রূপপুরে জ্বালানি লোডিং শুরু, পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:৫৩
ছবি: সংগৃহীত
নতুন ইতিহাস লিখলো রূপপুর। শুরু হলো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এক নম্বর ইউনিটে পরমাণু জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম। আর এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করলো বাংলাদেশ। বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসবে।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে পরমাণু জ্বালানি হিসেবে দেশে যে ইউরেনিয়াম এসেম্বলি এসেছিল, মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকালে সেগুলোই ঘটা করে প্রবেশ করানো হলো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এক নম্বর ইউনিটে। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের এলিট ক্লাবে ৩৩তম দেশ হিসেবে নাম লেখাল বাংলাদেশ।
প্রকল্প এলাকায় আয়োজিত জ্বালানি লোডিংয়ের আনুষ্ঠানিকতায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের নবযাত্রায় শুভ কামনা জানান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি। আর রুশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোসাটমের মহাপরিচালক এলেক্সি লিখাচ্বভ আগামীতেও বাংলাদেশের পাশে থাকার কথা জানান।
সরকারের নীতিনির্ধারকরা জানান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে রূপপুরে নিরাপদগত দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের আশা, কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, জালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত, জীবনমান উন্নয়ন আর অর্থনীতি গতিশীলে ভূমিকা রাখবে রূপপুর।
দুই ইউনিট মিলে রূপপুরের উৎপাদন সক্ষমতা দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। সব ঠিক থাকলে আগস্টে ৩০০ মেগাওয়াট এবং ধাপে ধাপে আগামী বছরের শেষ দিকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ দিতে পারবে রূপপুর।
১৯৬১ সালে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের উদ্যোগের শুরু। রূপপুরে জমি অধিগ্রহণের কয়েক বছর পর প্রকল্পটি বাতিল করে দেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। স্বাধীন দেশে এ নিয়ে আবার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকার ও রুশ ফেডারেশন সরকারের মধ্যে একটি আন্তরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।
চুক্তির আওতায় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও রোসাটমের ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জেনারেল কন্ট্রাক্ট স্বাক্ষর করা হয়। চুক্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন, কমিশনিং, পরীক্ষামূলক পরিচালনা, জনবলের প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তিন বছরের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম ঘিরে প্রকল্প এলাকা ও আশপাশে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম উপলক্ষে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদসহ সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য, মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটমের মহাপরিচালকসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত আছেন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে প্রকল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
এদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম গণমাধ্যমকে বলেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত হবে এক হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। একই বছরের জুনে দ্বিতীয় ইউনিটে ফুয়েল লোডিং বা জ্বালানি স্থাপনের কাজ শুরু হবে। ওই বছরে সেপ্টেম্বরে রূপপুরের দুটি ইউনিট থেকে মোট দুই হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কাজ শেষ হয়েছে গত বছরের মে মাসে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য সঞ্চালন লাইনের কাজ চলছে পুরোদমে। এবছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তা শেষ হতে পারে বলে মন্ত্রণালয় জানায়।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. শৌকত আকবরও জানান, জ্বালানি লোড করার পর রিয়্যাক্টরের ভেতরে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত ও টেকসই চেইন রিঅ্যাকশন বা ‘ফিশন বিক্রিয়া’ শুরু করা হয়। একে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি। শুরুতে রিয়্যাক্টরকে তার পূর্ণ ক্ষমতার মাত্র এক থেকে তিন শতাংশ স্তরে রেখে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের প্যারামিটারগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর রিঅ্যাক্টর। এখানেই ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোড করা হচ্ছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মূলত 'নিউক্লিয়ার ফিশন' বা নিউক্লিয়াস বিভাজন প্রক্রিয়ায় কাজ করবে।
পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। এই তাপশক্তি দিয়ে পানিকে উচ্চচাপে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরানো হয়, যা থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চলে।
জ্বালানি লোডিং শেষে শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্ট আপ। এ পর্য়ায়ে ডিজাইন অনুযায়ী নিউক্লিয়ার ফিশান রিয়্যাকশন ঘটানো হয় এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে যার জন্য প্রায় ৩৪ দিন সময় প্রয়োজন হবে। পরীক্ষা শেষে রিঅ্যাক্টরের পাওয়ার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করে পর্যায়ক্রমে তিন, পাঁচ, ১০, ২০ ও ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হবে, যার জন্য সময় লাগবে ৪০ দিন।
রিঅ্যাক্টরের পাওয়ার ৩০ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি চলবে নিরাপত্তা বিষয়ক নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা। সবমিলে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস।
কেন্দ্রটিতে একবার জ্বালানি লোড করার পর তা দিয়ে চলবে টানা দেড় বছর। ফলে অন্যান্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো তেল, গ্যাস কিংবা কয়লা কেনার কোনও ঝামেলা নেই। দেড় বছর পর এক তৃতীয়াংশ করে জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে।
নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। এরপর বাংলাদেশকে ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। তবে সেই জ্বালানি দুই বছর পর পর পরিবর্তন করলেই চলবে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

