দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ৪১ দিনে সারা দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ২৫১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হাম প্রমাণিত হয়েছে ৪২ জনের শরীরে, আর বাকি ২০৯ জন মারা গেছে হামের স্পষ্ট উপসর্গ নিয়ে। আক্রান্তের সংখ্যাও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, যা দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল
রুম থেকে পাঠানো সর্বশেষ নিয়মিত বুলেটিন ও পরিসংখ্যান থেকে এসব ভয়াবহ তথ্য জানা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায়
(শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও
১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত কারো মৃত্যু না হলেও সন্দেহজনক
রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৮৭ জন। ২৪ ঘণ্টায় মৃত ১১ শিশুর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ জনই মারা
গেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। এছাড়া ঢাকা বিভাগে ৩ জন, সিলেট বিভাগে ২ জন এবং রাজশাহী বিভাগে
১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে সার্বিক পরিসংখ্যানে ঢাকা বিভাগ এখনো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ
অবস্থানে রয়েছে। গত দেড় মাসে ঢাকা বিভাগে হাম ও হাম সন্দেহে ১২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে
এবং আক্রান্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৭১০ জন শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ
করে দেখা যায় ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ৪ হাজার ৪৬০ জন শিশুর
শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। অপরদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে ৩০ হাজার ৬০৭
জন শিশু। এই সময়ের মধ্যে ২০ হাজার ৪৭৫ জন শিশু গুরুতর অবস্থা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি
হয়েছে। তবে আশার কথা হলো, সঠিক চিকিৎসায় ১৭ হাজার ৮১ জন শিশু সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে
ছাড়পত্র পেয়েছে।
হঠাৎ হামের এমন প্রাদুর্ভাবের পেছনে বেশ
কিছু কারণ চিহ্নিত করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে
কোনো কারণে ঘাটতি থাকা বা করোনাকালীন শিশুদের একটি বড় অংশের টিকা বাদ পড়া এর অন্যতম
কারণ হতে পারে। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা দ্রুত বাতাসের মাধ্যমে
ছড়ায়। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগ প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়। চট্টগ্রাম
ও ঢাকা বিভাগে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার পেছনে ঘনবসতি এবং সচেতনতার অভাবকে দায়ী করা হচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, জ্বর, শরীরের লালচে দানা বা র্যাশ, চোখ লাল হওয়া এবং কাশির মতো উপসর্গ
দেখা দিলেই দেরি না করে শিশুকে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
সারা দেশে নজরদারি বৃদ্ধি করেছে। যে এলাকাগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি, সেখানে বিশেষ
টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা তাদের শিশুদের নিয়মিত
৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ হাম-রুবেলার টিকা নিশ্চিত করেন। বর্তমানে হাসপাতালে
চিকিৎসাধীন শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুলসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
তবে সংক্রমণ রোধে আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ
নেওয়ার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের খবর/এম.আর

