Logo

আইন ও বিচার

শিশু রামিসা ধর্ষণ-হত্যা: নজর আজ হাইকোর্টে

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০১:১০

শিশু রামিসা ধর্ষণ-হত্যা: নজর আজ হাইকোর্টে

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের আপিল এবং মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য পাঠানো ডেথ রেফারেন্সের শুনানি আজ রোববার হাইকোর্টে অনুষ্ঠিত হবে। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য কার্যতালিকার ২২ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে।

নিম্ন আদালতে মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর মামলাটি এখন উচ্চ আদালতের বিচারিক পরীক্ষার মুখোমুখি। ডেথ রেফারেন্সের মাধ্যমে একদিকে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের বিষয়টি হাইকোর্টে এসেছে, অন্যদিকে আসামিদের জেল আপিলের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। ফলে আজকের শুনানিতে মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ, আসামিদের বক্তব্য, তদন্তের ধারাবাহিকতা, আইনের প্রয়োগ এবং ট্রাইব্যুনালের রায়ের আইনগত ভিত্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আইনগতভাবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতের রায়ই চূড়ান্ত নয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন। একই সঙ্গে আসামির আপিলের অধিকারও রয়েছে। ফলে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সুযোগ নেই।

যে মামলায় ১৯ দিনেই রায়: মামলার নথি ও প্রকাশিত আদালত-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, পল্লবীর সেকশন-১১, ব্লক-বি এলাকার একটি ভাড়া বাসায় পরিবারের সঙ্গে থাকত রামিসা। সে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারও একই ভবনের অন্য একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৯ মে রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এরপর সোহেল রানা কক্ষের জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পাওয়ার পর পুলিশ স্বপ্না আক্তারকে হেফাজতে নেয়। পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সামনে থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ ঘটনায় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়।

১৬৪ ধারার জবানবন্দি কতটা গুরুত্বপূর্ণ: মামলার বিচারিক নথির প্রকাশিত বিবরণে সোহেল রানার ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে আইনের দৃষ্টিতে কোনো আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পাওয়া গেলেই মামলার বিচারিক প্রশ্নের অবসান ঘটে না।

আদালতকে দেখতে হয়- জবানবন্দিটি স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছে কি না, আইন অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না এবং মামলার অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য রয়েছে কি না। অর্থাৎ স্বীকারোক্তির পাশাপাশি মামলার পারিপার্শ্বিক ও অন্যান্য প্রমাণও আদালতের মূল্যায়নের বিষয়।

এই মামলায় ট্রাইব্যুনাল সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে দুই আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এখন সেই সিদ্ধান্তের আইনগত ও প্রমাণগত ভিত্তিই উচ্চ আদালতের সামনে পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

দ্রুততম বিচার, একদিনে ১৬ সাক্ষী: মামলাটির সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো বিচার শেষ করার সময়কাল। তদন্ত শেষে ২৪ মে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। একই দিনে মামলাটি পরবর্তী বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। এরপর ১ জুন দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়।

মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত ১৮ সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। একপর্যায়ে একদিনেই সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করা হয়। পরে আসামিদের ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় পরীক্ষা করা হয়।

যুক্তিতর্ক শেষে ৭ জুন রায়ের দিন নির্ধারিত হয়। ওই দিনই ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন রায় ঘোষণা করেন। অর্থাৎ মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু থেকে রায় পর্যন্ত সময় লাগে মাত্র কয়েক দিন এবং মামলা দায়ের থেকে রায় ঘোষণা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া শেষ হয় ১৯ দিনের মধ্যে।

ট্রাইব্যুনালের রায় কী বলছে: রায়ে ট্রাইব্যুনাল সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

একই সঙ্গে সোহেল রানাকে পাঁচ লাখ টাকা এবং স্বপ্না আক্তারকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার অর্থ রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীদের দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রায়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৬৮ ধারার কথা উল্লেখ করে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে একই সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে। অর্থাৎ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিলেও সেই রায় কার্যকর করার আগে এখন হাইকোর্টের বিচারিক অনুমোদন প্রয়োজন।

এর আগে রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের বক্তব্য ছিল, মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই ট্রাইব্যুনাল রায় দিয়েছেন।

তবে মামলাটি এখন নতুন একটি বিচারিক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষকে ডেথ রেফারেন্সের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে হবে। অন্যদিকে আসামিপক্ষ তাদের জেল আপিলের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে নিম্ন আদালতের রায় বাতিল, পরিবর্তন বা আইনের দৃষ্টিতে উপযুক্ত আদেশ প্রার্থনা করতে পারে।

এ পর্যায়ে আসামিদের পক্ষ থেকে কী যুক্তি উপস্থাপন করা হবে এবং রাষ্ট্রপক্ষ তার কী জবাব দেবে- শুনানিতে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

