আল জাজিরার বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ কীভাবে মুহাম্মদ ইউনূসকে মনে রাখবে?
ডিজিটাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:০৪
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে শেষ হতে চলেছে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনকাল। নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আল জাজিরা’ ড. ইউনূসের শাসনামল ও তার লিগ্যাসি বা উত্তরাধিকার নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. ইউনূস দেশের দায়িত্ব নেন। এখন প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ তাকে কীভাবে মনে রাখবে? তিনি কি সেই ‘ধীরস্থির নাবিক’ যিনি ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছেন, নাকি তিনি সেই নেতা যিনি আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী রাষ্ট্রকে পুরোপুরি সংস্কার করতে ব্যর্থ হয়েছেন?
প্রতিবেদনের শুরুতে উঠে এসেছে ঢাকার একজন সাধারণ মানুষের কথা। জানুয়ারির শেষের দিকে ঢাকার ব্যস্ত সড়কে নিজের অটোরিকশা চালাতে চালাতে রুবল চাকলাদার বলছিলেন তার মনের কথা। তার কণ্ঠে ক্ষোভের চেয়ে হতাশাই ছিল বেশি। ৫০ বছর বয়সী এই চালক মনে করেন, ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর বাংলাদেশ যে বিরল সুযোগ পেয়েছিল, তা অনেকটাই নষ্ট করা হয়েছে।
শেখ হাসিনার পদত্যাগের তিন দিন পর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৪০০-এর বেশি মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই পরিবর্তনের পর তার ওপর দায়িত্ব ছিল একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা। ৮৫ বছর বয়সী ড. ইউনূসের লক্ষ্য ছিল সীমিত কিন্তু উচ্চাভিলাষী : একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করে পুনরায় স্বৈরাচারের উত্থান রোধে সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তোলা।
কিন্তু রুবল চাকলাদার মনে করেন, প্রশাসনের ভেতরের বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এবং মেরুকৃত রাজনৈতিক দলগুলো অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে ড. ইউনূসকে তার ১৮ মাসের শাসনামলে জোরালো সমর্থন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, আমরা সুযোগটি হারালাম। আমরা ড. ইউনূসকে ঠিকমতো কাজ করতে দিইনি। কে তার কাছে অযৌক্তিক দাবি নিয়ে রাস্তায় নামেনি? এই দেশ আর ভালো হবে না। জুলাই মাসে মানুষ অকারণে প্রাণ দিয়েছে বলে আক্ষেপ করেন তিনি।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় পর দেশে প্রথমবারের মতো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমেই শেষ হবে দেশের ইতিহাসের অন্যতম অস্বাভাবিক এক রাজনৈতিক পালাবদল।
ত্রাতা নাকি ব্যর্থ সংস্কারক?
আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ড. ইউনূস যখন ক্ষমতা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তার লিগ্যাসি বা উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। একসময় যারা তার ওপর ভরসা রেখেছিলেন, তারাই এখন বিভক্ত। বিতর্কের মূল প্রশ্ন হলো— ড. ইউনূস কি সেই ধীরস্থির নাবিক যিনি ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছেন, নাকি তিনি সেই নেতা যিনি অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছেন?
কেন বেছে নেওয়া হয়েছিল ড. ইউনূসকে?
অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের কাছে ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং নাগরিক সমাজের নেতা হিসেবে তার খ্যাতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে যখন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ধসের শঙ্কায় ছিল।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রধান ও সাবেক ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলাম আল জাজিরাকে বলেন, ওই মুহূর্তে আমাদের এমন একজনকে দরকার ছিল যিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। আমরা যখন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করলাম, ড. ইউনূস ছাড়া আর কাউকে পাইনি। উল্লেখ্য, এনসিপি আগামী সপ্তাহের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে।
আরেক ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আল জাজিরাকে জানান, প্রাতিষ্ঠানিক ধস এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় এমন একজনকে দরকার ছিল যার নৈতিক কর্তৃত্ব রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ড. ইউনূসের নিয়োগ নিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর মধ্যে কিছুটা দ্বিধা ছিল বলে ছাত্রনেতাদের আলোচনায় উঠে এসেছিল। তবে আল জাজিরা স্বাধীনভাবে এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
ড. ইউনূস নিজেও প্রথমে রাজি হতে চাননি, তিনি বলেছিলেন তিনি রাজনীতির মানুষ নন। কিন্তু পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং মৃত্যুর মিছিল দেখে তিনি একে দায়িত্বের মুহূর্ত হিসেবে গ্রহণ করেন।
হতাশা ও আক্ষেপ
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ড. ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার ১৮ মাস পর, এমনকি তার সমর্থকদের মধ্যেও এক ধরনের হতাশা কাজ করছে। আসিফ মাহমুদ বলেন, আমরা জাতীয় ঐকমত্যের সরকার চেয়েছিলাম, যা সম্ভব হয়নি। তবুও আমরা আশা করেছিলাম রাষ্ট্রের ব্যাপক সংস্কার হবে।
সংস্কার ও বিচারের প্রচেষ্টা
