Logo

জীবনানন্দ

গোলাম কিবরিয়া পিনুর কবিতায় জাতিবোধ ও মুক্তিযুদ্ধ

Icon

দ্বীপ সরকার

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ১৬:২৭

গোলাম কিবরিয়া পিনুর কবিতায় জাতিবোধ ও মুক্তিযুদ্ধ

গোলাম কিবরিয়া পিনু, ছবি: সংগৃহীত

বাংলা কবিতার বিস্তৃত পরিসরে গোলাম কিবরিয়া পিনু এমন এক কবি, যার কাব্যচর্চায় জাতিসত্তা, ইতিহাসচেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য অনুষঙ্গ বাবার বিভিন্ন দৃশ্যকল্প হয়ে ধরা দিয়েছে। সেই দৃশ্যকল্পগুলো নিছক ব্যক্তিগত নয় বরং তা ক্রমশ রূপ নিয়েছে সামষ্টিক অভিজ্ঞতায়। তার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে জাতিবোধ এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ফলে তার কবিতা হয়ে ওঠে একদিকে আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান, অন্যদিকে সংগ্রামী ইতিহাসকে জাতির কাছে বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া। সংগত কারণে কবি কখনো হয়ে উঠেছেন বিদ্রোহী, কখনো যুদ্ধের ময়দানের দাপুটে সৈনিক। এই চিত্রকল্পকে কেন্দ্র করে শতশত কবিতা, কবিতার পঙ্ক্তি রচিত হয়েছে।

যেমন কবি বলেন,

এখন আমার বর্শা নেওয়ার সময়

এই হাতে আছে রক্ত জোর

খুলতে পারি দোর—

লক্ষ্য করে বক্ষ তার ছিদ্র করা চাই।

(বর্শা, নির্বাচিত কবিতা)

কবি যেন এখনো ৭১-এ আছেন। ৭১-এর অস্থিরতা, শোষণের বিরুদ্ধে কবি আহ্বান করছেন। কবি বলতে চান, আমাদের চেয়ে চেয়ে দেখার দিন শেষ। আমাদের এখন ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। আমাদের এখন অস্ত্র হাতে নেওয়ার সময়। এখানে বর্শা একটি নিছক ছোট অস্ত্র নয় বরং সব ধরনের সমরাস্ত্রের প্রতীক হয়ে উঠেছে। পরে লাইনে কবির যৌবনদীপ্ত সময়কে দারুণভাবে ফুটে তুলেছেন। বৃদ্ধ বয়সে শরীরে জোর কম থাকে। তাই তো কবি বলছেন, ‘এই হাতে আছে রক্ত জোর/খুলতে পারি দোর...’

এখানে দোর বলতে কবি যুদ্ধজয়ের ইঙ্গিত দিয়ে বলতে চেয়েছেন, আমরা চিরদিন আবদ্ধ থাকবো না। এখনই উপযুক্ত সসয় বর্শা হাতে নেওয়ার। আবার এই পঙ্ক্তির ভাষা চলমান সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ইঙ্গিত হতে পারে। সমসময়ে লক্ষ্য করা যায়, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অনেক অসুর মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কবি তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র বা বর্শা হাতে নামতে আহ্বান করছেন।

কবির কাব্যভাষা পরিষ্কার। কবিতার সামনে দাঁড়ালে আয়নার মতো চমকিত হয় পাঠক। চিন্তা ও দর্শন তার প্রত্যেকটি কবিতা পাঠককে গভীরে প্রোথিত করে। অতি অলংকার নয়, বরং কবিতার ভাব ও ভাষা এতই সুগভীরের ফুল যে তা অতলে থেকেও স্পষ্ট বোঝা যায, চেনা যায়— এটাই তার কাব্যের স্বতন্ত্রতা।

মারণাস্ত্রের সময়কাল

আগামীর মুহূর্তগুলো কীভাবে কাটাবো?