হাইকোর্টে এখন কী হবে: আজকের শুনানিতে মূলত দুটি বিষয় একই সঙ্গে বিবেচনায় আসবে- ডেথ রেফারেন্স এবং জেল আপিল।

ডেথ রেফারেন্স হলো মৃত্যুদণ্ডের মামলায় নিম্ন আদালতের রায় হাইকোর্টের অনুমোদনের জন্য পাঠানোর বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া। আর জেল আপিল হলো কারাগারে থাকা আসামির নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল।

ফলে হাইকোর্টকে একদিকে দেখতে হবে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করেছে কি না। অন্যদিকে আসামিদের আপিলের বক্তব্যও বিবেচনা করতে হবে। মামলার নথি পর্যালোচনার সময় সাধারণত আদালতের সামনে আসতে পারে- সাক্ষীদের জবানবন্দি ও সাক্ষ্যের সামঞ্জস্য; আসামিদের বক্তব্য ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ; ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির আইনগত গ্রহণযোগ্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা; চিকিৎসা ও ফরেনসিক আলামতের সঙ্গে সাক্ষ্য-প্রমাণের সামঞ্জস্য; তদন্তের প্রক্রিয়া ও অভিযোগপত্রের ভিত্তি; অভিযোগের সঙ্গে উপস্থাপিত প্রমাণের সম্পর্ক; ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ের যুক্তি ও আইনের প্রয়োগ।

তবে এগুলো কীভাবে এবং কোন পরিসরে বিবেচিত হবে, তা নির্ভর করবে মামলার নথি ও শুনানিতে উপস্থাপিত যুক্তির ওপর।

মৃত্যুদণ্ড বহালই হবে- এমন নিশ্চয়তা নেই: বেশ কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী বাংলাদেশের খবরকে বলেন, হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স উঠেছে মানেই নিম্ন আদালতের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকবে- এমন কোনো আইনি নিশ্চয়তা নেই। আবার আসামিরা আপিল করেছেন বলেই ট্রাইব্যুনালের রায় বাতিল হয়ে যাবে- এমনটিও নয়। উচ্চ আদালত মামলার পুরো নথি ও আইনি প্রশ্ন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দেবেন। 

সিনিয়র আইনজীবী পি কে আব্দুর রব বলেন, ‘পরিস্থিতি ও আইনের প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা, পরিবর্তন করা বা আইনসম্মত অন্য কোনো আদেশ দেওয়ার সুযোগ আদালতের রয়েছে।’

সিনিয়র আইনজীবী মাকসুদা বেগম বলেন, রোববারের শুনানি রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক পর্যায়। তবে শুধু কার্যতালিকায় মামলা থাকা বা শুনানি শুরু হওয়াকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

অ্যাডভোকেট শিরিন আক্তার ও অ্যাডভোকেট শাহনাজ শিল্পী মনে করেন, রামিসা মামলার বিচার মাত্র ১৯ দিনে শেষ হওয়া দেশের প্রচলিত ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার ভুক্তভোগী পরিবার ও সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এদিকে সাবেক আইন কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, দ্রুত বিচার মানেই শুধু দ্রুত রায় নয়। দ্রুততার পাশাপাশি আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার, সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই, আইনি প্রক্রিয়ার যথাযথ অনুসরণ এবং নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তির ক্ষেত্রে বিচারিক সতর্কতার গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ একটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেলে পরবর্তী পর্যায়ে ভুল সংশোধনের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে। সে কারণেই মৃত্যুদণ্ডের প্রতিটি মামলায় উচ্চ আদালতের বিচারিক পর্যালোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।

রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ের পর এখন দৃষ্টি হাইকোর্টের দিকে। একদিকে শিশুটির পরিবার ও রাষ্ট্রপক্ষের প্রত্যাশা- ট্রাইব্যুনালের দেওয়া কঠোর সাজা বহাল থাকুক। অন্যদিকে আইনের মৌলিক নীতি অনুযায়ী আসামিদের আপিলের অধিকার এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তাও হাইকোর্টকে বিবেচনায় নিতে হবে।

আজকের শুনানিতে তাই শুধু দুই আসামির ভাগ্য নির্ধারণের প্রশ্নই নয়; আলোচনায় আসবে নিম্ন আদালতের বিচারিক মূল্যায়ন, সাক্ষ্য-প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা এবং মৃত্যুদণ্ডের আইনি ভিত্তিও।

১৯ দিনের দ্রুত বিচার শেষে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড এবার উচ্চ আদালতের কঠোর বিচারিক পরীক্ষার মুখোমুখি। রামিসা হত্যা মামলায় সেই পরীক্ষার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আজকের শুনানি। 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন