সংস্কারের লক্ষ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলা সময়ের দাবি: আলী রীয়াজ
বাংলাদেশের প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:০৭
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ
সংস্কারের লক্ষ্যে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলা সময়ের দাবি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের নিষ্পেষণে জর্জরিত রাষ্ট্রকে উদ্ধার করতে প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। আর সেই সংস্কারের লক্ষ্যেই গণভোটে জনগণের রায় জরুরি।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) ময়মনসিংহে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ উপলক্ষে বিভাগীয় ইমাম সম্মেলনে এসব কথা বলেন আলী রীয়াজ। সার্কিট হাউস ময়দানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধানের ৭ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু এতদিন সেই জনগণকেই বঞ্চিত রাখা হয়েছে। বিবেকের তাড়নায় গণভোটে অংশগ্রহণ জরুরি, যেন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ অতীতের মতো না হয়। গণভোটে বিজয়ের মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠন সম্ভব।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও বাংলাদেশ একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। সময় এসেছে গণভোটে রায়ের মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণের। তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত কোনো নির্বাচিত সরকারই ৪২ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি।
সংস্কার প্রস্তাবের ব্যাখ্যায় আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধানের উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতে ১০০টি আসন রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে যে দল মোট ভোটের মাত্র ৫ শতাংশ পেয়েছে কিন্তু সরকার গঠন করতে পারেনি, তারও পাঁচজন প্রতিনিধি থাকবে উচ্চকক্ষে। সংবিধান সংশোধনের জন্য উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে, অর্থাৎ কমপক্ষে ৫১ ভোটের সমর্থন লাগবে।
রাষ্ট্রপতির নিয়োগ ও দায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাতেই সব সিদ্ধান্ত হতো। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কেবল প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ব্যতীত অন্য কোনো সিদ্ধান্ত এককভাবে নিতে পারেন না। যদিও নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয় ও বিচারপতি নিয়োগের মতো বিষয়গুলো রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সম্পন্ন হয় বলে বলা হয়, বাস্তবে সেগুলো তৎকালীন সরকারপ্রধানের ইচ্ছানুসারেই হয়ে থাকে।
সংবিধানের ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ সম্পর্কে আলী রীয়াজ বলেন, এই অনুচ্ছেদ নিজ দলের সংসদ সদস্যদের মুখে ‘স্কচটেপ’ এটে দেওয়ার মতো। এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিকাশে বড় বাধা। এ থেকে উত্তরণে সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, অর্থবিল ও আস্থা ভোটের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ দলের অনুগত থাকবেন, তবে অন্যান্য বিষয়ে তারা স্বাধীনভাবে মতামত দিতে পারবেন।
সরকারি কর্মচারীদের গণভোটের প্রচারণায় অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের গণভোটের প্রচারণায় অংশ নিতে আইনগত কোনো বাধা নেই।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ সম্মানের সঙ্গে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, এমন একটি সমাজ গড়তে হবে যেখানে সন্তানের পরিচয় নির্ধারিত হবে তার যোগ্যতা, অর্জিত জ্ঞান ও প্রচেষ্টার ভিত্তিতে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিলে সংবিধানে বিসমিল্লাহ বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস থাকবে না- এমন অপপ্রচারকে বোগাস উল্লেখ করে শেখ বশিরউদ্দীন সবাইকে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান।
আরেক বিশেষ অতিথি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকবে নাকি স্বৈরাচারী হবে, জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে থাকবে নাকি বিপক্ষে যাবে- সেই সিদ্ধান্তের জন্যই এই গণভোট।
তিনি বলেন, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার সুরক্ষার জন্য গণভোট জরুরি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর এটিই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও সুযোগ। নিজেদের অধিকার সুরক্ষার জন্য আর নিজ দেশে পরবাসী হয়ে থাকতে চান না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার ফারাহ শাম্মীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আরও বক্তব্য দেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফজলুর রহমান, ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি আতাউল কিবরিয়াসহ অন্যরা।