(বিপন্ন অস্তিত্ব, নির্বাচিত কবিতা)

কবি এই পঙ্ক্তিতে ভয়ংকর সময়ের দিকে ইঙ্গিত করে বলতে চেয়েছেন, এই সময়টা খুব মারণাস্ত্রের সময় যাচ্ছে। দিকে দিকে মিসাইল, ড্রোনের শব্দ কানে ভাসছে। অনতিভবিষ্যতে আমাদের সময়টা কেমন যাবে। তাই কবি বলতে চেয়েছেন আর বল্লম নয়, বর্শা নয়, আগামীতে আমাদের এভাবেই মারণাস্ত্রের মতো করে প্রস্তুতি নিতে হবে। 

কবির সাথে আমার ব্যক্তগত পরিচয় নাই বললেই চলে। তবে বগুড়া লেখকচক্রের কোনো এক প্রোগ্রামে তার সাথে একবার দেখা এবং যৎসামান্য কুশলবিনিময়। তা থেকে বুঝেছি তিনি একজন খুব সজ্জন, স্বল্পভাষী এবং পরিচ্ছন্ন কবি। তিনি অনেকটা গম্ভীর এবং চিন্তক। এছাড়া সোস্যালমিডিয়ার কবির এ্যাক্টিভিজম আমাকে ভাবায়। চলমান অস্থিরতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ, মুক্তিযুদ্ধবিরুদ্ধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তার কলম সচল। কখনো স্ট্যাটাস বা কবিতা পোস্টে কবির তার ভেতরের কান্না এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কবিকে সব সময় তা তাড়িত করে। কবি সব সময় জাতিকে জাগ্রত করতে চান। জাতি যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। তার অসংখ্য কবিতায় এই জাগরণ পরিলক্ষিত হয়। যেমন কবি বলেন,

সাইরেন বাজানোর সময় এখন

কোনো শিথিল শৈথিল্য থাকতে পারে না

জাগরণ কাকে বলে, তাই দরকার

উন্মোচন কাকে বলে, তাই দরকার

উন্মীলন কাকে বলে, তাই দরকার

(সাইরেন, নির্বাচিত কবিতা) 

কবিতার ভাষা পরিষ্কার। কোনো সাজুগুজু নেই। ঘুমন্ত জাতিকে সাইরেন বাজিয়ে জাগ্রত করতে চান। কেমন জাগ্রত দরকার, কেমন উন্মোচন দরকার-ততটুকুই সাইরেনের ধ্বনিতে ধ্বনিত করতে চান। আর এই ঘুম-জাগরণ কোনো, নিছক বিষয় নয়-সবকিছুতে মুক্তিযুদ্ধ চেতনার জাগরণ।

আরেকটি কবিতায় বলছেন এভাবে,

আমাদের আবার দাঁড়াতে হবে

এইখানে

একাত্তরে—

কতটুকু রক্ত ছিল যুদ্ধে?

কতটুকু কান্না ছিল যুদ্ধে?

কতটুকু দুঃখ ছিল যুদ্ধে?

কতটুকু পণ ছিল যুদ্ধে?

কতটুকু ত্যাগ ছিল যুদ্ধে?

কতটুকু আশা ছিল যুদ্ধে?

কতটুকু স্বপ্ন ছিল যুদ্ধে?

(এইখানে, নির্বাচিত কবিত)

কবি এখানে জাতির কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলতে চেয়েছেন, আমরা যা করছি, যতটুকু বিপথে চলে গেছি, যতটুকু ভ্রান্তি বিভ্রান্তিতে আমরা নিপতিত হয়েছি, সেখান থেকে সরে এসে আমাদের সেই একাত্তরের কাছেই দাঁড়াতে হবে। কবি ‘এইখানে’ শব্দ ব্যবহার করেছেন সুচিন্তিতভাবে। যেনো একটা গোল চিহ্নিত বৃত্ত এঁকে বলছেন, এই সুদির্নিষ্ট স্থান থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। এটাই আমাদের আসল ঠিকানা। এটা মূলত সেই ৭১-এর প্রতীকী স্থান-যেখান থেকে বিচ্যুতি মানে অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে সেই জাতিকে। এখানে রক্তের প্রশ্ন আছে, কান্নার প্রশ্ন আছে-এভাবে দুঃখ, পণ, ত্যাগ, আশা, স্বপ্ন। কবি সতর্ক করতে চান, ৭১ ভুলিয়ে যাওয়া মানে তার রক্ত, দুঃখ কষ্ট, ত্যাগ-এগুলোর সাথে বেইমানি করা। 

