গণ অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিধ্বস্ত রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ১৯:০৮
প্রতীকী ছবি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে একের পর এক হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও নাশকতার মামলা হয়েছে। তাদেরকে ন্যাক্কারজনকভাবে হয়রানি করা হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য নিয়ে মাঠপর্যায়ে একাধিক প্রতিবেদন হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে সমুহে বলা হয়েছে জীবন বাজি রেখে যারা আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করেছে তাদের অনেকেই আসামি হয়ে আত্মগোপনে থেকে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। বিভিন্ন মানবাধিকার ও সাংবাদিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত অন্তত কয়েকশ সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের মামলায় জড়িয়েছেন।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) জানিয়েছে, এই সময়ে ৮১৪ জন সাংবাদিক নির্যাতন, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে— ৫৮৫ জন সরাসরি হামলার শিকার, ১৭৪ জন হত্যা মামলার আসামি, ১২ জন হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি, ৩৭ জন নাশকতা মামলার আসামি, ৬ জন সাংবাদিক নিহত।
এমএসএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই সবচেয়ে বেশি ৬২২ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হন। অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি জানিয়েছে, ১৭ মাসে ৪২৭টি হামলায় ৮৩৪ জন সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হন, যার মধ্যে ৩৭৯ জন আহত এবং ৩৩ জন গ্রেপ্তার হন।
টিআইবি’র মতে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার এবং ১৮৯ জন চাকরিচ্যুত হয়েছেন।
আইন বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিক নেতারা বলছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’। এই স্তম্ভকে পরিকল্পিতভাবে আঘাত করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে সেগুলো প্রমাণ করা কঠিন হবে। ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীর পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে। তিনি আরও বলেন, স্বৈরাচারের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে হয়রানি প্রসঙ্গে বাংলাদেশের আইনে এই নামে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধ নেই। এটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন, ভবিষ্যতে সাংবাদিকরা তাঁদের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবেন।
প্রতিবেদনে একাধিক ঘটনার উদাহরণ উঠে এসেছে, যেখানে নিহত ব্যক্তির পরিবারের অজ্ঞাতে বা দূর সম্পর্কের সূত্রে সাংবাদিকদের আসামি করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
একটি মামলায় কুড়িগ্রামে এক তরুণের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাংবাদিকদের আসামি করার অভিযোগ ওঠে। আবার লালমনিরহাট ও রংপুরসহ বিভিন্ন জেলায় একই ধরনের মামলা বাণিজ্য ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে আরও বলা হয়, কিছু ক্ষেত্রে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা পর্যন্ত জানেন না কীভাবে মামলা করা হয়েছে বা কেন সাংবাদিকদের আসামি করা হয়েছে।
সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম এবং সংবাদপত্র মালিক সমিতির সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী জানিয়েছেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ২৮২ জন সাংবাদিকের তালিকা দিয়েছি, যাঁদের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের পর মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে। তিনি বলেছেন, এই মামলাগুলো আমাদের সময়ে হয়নি। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গেছে। হত্যা মামলাগুলো রিভিউ করা হবে। হয়রানিমূলক মামলাগুলো ফরমালি প্রত্যাহার করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গত তিন মাসে কোনো সাংবাদিক নিগৃহীত হয়নি। সাংবাদিকদের বিষয়গুলো তিনি খেয়াল রাখবেন।
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, মামলায় অভিযুক্ত সাংবাদিকদের বিষয়টি প্রতিকারের জন্য প্রধানমন্ত্রী আগেই নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারিভাবে মামলাগুলো পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে হয়রানি অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন সাংবাদিকরা।
কিছু সাংবাদিক জানিয়েছেন, তারা ঘটনার সময় ঘটনাস্থলেই ছিলেন না, তবুও রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে মামলায় জড়ানো হয়েছে।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের এই মামলাজট ও সাংবাদিক হয়রানির অভিযোগ নিয়ে এখন দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে রাষ্ট্রীয় তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া, অন্যদিকে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রশ্ন—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মত বিশ্লেষকদের।
একটা গণতন্ত্রপরায়ণ আইন তৈরিতে আমরা সম্মত হয়েছি : নুরুল কবির
রোববার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সম্পাদক পরিষদের নেতারা। জনপ্রশাসন সভাকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে সম্পাদক পরিষদ সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, আমরা সেটাকে গ্রহণ করেছি। দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা হয়েছে। আইন-কানুনের মধ্যে যে অগণতান্ত্রিকতার অংশগুলো আছে, সেগুলো তাকে অবহিত করেছি। অনেকগুলো বিষয়ে যে রিভিউ করা দরকার তা নিয়ে আলাপ হয়েছে। সেগুলোর বিষয়ে তিনি সম্মত হয়েছেন।
বাংলাদেশে একটা গণতান্ত্রিক মিডিয়া রেজিম করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ে একটা পরামর্শ কমিটি করে জুন মাস ধরে কাজ করে জুলাইয়ের কোনো একটা সময় চূড়ান্ত একটা রিপোর্ট তৈরি করা হবে। তার আলোকে একটা গণতন্ত্রপরায়ণ আইন তৈরি করার জন্য আমরা সম্মত হয়েছি। আর অন্য যে সব ত্রুটি-বিচ্যুতি প্র্যাকটিসের মধ্যে আছে, সেগুলো থেকে কিভাবে বেরিয়ে আসা যায় এবং সেখানে সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক আচরণ করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সম্পাদকরা তাদের সঙ্গে এনগেজ থাকবে এটা আমরা কথা দিয়েছি, উনারাও এটা ওয়েলকাম করেছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ার কথা বলুন বা অন্যান্য, এটা শুধু এই পত্রপত্রিকারই নয়, যে নানা ধরনের ডিসইনফরমেশন-মিসইনফরমেশন সমাজে আছে, সেটা সমাজের সব অংশকেই নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, এমনকি সাংবাদিকদেরও করে। সেগুলো থেকে বেরিয়ে এসে পুরো মিডিয়া জগতের যেসব বাধা-বিপত্তি আছে, সেগুলোকে দূর করার জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করার একটা কনসেনসাস আমাদের হয়েছে।
রোববার বৈঠকে গণমাধ্যমের সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

