সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার খলনায়ক ডন কারাগারে
আইন ও আদালত ডেস্ক :
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৫৩
চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার খলনায়ক আশরাফুল হক ডনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। রোববার (৯ আগস্ট) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালত এ আদেশ দেন।
এর আগে রোববার ভোরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দীর্ঘদিন পলাতক থাকা ডনকে বিকেলে আদালতে হাজির করা হয়। পরে তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আরিফুর রহমান। শুনানি শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
সিআইডির আবেদনে বলা হয়, ভোর ৫টার দিকে বিমানবন্দর থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশ ডনকে আটক করে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মামলায় পলাতক ছিলেন। তাকে সিআইডির হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। জামিনে মুক্তি পেলে তিনি তদন্তে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারেন এবং ফের আত্মগোপনে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে তাকে কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন।
রোববার বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে ডনকে আদালতের এজলাসে তোলা হয়। কাঠগড়ায় ওঠানোর পর পুলিশ সদস্যরা তার জ্যাকেট ও হেলমেট খুলে দেন। ৫টা ১০ মিনিটে বিচারক এজলাসে আসেন। আসামির পক্ষে কোনো আইনজীবী আছেন কি না জানতে চাইলে জানানো হয়, তার পক্ষে কোনো আইনজীবী নেই।
রাষ্ট্রপক্ষের ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর শুনানিতে বলেন, এটি বহুল আলোচিত একটি মামলা এবং ডন মামলার এজাহারনামীয় ৪ নম্বর আসামি। তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। বিমানবন্দর থেকে তাকে আটক করে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ওই দিন সালমানের মা নিলুফার জামান চৌধুরী, বাবা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী এবং ছোট ভাই শাহরান শাহ তার সঙ্গে দেখা করতে বাসায় যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, সালমান ঘুমাচ্ছেন।
কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে জানান, সালমানের কিছু হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বাসায় ফিরে শয়নকক্ষে তাকে নিথর অবস্থায় দেখতে পান। সেখানে কয়েকজন বহিরাগত নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন।
সালমানের মা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ করেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে পরিবারের সদস্যরা তার গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখতে পান। পরে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল হয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সালমান শাহকে মৃত ঘোষণা করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ঘটনার পর সালমান শাহর ছোট ভাই শাহরান শাহকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় সালমানের মা ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। ওই মামলার আসামি রেজভি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ডনের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা জানান। সেখানে সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হকের সঙ্গে ডনের গোপন সম্পর্কের অভিযোগও উঠে আসে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে সালমান শাহকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
সালমান শাহর মৃত্যুর পর তার বাবা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী অপমৃত্যুর মামলা করেন। পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানান তিনি। অপমৃত্যুর মামলা ও হত্যার অভিযোগ একসঙ্গে তদন্তের জন্য আদালত সিআইডিকে নির্দেশ দেন।
১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করেন।
তবে সিআইডির প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট না হয়ে সালমান শাহর বাবা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী রিভিশন মামলা করেন। তার মৃত্যুর পর মামলাটি পরিচালনা করে আসছেন সালমানের মামা মোহাম্মদ আলমগীর।
সবশেষ গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদীপক্ষের করা রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় হত্যা মামলাটি দায়ের করেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর।
মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার অন্য আসামিরা হলেন—শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক আশরাফুল হক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ফরহাদ। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে তার মরদেহের দেহাবশেষ উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ২০ মে হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
পরে ২৪ মে মরদেহ উত্তোলন করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে বাদীপক্ষ মরদেহ উত্তোলনের আদেশ বাতিল চেয়ে আবেদন করলে আদালত তা নথিভুক্ত করেন।
এরপর গত ২২ জুন দেহাবশেষ উত্তোলনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ-সংক্রান্ত আদেশের অনুলিপি আদালতে দাখিল করা হলে তা নথিভুক্ত করা হয়।
এদিকে, সালমান শাহ হত্যা মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৩০ আগস্ট দিন ধার্য রয়েছে।
বাংলাদেশেরখবর/আরকে