কবির কবিসত্তাজুড়ে মুক্তিযুদ্ধ এবং শেখ মুজিবকে ঘিরে। মুক্তিযুক্তকে শয়নে স্বপনে লালন করেন বলেই তার সমগ্র কবিজীবন জাতিবোধের দিকে ঝুঁকে আছে। যেহেতু মুক্তিযুদ্ধ এবং শেখ মুজিব, একই অঙ্গের দুটি প্রশাখা। স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের নাম ধরলে স্বাভাবিকভাবেই মুজিবের নাম এসে যায়। কবির অসংখ্য কবিতা আছে, যেখানে মুজিবকে কেন্দ্রে রেখে, কখনো মুক্তিযুদ্ধের নায়কের চরিত্রে, কখনো বীর চরিত্রে, কখনো মুক্তিকামী জনগণের চরিত্রে। মুজিবের জন্ম, শিশুকাল, যৌবনের তারুণ্য, মৃত্যু অব্দি এমন বিষয় নাই যা কবি তুলে আনেননি। সেটা বিভিন্ন কাব্যে বিভিন্ন চিত্রকল্পে এবং রুপকের মাধ্যমে। যেমন একটি কবিতা এরকম—

‘শিশুর অবোধকালের সঙ্গে মুজিবের নাম

উচ্চারিত হয়েছিলো স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়

সেই শিশু বড় হয়ে দেখে

মুজিবের নাম কেড়ে নেওয়া হচ্ছে কণ্ঠস্বর থেকে

সেই সঙ্গে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে

তারুণ্যের স্বপ্ন’

(মুজিবের রক্তধারা, নির্বাচিত কবিতা)

এখানে মুজিবের শিশুকালের চরিত্র এসেছে এবং সেই সঙ্গে এসেছে তাকে ভুলে যাওয়ার হীনতা আয়োজনের ইঙ্গিত হয়ে। চারদিকে মুজিবকে ভুলিয়ে রাখার আয়োজন, যেন কণ্ঠস্বর থেকে কেড়ে নিতে চায় তার নাম।

একই কবিতায় অন্য এক জায়গায় কবি বলছেন,

‘মুজিবের নাম শুনে কারা ভয় করে

যারা পরজীবী বণিকের সহযোগী হয়ে শিকেয় রক্ষিত ঘি পাচার করে দিচ্ছে অন্য হাতে।’

কবি রাখঢাক রেখে কথা বলতে রাজি নন। মনে হতে পারে, মনে যা আসে তাই বলেন। কিন্তু কখনোই ব্যঞ্জনা থেকে ছিটকে যান না। এটাই কবির ভিন্নতা।

প্রসঙ্গত, এই পঙ্ক্তির দিকে চোখ রাখলে বোঝা যায়। তিনি বলছেন, মুজিবের নাম শুনে তারাই ভয় করে, যারা চরিত্রহীন এবং শঠ। এর উপমা টেনেছেন এভাবে, বণিকের সহযোগী হয়েও যারা গোপনে অন্যপথে রক্ষিত পণ্য পাচার করে। এখানে ‘রক্ষিত ঘি’ মুলত ব্যবসায়িক পণ্যের প্রতীকী শব্দ হিসেবে এনেছেন। ঠিক এ রকম চরিত্রহীন যারা, তারাই মুজিবের নাম শুনে ভয় পায়।

অন্য আরেকটি কবিতার পঙ্ক্তিতে বলছেন,

‘সাতই মার্চের জনসভার মঞ্চে-উঠবার আগে

আমাদের মুজিব—

কত শত সভার মঞ্চে উঠেছেন দৃঢ় পায়ে?

(অনিবার্য সাতই মার্চ, ওখানে আমার পছন্দের কেউ নেই)

সাতই মার্চ বাংলাদের ইতিহাসের একটা অবিস্মরণীয় ঘটনা। এই কবিতা হতে পারে এই দিনটিকে জাতির মননে মস্তিস্কে ধরে রাখার চমকপ্রদ উপাদান। কবি সেই দিনের স্মৃতি, মনে করিয়ে দেন জাতিকে। এবং জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দেন, সাতই মার্চের দিনে সভামঞ্চে মুজিব যে দৃঢ়চিত্তে পা উঠিয়েছেন, কোনোরূপ ভয়হীন-সে রকম অতীতে আর কোন সভামঞ্চে পা উঠিয়েছিলেন কি না। আরো একটি কবিতায় কবি বলছেন,

‘আমরা তখন হিম-চাদরে যেন ঢেকে যাচ্ছিলাম

গিরিসংকটেও ছিলাম

এর মধ্যে থেকেও –পাকিস্তানি শাসক ও বণিকরা আমাদের

জোর করে টেনে তুলে নিয়ে

-নিলামে তুলছিলো!

