসব পণ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে রাসায়নিক উপাদান, যা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উৎপাদন না হলে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। কিন্তু এসব কারখানায় নেই পর্যাপ্ত মান নিয়ন্ত্রণ, নেই প্রশিক্ষিত জনবল, নেই সঠিক ল্যাব টেস্টিং ব্যবস্থা।
একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “স্যালাইন বা ওষুধজাতীয় পণ্য তৈরি করা অত্যন্ত সংবেদনশীল কাজ। এখানে সামান্য ভুলও প্রাণঘাতী হতে পারে। অথচ কিছু প্রতিষ্ঠান এই বিষয়টিকে পুরোপুরি বাণিজ্যিকভাবে দেখছে।”
স্যালাইন, ট্যাবলেট ও ক্যাপসুল সরাসরি মানুষের শরীরে প্রভাব ফেলে। যদি এসব পণ্যে ভেজাল থাকে, ডোজ ঠিক না হয়, বা জীবাণুমুক্ত না হয় তাহলে তা গুরুতর অসুস্থতা, এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা এই ঝুঁকির মধ্যে বেশি পড়েন। কারণ তারা প্রায়ই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব পণ্য ব্যবহার করেন।
এছাড়া, বাজারে যখন নিম্নমানের পণ্য ছড়িয়ে পড়ে, তখন মানুষ আসল ওষুধের ওপরও আস্থা হারাতে শুরু করে- যা পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর।
এই সমস্যার অন্যতম কারণ হলো তদারকির অভাব। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং জনবল সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়ম ভেঙে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারছে।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর মূলত ঔষধ কারখানা তদারকি করে, আর বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ খাদ্যপণ্য দেখভাল করে। কিন্তু যখন একটি প্রতিষ্ঠান খাদ্য লাইসেন্স নিয়ে ঔষধসদৃশ পণ্য তৈরি করে, তখন এই দুই সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব নির্ধারণে বিভ্রান্তি তৈরি হয় যার সুযোগ নিচ্ছে অসাধু চক্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনের ফাঁক খুব একটা নেই; বরং সমস্যা হচ্ছে প্রয়োগে। অনেক ক্ষেত্রেই লাইসেন্স দেওয়ার সময় যথাযথ যাচাই করা হয় না। আবার লাইসেন্স পাওয়ার পর নিয়মিত পরিদর্শনের অভাবও একটি বড় কারণ।
একজন সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের দেশে আইন আছে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন দুর্বল। এই সুযোগে কিছু ব্যবসায়ী আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লাভের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।”
এই সমস্যার আরেকটি বড় দিক হলো ভোক্তার অজ্ঞতা। অনেকেই জানেন না, কোন পণ্য খাদ্য আর কোনটি ঔষধ। ফলে তারা সহজেই বিভ্রান্ত হন এবং অনিরাপদ পণ্য কিনে ফেলেন।
বাজারে ‘হারবাল’, ‘ন্যাচারাল’ বা ‘এনার্জি’ নাম দিয়ে বিক্রি হওয়া অনেক পণ্য আসলে নিয়ন্ত্রিত ঔষধের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রথমত, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর হতে হবে। অবৈধভাবে ঔষধসদৃশ পণ্য উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়মিত অভিযান, জরিমানা ও প্রয়োজনে কারাদণ্ড- সবই নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ-এর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও যৌথ তদারকি কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, ভোক্তা সচেতনতা বাড়াতে হবে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে মানুষকে জানাতে হবে কোন পণ্য নিরাপদ, কোনটি নয়। চতুর্থত, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াকে আরও কঠোর ও স্বচ্ছ করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান কী ধরনের পণ্য তৈরি করছে, তা নিয়মিত যাচাই করতে হবে।
এই ধরনের অনিয়ম প্রকাশে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে গণমাধ্যম জনগণকে সচেতন করতে পারে এবং কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে।
ফুড লাইসেন্সের আড়ালে স্যালাইন, ট্যাবলেট ও ক্যাপসুল উৎপাদন শুধু আইন ভঙ্গ নয়, এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ওপর আঘাত। এই প্রবণতা যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এর ভয়াবহতা আরও বাড়বে।
রাষ্ট্র, প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। এখনই সময় কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার, নইলে ‘নীরব বিষ’ হয়ে এই অনিয়ন্ত্রিত পণ্যগুলো আমাদের সমাজকে গ্রাস করবে।
বাংলাদেশের খবর /মাসুম