আল জাজিরার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, ড. ইউনূস বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম উচ্চাভিলাষী সংস্কার উদ্যোগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। নির্বাচিত সংসদের অনুপস্থিতিতে তার প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ এবং নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারে কমিশন গঠন করে। তার শাসনামলে বিচার বিভাগ স্বাধীন ভূমিকা পালন করে এবং শেখ হাসিনার আমলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার শুরু হয়। গত বছরের শেষের দিকে শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
ড. ইউনূসের অন্যতম সাহসী পদক্ষেপ ছিল শেখ হাসিনার শাসনামলে (২০০৯-২০২৪) গুম ও গোপন বন্দিশালার বিষয়গুলো সামনে আনা। তার গঠিত গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশন ১,৯১৩টি অভিযোগ নথিভুক্ত করে এবং ১,৫৬৯টি ঘটনার সত্যতা পায়। এতে ২৮৭ জন ভুক্তভোগীকে মৃত বা নিখোঁজ হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির অ্যাডজাঙ্কট ফেলো মোবাশ্বার হাসান, যিনি নিজেও ২০১৭ সালে গুমের শিকার হয়েছিলেন, তিনি এই কমিশনকে ড. ইউনূসের সবচেয়ে ফলপ্রসূ হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, এটি প্রমাণ করেছে যে শেখ হাসিনার অধীনে অপরাধগুলো ছিল পদ্ধতিগত। তিনি আয়নাঘর-এর অস্তিত্ব স্বীকার করা এবং সেখানে পরিদর্শনের বিষয়টিকে বড় অর্জন হিসেবে দেখেন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী আল জাজিরাকে বলেন, প্রত্যাশা ছিল ড. ইউনূস সেই আমলাতন্ত্রের মুখোমুখি হবেন যারা নাগরিকদের ওপর ক্ষমতার অপব্যবহার করে। কিন্তু অনির্বাচিত সরকারের সীমাবদ্ধতা এবং কাঠামোগত বাধার কারণে তিনি তা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
সংস্কারের ওপর গণভোট
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ড. ইউনূস এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন। সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি তিনি সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ওপর একটি জাতীয় গণভোটের আয়োজন করেছেন। তার সমর্থকদের যুক্তি, পরবর্তী সরকার যদি স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ভাঙতে চায়, তবে সংস্কারের জন্য জনসম্মতি প্রয়োজন। ভোটাররা অনুমোদন দিলে পরবর্তী সংসদ সিদ্ধান্ত নেবে তারা এই সংস্কার বাস্তবায়ন করবে কি না।
রাজনৈতিক দলগুলোর মূল্যায়ন
নির্বাচনের দৌড়ে এগিয়ে থাকা বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছিল। বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ আল জাজিরাকে বলেন, দেশকে স্থিতিশীল করতে ড. ইউনূসের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে অনির্বাচিত সরকারের এত স্বল্প সময়ে সব কিছু ঠিক করার চেষ্টা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে, যদিও প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়। তবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখনো ভঙ্গুর। তিনি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আয়োজনকে ড. ইউনূসের বড় অর্জন হিসেবে অভিহিত করেন।
জামায়াতে ইসলামীর নেতা আব্দুল হালিম আল জাজিরাকে বলেন, তিনি সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন এবং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে সংস্কারের জন্য সময় প্রয়োজন। এই সরকারের অর্জনকে সব রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা উচিত।
অর্থনীতির হালচাল
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনীতিবিদদের মতে ড. ইউনূসের আমলে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো কিছুটা স্থিতিশীল হলেও পারিবারিক পর্যায়ে সংকট কাটেনি। বেকারত্ব, স্থবির মজুরি এবং বিনিয়োগের অভাবে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
‘অন্ধের দেশ’ ও আয়নার উপমা
যাদের হাত ধরে ড. ইউনূস ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেই ছাত্রনেতাদের মূল্যায়ন মিশ্র। নাহিদ ইসলাম বলেন, তিনি ঐক্য গড়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু রাজনৈতিক দরকষাকষিতে তার সরকার দুর্বল ছিল। আসিফ মাহমুদ যোগ করেন, তিনি আন্তর্জাতিকভাবে সফল হলেও দেশের ভেতরে সংগ্রাম করেছেন। আমাদের আরও শক্ত অবস্থানের প্রয়োজন ছিল।
তবে সানজিদা খান দীপ্তির কাছে ড. ইউনূস একজন সফল মানুষ। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত ১৭ বছরের কিশোর আনাসের মা দীপ্তি। গত মাসে আদালত সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং অনেককে কারাদণ্ড দিয়েছেন।
দীপ্তি আল জাজিরাকে বলেন, আমরা সন্তানের রক্তের বিনিময়ে বিচার চেয়েছিলাম। ড. ইউনূসকে ইতিবাচকভাবে মনে রাখার আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, অন্ধের দেশে আয়নার কোনো মূল্য নেই। এত অল্প সময়ে একজন মানুষ কীভাবে এত কাজ শেষ করবেন?
প্রতিবেদনের শেষাংশে তুলে ধার হয়েছে ঢাকার জ্যামে বসে অটোরিকশাচালক রুবল চাকলাদারের বলা তার পারিবারিক বিড়ম্বনার কথা। তার স্ত্রী ও মেয়ে এখনো নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক। তাদের বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। আর এ কারণেই ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে তার তেমন কোনো আশা নেই।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, আমি ভোট দেব। পরিবর্তনের আশায় নয়, বরং ভোট দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই তাই। আমি বিশ্বাস করি না এই নির্বাচন আমার জীবন বা দেশের কোনো অর্থবহ পরিবর্তন আনবে।
এমএইচএস