আমাদের বদ্বীপ-দীপহীন হয়ে গেলো!

আলোহীন হয়ে

ঘুটঘুটে সময়ে—

আমরাও নিমজ্জিত হই!

সেইসময়ে সমুদ্রের তল থেকে এসে

শিলা ও বরফ ভেদ করে

আমাদের পাশে দাঁড়ালেন—

তামা গলানোর এক সাহসী মানুষ!’

(বঙ্গবন্ধু, ওখানে আমার পছন্দের কেউ নেই)

এখানে স্বাধীনতা উত্তর সময়ের যে চালচিত্র-পাকিস্তানিদের শোষণ, নৈরাজ্য, ব্যবসায়িক সুবিধা, তার ইঙ্গিতময় আবহ তৈরি করেছেন। এবং এই সময়কে একটা অন্ধকার ঘুটঘুটে, চারদিকে হিম, গিরিসংকটময় সময়ের সাথে তুলনা করে বলছেন, ‘আমরা তখন হিম-চাদরে যেন ঢেকে যাচ্ছিলাম/গিরিসংকটেও ছিলাম’। সময়টাকে এমন একটা ঘোরময় অনুরণনে বর্ণনা করছেন যে, এমন সময়ে একজন সাহসী মানুষের প্রয়োজন হয়ে উঠেছিলো-যিনি এই অন্ধকার থেকে উদ্ধার করতে পারেন। কবি যেনো সময়কে ঘিরে গভীর স্বপ্নে নিমজ্জিত এবং ঘুম থেকে জেগে দেখেন সত্যি সত্যি এক মহা নায়ক ‘সমুদ্রের তল থেকে এসে/শিলা ও বরফ ভেদ করে/আমাদের পাশে দাঁড়ালেন-’। ‘বঙ্গবন্ধু’ কবিতাটি একটি সিম্বলিক কবিতা-কবিতার ভেতর একটা নীরব চরিত্র আবিস্কার করেছেন আর তিনিই বঙ্গবন্ধু। 

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন আমাদের বিদ্রোহী এবং দ্রোহের কবি। যদিও এই একটি বা দুটি গুণে তাকে বেঁধে রাখা যায় না। তিনি বহু গুণের কবি। তবে বিদ্রোহ এবং দ্রোহ তার মস্তিস্কে যেভাবে অটোমোশনের মতো কাজ করেছে, তা আর অন্য কবির মধ্যে পাওয়া যায়নি। কবি গোলাম কিবরিয়া পিনু টোটালি সে রকম একজন দ্রোহের কবি। তার কবিতার রাস্তা ধরে হাঁটলে বোঝা যায় তার কবিতাশক্তি একটা মসনদ ভেঙে দেবার মতো কীরূপ অটোমোটেড হয়। অন্তরে এবং দৃষ্টিতে যার লেলিহান আগুন। এই আগুণ কখনো মুক্তিযুদ্ধ কখনো চলমান অস্থিরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। এখানেই মূলত জাতিবোধের প্রশ্ন এবং বাংলাদেশ দেখার পদ্ধতির প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। এখানেই কবির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান স্পষ্ট। এরকম কিছু কবিতার উদ্ধৃতি তুলে ধরছি।

আমার দু’পা আছে ভুলে গেছি

আমার উঠোনে হাঁটতে পারি না

নিজের শস্যের মাঠে যেতে পারি না

নিজের দেশের রাজনীতিতে যেতে পারি না

বছরের পর বছর

আমার পা দুটো বেঁধে রাখা হয়েছে

আমার হাতেও বেড়ি!

(জন্মের পর থেকে কারাগারে,ঝুলনপূর্ণিমা থেকে নেমে এলো)

হাতঘড়িতে শরৎ নেই—

সূর্যঘড়িতে কি আছে?

শরৎ এখন রাঘববোয়ালের কাছে!


মাঠের পর মাঠ

যেখানে দুলতো কাশবন

যেখানে খুলতো—

মা- বোনের বেণী!

সেখানে এখন দখলবাজির

ট্রাক ও দেওয়াল তোলার ছেনী

(শরৎ, ঝুলনপূর্ণিমা থেকে নেমে এলো)

যাকে তাকে স্টিয়ারিংয়ে বসাই কেন?

সে তো বাড়ি না পৌঁছে দিয়ে

পৌঁছে দিচ্ছে মর্গে!

(স্টিয়ারিং, ঝুলনপূর্ণিমা থেকে নেমে এলো)

এতদিনেও আমার কাছ থেকে

কবিতা কেড়ে নিতে পারেনি কেউ।

(কবিত, ঝুলনপূর্ণিমা থেকে নেমে এলো)

দেশটা কি মগের মুল্লিক হয়ে গেল?

যে কেউ এসেই-

থামিয়ে ট্রাক

চলাচল বন্ধ করে দেয়

(মগের মুল্লক, ঝুলনপূর্ণিমা থেকে নেমে এলো)

এ ছাড়াও অসংখ্য কবিতা ছড়ি ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, ম্যাগাজিনে, সোস্যালমিডিয়ায়-যেখানে কবি আঙ্গুল উঁচু করে বিদ্রোহ পোষণ করেছেন। তার কবিতার ভাষা স্পষ্ট তবে অত্যন্ত শক্তিশালী। কবির চিন্তা যখন স্পষ্ট হয়, কবির অবস্থা অবস্থানও স্পষ্ট হয়। কবি যখন দ্রোহী হয়ে ওঠেন, তখন তাকে পরিষ্কার করে তোলে এক প্রকার স্ফুলিঙ্গের আলো। সে স্ফুলিঙ্গে সব কিছু পুড়ে অঙ্গার হয়ে য়ায়। কিছু কবিতা আছে যেগুলো বারুদের মতো, যেখানে বিস্ফোরিত হয়, সবকিছু স্প্রিন্টার আর ধূম্রজ্বালে পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। 

‘কেউ যদি আমাকে সাহায্য করে নিজের ইচ্ছায়

কিংবা আমন্ত্রণ করে তার ঘরে যাওয়ার

তা আমি গ্রহণ করেছি-কখনো কখনো সহাস্য বদনে!

এরপর যদি সে ভাবতে থাকে-

আমি পিঠমোড়া হয়ে পড়ে আছি

তার ঠেলাগাড়িতে!

ইজারা দিয়েছি আমাকে পুরোটাই!

তা হলে তা হবে মস্ত বড় ভুল!’

(আহম্মকের স্বর্গে কোন আহম্মক, ওখানে আমার পছন্দের কেউ নেই)

এখানে অস্তিত্ববাদের আবহ বিরাজমান। এই পঙ্ক্তিগুলো কবির ব্যক্তিকেন্দ্রিক-তবে তা সমাজে টিকিয়ে থাকার জন্য নীরব হুংকার। কখনো সখনো এমন ঘটে যায় জীবনে, মানুষ সুযোগ গ্রহণ করে। কিন্ত কবি বারুদের স্প্রিন্টারের মতো বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন এভাবে, আমাকে কাউকে ইজারা দিইনি। যদি এমনটি কেউ ভাবে-তা হবে মস্ত বড় ভুল। এখানেই অস্তিত্বের আলোর সন্ধান পাওয়া যায়। আবার এখানে পুজিবাদ এবং সুবিধাবাদীর ধারণাও স্পষ্ট। কবির লালিত দৃষ্টির ভিতরে যে উত্তাপ, যে হুংকার, তা এই পুঁজিবাদী এবং সুবিধাবাদীদের মসনদে আঘাত হানবে। অন্য আরেক কবিতায় বলছেন,

‘সুবিধাভোগীরা অতিরিক্ত সুবিধা নিয়ে যে

স্বাধীনতা ভোগ করছে-তাতে মনে হয়, এদের

পূর্বসূরিরা ওদের জন্য এদেশটা তৈরি করেছে।’

(মুক্তিযোদ্ধার অশ্রুপাত, জামাটা পাল্টাও, অন্তর্বাসও)

এখানে বিষয় ভাবনা খুব পরিষ্কার। কবির বোধের জায়গাটা কত বড় এবং প্রশস্ত। সুবিধাভোগীরা দেশটাকে এমনটাই ভাবে। 

কবির কবিতায় যেমন একাত্তর, সে সময়ের গণহত্যা অধিকন্তর হয়েছে, এমনি অনেক কবিতা তৈরি হয়েছে সরাসরি শহীদদের নাম ধরে ধরে। কবি যেনো তাদের একান্তজন হয়ে কবিতার শিরোনাম করেছেন। যেমন, মুজিবের রক্তধারা, মকছুদ আলী ’৭১, শহীদ মিলন, নুর হোসেন, শহীদ তাজুল, দাসু আলী, ইলামিত্র, কমরেড কছিরউদ্দীন, রাউফুন বসুনিয়া বসু, মনিসিংহ, আফান আলী সহ অনেক শহীদদের নামে কবিতা লিখেছেন।

প্রথমত, পিনুর কবিতায় জাতিবোধ একটি মৌলিক ও গভীর অনুষঙ্গ। তিনি বাঙালির জাতিসত্তাকে কোনো সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের গণ্ডিতে আবদ্ধ করেন না; বরং তা মানবিকতা, সংস্কৃতি এবং ভাষার সম্মিলিত অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরেন। তার কবিতায় ‘মাটি’, ‘নদী’, ‘ধানক্ষেত’, ‘গ্রামবাংলা’— এসব কেবল প্রকৃতির চিত্র নয়, বরং এগুলো বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এই প্রতীকগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চান, জাতি বলতে শুধু রাজনৈতিক সীমানা নয়; বরং একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যাত্রা, যা মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

এই প্রসঙ্গে লক্ষ্য করা যায়, পিনু গ্রামীণ জীবনের উপাদানগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তার কবিতায় কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, নদীপারের জীবনÑ সবকিছুই এক ধরনের শেকড়-সচেতনতার ইঙ্গিত বহন করে। এই শেকড়-সচেতনতা থেকেই জন্ম নেয় প্রকৃত জাতিবোধ। তার দৃষ্টিতে, যে জাতি তার শেকড়কে ভুলে যায়, সে জাতি তার পরিচয়ও হারিয়ে ফেলে। তাই তার কবিতায় এক ধরনের সতর্কবাণীও নিহিত থাকে-আধুনিকতার অন্ধ অনুকরণে যেন আমরা আমাদের নিজস্ব সত্তাকে বিস্মৃত না হই।

দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধ পিনুর কবিতায় এক চিরন্তন ও অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ তার কাছে শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং তা বাঙালির আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ প্রকাশ। তার কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহুমাত্রিকভাবে উপস্থিত-কখনো তা রক্তাক্ত ইতিহাস, কখনো তা বেদনার্ত স্মৃতি, আবার কখনো তা বিজয়ের গৌরবগাথা। পিনু মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং নির্মমতাকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেন। তাঁর কবিতায় শহীদের রক্ত, মায়ের কান্না, ধর্ষিত নারীর আর্তনাদ, শরণার্থীর দুর্ভোগ— এসব চিত্র পাঠককে নাড়িয়ে দেয়। তবে তিনি কেবল শোকের বর্ণনাতেই থেমে থাকেন না; বরং এই বেদনার মধ্য দিয়েই তিনি খুঁজে নেন প্রতিরোধের শক্তি। তার কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ মানে শুধু ধ্বংস নয়, বরং তা এক নতুন সম্ভাবনার জন্ম।

তৃতীয়ত, পিনুর কবিতায় জাতিবোধ ও মুক্তিযুদ্ধের একটি জৈবিক সম্পর্ক বিদ্যমান। তার দৃষ্টিতে, মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জাতিসত্তাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। যুদ্ধের আগেও বাঙালি একটি জাতি ছিল, কিন্তু ১৯৭১-এর অভিজ্ঞতা সেই জাতিসত্তাকে সুসংহত ও সুস্পষ্ট করে তোলে। অর্থাৎ, মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির আত্মপরিচয়ের একটি নির্ধারক মুহূর্ত। এই উপলব্ধি তার কবিতায় বারবার প্রতিফলিত হয়।

এই প্রসঙ্গে বলা যায়, পিনু মুক্তিযুদ্ধকে কেবল অতীতের স্মৃতি হিসেবে দেখেন না; বরং তা বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান। তাঁর কবিতায় প্রায়ই দেখা যায়, তিনি সমকালীন সমাজের নানা অসংগতিÑ দুর্নীতি, অন্যায়, বৈষম্য। এসবের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের তুলনা করেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রশ্ন তোলেনÑ আমরা কি সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করতে পেরেছি? নাকি আমরা ধীরে ধীরে সেই চেতনা থেকে বিচ্যুত হচ্ছি?

চতুর্থত, পিনুর কবিতার ভাষা ও চিত্রকল্প এই দুই প্রধান বিষয়কে আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠা করে। তাঁর ভাষা সরল, কিন্তু তা অত্যন্ত শক্তিশালী। তিনি জটিল অলংকার বা দুর্বোধ্য শব্দচয়ন এড়িয়ে চলেন; বরং সাধারণ মানুষের ভাষাকেই কাব্যের উপযোগী করে তোলেন। এই সহজতা তার কবিতাকে আরও প্রাঞ্জল ও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

চিত্রকল্পের ক্ষেত্রেও তিনি অত্যন্ত দক্ষ। যেমন— নদী তার কবিতায় সময়ের প্রবাহের প্রতীক, রক্ত হয়ে ওঠে আত্মত্যাগের প্রতীক, আর মাটি হয়ে ওঠে জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসার প্রতীক। এইসব প্রতীক ও উপমা পাঠকের মনে গভীর আবেগ সৃষ্টি করে এবং জাতিবোধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে একাত্ম হতে সাহায্য করে।

পঞ্চমত, পিনুর কবিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। যদিও তিনি জাতিসত্তা ও মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে লিখেছেন, তবুও তার দৃষ্টিভঙ্গি কখনোই সংকীর্ণ নয়। তিনি সবসময় মানবতার বৃহত্তর পরিসরকে বিবেচনায় রাখেন। তার কবিতায় যে বেদনা, তা শুধু বাঙালির নয়; বরং তা সমগ্র মানবজাতির বেদনা। এই দৃষ্টিভঙ্গি তার কবিতাকে একটি সার্বজনীন মাত্রা প্রদান করে।

এছাড়া, পিনুর কবিতায় একটি নৈতিক প্রত্যয় লক্ষ্য করা যায়। তিনি কেবল অতীতের গৌরবগাথা বর্ণনা করেন না; বরং সেই গৌরবকে বর্তমান জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চান। তার কবিতায় একটি আহ্বান থাকে— মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান। এই আহ্বান তার কবিতাকে একটি দায়িত্ববোধসম্পন্ন শিল্পে পরিণত করে।

পরিশেষে বলা যায়, গোলাম কিবরিয়া পিনুর কবিতায় জাতিবোধ ও মুক্তিযুদ্ধ কেবল দুটি বিষয় নয়; বরং তা তার কাব্যসত্তার মূল ভিত্তি। তার কবিতা আমাদের শেকড়ের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, আমাদের ইতিহাসকে নতুন করে ভাবতে শেখায় এবং আমাদের ভবিষ্যতের পথ নির্দেশ করে। তার কাব্যভুবনে জাতিসত্তা ও মুক্তিযুদ্ধ একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে, যা বাংলা সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এই দিক থেকে পিনুর কবিতা শুধু সাহিত্যিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং তা একটি ঐতিহাসিক দলিল, একটি সাংস্কৃতিক স্মারক এবং একটি নৈতিক পথনির্দেশ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। তার কবিতার মধ্য দিয়ে আমরা যেমন আমাদের অতীতকে বুঝতে পারি, তেমনি বর্তমানকে বিশ্লেষণ করতে এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শিখি। এজন্যই বলা যায়, গোলাম কিবরিয়া পিনুর কবিতায় জাতিবোধ ও মুক্তিযুদ্ধের যে উপস্থাপনা, তা বাংলা কবিতার ধারায় এক অনন্য সংযোজন।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন